যমুনা চরের জীবনসংগ্রাম—দুঃখ-দুর্দশার মাঝে স্বাবলম্বিতার গল্প

যমুনা চরের জীবনসংগ্রাম—দুঃখ-দুর্দশার মাঝে স্বাবলম্বিতার গল্প

জলিলুর রহমান জনি, স্টাফ রিপোর্টার: সিরাজগঞ্জ জেলার যমুনা নদীর চরের ২৬টি ইউনিয়নের পাঁচ লক্ষাধিক মানুষের জীবন প্রকৃতির সঙ্গে প্রতিনিয়ত লড়াই করে এগিয়ে চলেছে। জেলার কাজিপুর, চৌহালী, বেলকুচি, শাহজাদপুর ও সদর উপজেলার বিস্তীর্ণ চরাঞ্চলের বাসিন্দারা প্রতি বছর নদীভাঙন, বন্যা, ঝড় ও দারিদ্র্যের সঙ্গে সংগ্রাম করেই টিকে আছেন।

চরগিরিশ, নিশ্চিন্তপুর, তেকানী, খাসরাজবাড়ি, মনসুরনগর, নাটুয়াপাড়া, ঘোড়জান, স্থল, সাদিয়াচাঁদপুর, খাসকাউলিয়া, ওমারপুর, কৈজুরী, জালালপুর, রুপবাটি, সোনাতনী, পোরজনা, বরধুল, ছোনগাছা, রতনকান্দি, মেছড়া, কাওয়াখোলা ও কালিয়াহরিপুরসহ দেড় শতাধিক চরের মানুষ নদীভাঙনের আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন। প্রতি বছর বাড়িঘর হারিয়ে এক চর থেকে অন্য চরে আশ্রয় নেওয়া তাদের নিত্যদিনের বাস্তবতা। সদর উপজেলার কাওয়াখোলা ইউনিয়নের বাসিন্দা রবি জানান, তার জীবনে চারবার নদীভাঙনের শিকার হয়েছেন তিনি। একসময় তাদের পরিবারের ৫০ বিঘা জমি থাকলেও যমুনার ভাঙনে সব হারিয়ে আজ তারা নিঃস্ব প্রায়।

চরাঞ্চলে শিক্ষা ও চিকিৎসা ব্যবস্থা এখনও অপর্যাপ্ত। অনেক চরে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয় থাকলেও উচ্চ শিক্ষার সুযোগ সীমিত। ফলে শিক্ষার্থীদের দূরবর্তী এলাকায় যেতে হয়, যা অনেকের পক্ষে সম্ভব হয়ে ওঠে না। একইভাবে চিকিৎসা সেবার অভাবে মানুষ ভোগান্তিতে পড়ছেন। এছাড়া বাল্যবিবাহের প্রবণতাও এখানে উদ্বেগজনক হারে বেশি, যা স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়াচ্ছে।

তবে প্রতিকূলতার মাঝেও আশার আলো দেখা যাচ্ছে। প্রতি বছর বন্যার পর জমিতে পলি জমে মাটি উর্বর হওয়ায় কম খরচে ভালো ফলন পাচ্ছেন কৃষকরা। মরিচ, ভুট্টা, বাদাম, তিল, তিসি, কাউন, পাট, সরিষা, ধানসহ বিভিন্ন ফসল উৎপাদন হচ্ছে বিপুল পরিমাণে। গবাদি পশু পালন করেও অনেক পরিবার স্বাবলম্বী হয়ে উঠেছে। মেছড়া চরের কৃষক রফিক জানান, তিনি এবছর ১০ বিঘা জমিতে ধান ও ৩০ বিঘা জমিতে ভুট্টা চাষ করেছেন। তার মতো অনেকেই এখন কৃষি ও খামার করে স্বচ্ছলতার পথে এগোচ্ছেন।

এ বিষয়ে কাজিপুর উপজেলার সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যক্ষ মোজাম্মেল হক বকুল বলেন, শুষ্ক মৌসুমে চরবাসীর কষ্ট বেশি হলেও অবকাঠামোগত উন্নয়ন কিছুটা স্বস্তি এনে দিয়েছে। বিভিন্ন চরে রাস্তা নির্মাণ, বিদ্যুৎ সংযোগ এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বৃদ্ধির ফলে জীবনযাত্রার মান উন্নত হচ্ছে। এছাড়া যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে কৃষকরা তাদের উৎপাদিত ফসল ভালো দামে বিক্রি করতে পারছেন। সব মিলিয়ে বলা যায়, যমুনা চরের মানুষের জীবন এখনও সংগ্রামময় হলেও কৃষি উন্নয়ন ও অবকাঠামোগত অগ্রগতির ফলে ধীরে ধীরে বদলে যাচ্ছে তাদের অর্থনৈতিক চিত্র।

আই.এ/সকালবেলা

মন্তব্য করুন