চট্টগ্রামে হামের ভয়াবহতা: ১০ দিনে হাসপাতালে ভর্তি ৪৫৭ শিশু
আজ রবিবার (১৪ জুন) দুপুরে অনলাইন সংস্করণে প্রকাশিত ‘জনস্বাস্থ্য, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও ইপিআই ভ্যাকসিনেশন খতিয়ান’ এবং ‘ভাইরাল ইনফেকশন কন্ট্রোল, পেডিয়াট্রিক কেয়ার ও প্রিভেন্টিভ মেডিসিন উইং’-এর বিশেষ যৌথ বুলেটিংয়ে চট্টগ্রামের হামের বিস্তার এবং শিশুদের আইসোলেশন মেথড বিস্তারিত তুলে ধরা হলো।
চট্টগ্রাম সিভিল সার্জন অফিসের অফিশিয়াল মেডিকেল রিপোর্টের ডেটাবেজ খতিয়ান অনুযায়ী, জেলায় এ পর্যন্ত সর্বমোট ২ হাজার ৮৮৬ জন শিশু হামের সংক্রমণ নিয়ে প্রাতিষ্ঠানিক চিকিৎসাসেবা গ্রহণ করেছে। বর্তমানে বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালের বিশেষায়িত ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন রয়েছে ২৭৮ জন শিশু। গত ১০ দিনের ভর্তি হওয়া রোগীর কন্ডিশন পর্যালোচনা করে দেখা যায়—৪ জুন ৬৪ জন, ৫ জুন ৩৪ জন, ৬ জুন ৫৮ জন, ৭ জুন রেকর্ড ৭১ জন, ৮ জুন ৫৭ জন, ৯ জুন ৫৫ জন, ১০ জুন ৬০ জন, ১১ জুন ৪৪ জন, ১২ জুন ২৭ জন এবং সর্বশেষ ১৩ জুন ৫১ জন শিশু হামের তীব্র উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে স্থান পেয়েছে। এর মধ্যে ৭ জুনের ৭১ জন আক্রান্তের ঘটনাটি চলতি মৌসুমের একক দিনে সর্বোচ্চ সংক্রমণের রেকর্ড মেথড।
চট্টগ্রাম ইন্টারন্যাশনাল মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ ও দেশের প্রখ্যাত শিশু রোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. মো. মুসলিম উদ্দিন সবুজ হামের ক্ষতিকর ও ছোঁয়াচে মেথডলজি ব্যাখ্যা করে বিশেষ খতিয়ান দিয়েছেন। তিনি বলেন, “হাম কোনো সাধারণ চর্মরোগ নয়, এটি একটি অত্যন্ত মারাত্মক ও চরম ছোঁয়াচে আরএনএ (RNA) ভাইরাসজনিত রোগ। এই ভাইরাসের সংক্রমণ বাতাসের মাধ্যমে খুব দ্রুত এবং সহজে এক শরীর থেকে অন্য শরীরে ছড়ায়। সবচেয়ে বিপজ্জনক কন্ডিশন হলো, আক্রান্ত ব্যক্তির হাঁচি কিংবা কাশির মাধ্যমে নির্গত হওয়া ড্রপলেট বা ভাইরাসটি বাতাসে প্রায় দুই ঘণ্টা পর্যন্ত সম্পূর্ণ জীবিত ও সক্রিয় থাকতে পারে। সেই দূষিত বাতাসে কোনো সুস্থ শিশু শ্বাস নিলে বা জীবাণুযুক্ত টেবিল-চেয়ার স্পর্শ করে চোখে-মুখে হাত দিলে সে মুহূর্তেই আক্রান্ত হবে।”
তিনি আরও পরামর্শ দেন, বর্তমান মহামারি কন্ডিশনে শিশুদের সুরক্ষায় জরুরি প্রয়োজন ছাড়া ঘরের বাইরে বা জনাকীর্ণ স্থানে নিয়ে যাওয়া মা-বাবার একদমই উচিত নয়। কারণ অনেক শিশুর শরীরে প্রাথমিক মেথডে হামের উপসর্গ থাকলেও তা খালি চোখে ধরা পড়ে না। ফলে অজান্তেই সুস্থ সন্তানটি আক্রান্ত শিশুর সংস্পর্শে এসে ভাইরাসের শিকার হতে পারে।
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের শিশু রোগ বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ মুসা হাসপাতালের বর্তমান চিকিৎসা মেথড নিয়ে কথা বলেছেন। তিনি জানান, চমেকের শিশু ওয়ার্ডগুলোতে প্রতিনিয়ত হাম আক্রান্ত নতুন শিশুদের চাপ বাড়ছে। ভাইরাসের তীব্রতার কারণে অনেক শিশুর নিউমোনিয়া, তীব্র শ্বাসকষ্ট বা মস্তিষ্কে জটিলতা দেখা দিচ্ছে। শারীরিক কন্ডিশন অত্যন্ত সংকটাপন্ন বা জটিল হওয়ায় বেশ কিছু শিশুর জন্য জরুরি ভিত্তিতে পিআইসিইউ (PICU - Pediatric Intensive Care Unit) বা শিশু নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রের সাপোর্ট প্রয়োজন হচ্ছে।
ডা. মুসা স্পষ্ট করে বলেন, “আক্রান্ত শিশুদের সম্পূর্ণ সুস্থ করে তুলতে আমাদের চিকিৎসকদের টিম দিনরাত সর্বোচ্চ আইনি ও চিকিৎসা মেথডে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। তবে এই রোগ থেকে শিশুদের বাঁচাতে হলে সবার আগে মা-বাবার পারিবারিক সচেতনতা সবচেয়ে বেশি জরুরি। যেহেতু শিশুদের নিজস্ব রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বা ইমিউনিটি সিস্টেম বড়দের তুলনায় স্বাভাবিকভাবেই অনেক কম থাকে, তাই ভাইরাসের সামান্য সংস্পর্শে এলেই তারা খুব সহজে এবং দ্রুত কন্ডিশন হারিয়ে ফেলে।” জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয় থেকে জানানো হয়েছে, উপদ্রুত এলাকাগুলোতে শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে এবং ভাইরাসের চেইন ভাঙতে জরুরি পুষ্টি ও ইপিআই (EPI) টিকাদান কর্মসূচির বিশেষ রোডম্যাপ দ্রুত বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
জান্নাত সকালবেলা
|