সকালবেলা প্রতিবেদক: পুলিশ সুপারদের (এসপি) রাজনৈতিক পরিচয় নিয়ে পুলিশ সদর দপ্তর থেকে একটি গোপনীয় প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে। সম্প্রতি এ প্রতিবেদন অনানুষ্ঠানিকভাবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সহ সরকারের উচ্চপর্যায়ে পাঠানো হয়েছে। এর ভিত্তিতে মাঠপর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ এ পদে পদায়ন শুরু হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। তবে অন্তর্বর্তীকালীন সময়ের আমলে এসপি পদে পদায়ন নিয়ে পুলিশের ভেতরে-বাইরে একধরনের অসন্তোষ বিরাজমান ছিল।
তবে দুইজন বিএনপিপন্থি না হওয়ায় এ পদায়ন নিয়ে কিছুটা ক্ষোভও রয়েছে পুলিশের অভ্যন্তরে। যদিও পুলিশের মধ্যে পেশাদার হিসেবে পরিচিত কিছুসংখ্যক কর্মকর্তা মনে করেন, দেশের বৃহত্তর স্বার্থে এ বাহিনীকে সত্যিকারার্থে দলমতনিরপেক্ষ শক্তিশালী পেশাদার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। যদি কোনো সরকার এমন চিন্তা থেকে কঠিন কাজটা শুরু না করে, তাহলে পুলিশের পেশাদারি নিয়ে প্রশ্ন তুলে কোনো লাভ নেই। প্রতিবেদন অনুযায়ী, এখনো এসপি পদে আওয়ামী আমলের সুবিধাভোগী কিছু কর্মকর্তা কর্মরত রয়েছেন। পাশাপাশি জামায়াতপন্থি কর্মকর্তার সংখ্যাও কম নয়। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় দেশের ৬৪ জেলার এসপিদের মধ্যে বিএনপিপন্থি ১৬, জামায়াতপন্থি ৩২ এবং আওয়ামী ও মধ্যপন্থি মিলিয়ে ১৬ জন কর্মরত ছিলেন। বর্তমান সরকারের সময়ে এ পর্যন্ত নয় জেলায় এসপি বদল করা হয়েছে। জেলাগুলো হলো সিলেট, ময়মনসিংহ, জামালপুর, হবিগঞ্জ, বরিশাল, বগুড়া, মাগুরা, মাদারীপুর ও খাগড়াছড়ি। অন্তর্বর্তীকালীন সময়ের আমলে এসপি পদে পদায়ন নিয়ে পুলিশের ভেতরেও অসন্তোষ ছিল। পুলিশের বড় একটি অংশ মনে করেন, বাহিনীকে দলীয় প্রভাবমুক্ত রেখে পেশাদার প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করা জরুরি।
এ বিষয়ে পুলিশের সাবেক আইজিপি ও বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আব্দুল কাইয়ুম বলেন, ‘আমি তো একটি দল করি। এক অর্থে সরকারের অংশ। তাই এ নিয়ে কোনো মন্তব্য করতে চাই না। এ ধরনের তালিকা করা বা তালিকার ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়া কতটুকু ঠিক হচ্ছে—বিষয়টি নিয়ে দলীয় ফোরামে মতামত দেব। আমি মিডিয়ায় সব কথা বলতে পারব না। বিষয়টা আপনারা বুঝে নিন।’ তবে সাবেক আইজিপি নুরুল হুদা মনে করেন, প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের কোনো রাজনৈতিক পরিচয় থাকা উচিত নয়; পদায়নের ক্ষেত্রে মেধা, যোগ্যতা ও সততাই হওয়া উচিত একমাত্র মানদণ্ড। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পুলিশের উচ্চপর্যায়ের সূত্র জানায়, এসপিদের কর্মজীবনের মূল্যায়নের পাশাপাশি তাদের রাজনৈতিক অবস্থানও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। প্রস্তুত করা প্রতিবেদনের একটি কপি গণমাধ্যমের হাতে এসেছে। প্রতিবেদনে ঢাকা জেলার এসপি মিজানুর রহমানকে আওয়ামী লীগ আমলে পদোন্নতিপ্রাপ্ত হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁর স্ত্রী পিবিআইয়ের আলোচিত পুলিশ সুপার নাইমা সুলতানা। যিনি আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সাবেক এসপি বাবুল আক্তার, প্রবাসী সাংবাদিক ইলিয়াস হোসাইন, বাবুল আক্তারের ভাই হাবিবুর রহমান লাবু ও বাবা আব্দুল ওয়াদুদ মিয়ার বিরুদ্ধে মামলা করেছিলেন। প্রতিবেদনে নারায়ণগঞ্জের এসপি মোহাম্মদ মিজানুর রহমান মুন্সীকে আওয়ামীপন্থি ও আওয়ামী সুবিধাভোগী বলা হয়েছে। গাজীপুরের এসপি শরিফ উদ্দীনকে জামায়াতপন্থি এবং আওয়ামী লীগের আংশিক সুবিধাভোগী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। নরসিংদীর এসপি আব্দুল্লাহ আল ফারুককে বিএনপিপন্থি হলেও আওয়ামী আমলের আংশিক সুবিধাভোগী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। মুন্সীগঞ্জের এসপি মেনহাজুল আলম এবং মানিকগঞ্জের এসপি মোহাম্মদ সারওয়ার আলমকে জামায়াতপন্থি ও আওয়ামী আংশিক সুবিধাভোগী বলা হয়েছে। টাঙ্গাইলের এসপি মুহম্মদ শামসুল আলম সরকারকে বিএনপিপন্থি ও আওয়ামী আংশিক সুবিধাভোগী উল্লেখ করে প্রতিবেদনে তাঁকে সুবিধাবাদী বলা হয়েছে। কিশোরগঞ্জের এসপি ড. এস এম ফরহাদ হোসেনকে জামায়াতপন্থি এবং আওয়ামী সুবিধাবঞ্চিত হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। একইভাবে ফরিদপুরের এসপি মো. নজরুল ইসলাম, গোপালগঞ্জের এসপি মো. হাবীবুল্লাহ এবং রাজবাড়ীর এসপি মোহাম্মদ মনজুর মোরশেদকে জামায়াতপন্থি ও আওয়ামী সুবিধাভোগী বলা হয়েছে। কুমিল্লার এসপি আনিছুজ্জামানকে বিএনপিপন্থি ও আওয়ামী আংশিক সুবিধাভোগী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। ফেনী, রাঙামাটি, চাঁদপুর ও লক্ষ্মীপুরের এসপিদের ক্ষেত্রেও একই ধরনের শ্রেণিবিন্যাস করা হয়েছে; তাদের অনেককে জামায়াতপন্থি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। কক্সবাজারের এসপি এএনএম সাজেদুর রহমানকে বিএনপিপন্থি এবং আওয়ামী আংশিক সুবিধাভোগী বলা হয়েছে। বান্দরবান ও রাঙামাটির এসপিদেরও জামায়াতপন্থি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এ ছাড়া পাবনা, রংপুর, নোয়াখালী ও পঞ্চগড়সহ কয়েক জেলার এসপিদের জামায়াতপন্থি ও আওয়ামী আংশিক সুবিধাভোগী এবং কখনো পদোন্নতিবঞ্চিত হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। নাটোর, জয়পুরহাট, যশোর, বাগেরহাট, নড়াইল, মৌলভীবাজার, নেত্রকোনা, শেরপুর ও নীলফামারীর এসপিদের জামায়াতপন্থি ও আওয়ামী সুবিধাভোগী বলা হয়েছে। তবে গোপন প্রতিবেদনে কয়েকজন এসপিকে মধ্যপন্থি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তাদের আওয়ামী আমলে পদোন্নতিপ্রাপ্ত, সুবিধাবাদী ও আংশিক সুবিধাভোগী বলা হয়েছে। অন্যদিকে সাতক্ষীরা, চট্টগ্রাম, শরীয়তপুর, মেহেরপুর ও সুনামগঞ্জের এসপিদের আওয়ামীপন্থি ও আওয়ামী সুবিধাভোগী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। কুমিল্লার এসপি আনিছুজ্জামান বলেন, পুলিশ সদস্যদের রাজনৈতিক ট্যাগ দেওয়া ঠিক নয়; এটি আইন প্রয়োগে প্রভাব ফেলতে পারে। তবে মিজানুর রহমান বলেন, আওয়ামী লীগ আমলে পদোন্নতি পেলেও ভালো কোনো জায়গায় পোস্টিং ছিল না। ট্রেনিং সেন্টারে কাজ করেছি। তবে পুলিশ সদর দপ্তরের ডিআইজি (প্রশাসন) খোন্দকার নজমুল হাসান বলেন, জেলায় কর্মরত এসপিদের বিষয়ে বিভিন্নভাবে তথ্য সংগ্রহ ও মূল্যায়ন করা হচ্ছে। এর ভিত্তিতে ইতোমধ্যে কয়েকটি জেলায় নতুন এসপি দেওয়া হয়েছে এবং পর্যায়ক্রমে আরও পরিবর্তন আনা হতে পারে।
প্রসঙ্গতি, এরআগে পুলিশ সুপারদের (এসপি) রাজনৈতিক পরিচয় নিয়ে খোদ পুলিশ সদর দপ্তর থেকে গোপনীয় প্রতিবেদন প্রস্তুত করা হয়। সম্প্রতি এ সংক্রান্ত গোপনীয় প্রতিবেদন আনঅফিশিয়াল চ্যানেলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সহ সরকারের উচ্চপর্যায়ে পাঠানো হয়। এর ভিত্তিতে পুলিশের মাঠপর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ এ শীর্ষ পদে সরকারের আস্থাভাজন কর্মকর্তাদের পদায়ন শুরু হয়। প্রতিবেদন অনুযায়ী, এখনো এসপি পদে আওয়ামী আমলের সুবিধাভোগী কর্মকর্তাদের একটি অংশ কর্মরত। এছাড়া জামায়াতপন্থি এসপিদের সংখ্যাও কম নয়।
আই.এ/সকালবেলা