উন্নত জীবনের আশায় দালালের ফাঁদে মরণযাত্রা: স্বজনদের হাহাকার

উন্নত জীবনের আশায় দালালের ফাঁদে মরণযাত্রা: স্বজনদের হাহাকার

ইমতিয়াজ মাহমুদ ইমন, কক্সবাজার: কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফ উপকূলে এখন বিষণ্ণ নীরবতা। গত ৮ এপ্রিল আন্দামান সাগরে মালয়েশিয়াগামী একটি ট্রলার ডুবির ঘটনায় নিখোঁজ কয়েকশ মানুষের স্বজনরা এখন দিশেহারা। কেউ দালালের দুয়ারে ঘুরছেন সংবাদের আশায়, কেউবা বেঁচে ফেরা মানুষের কাছে প্রিয়জনের শেষ চিহ্ন খুঁজছেন। একদিকে প্রিয়জন হারানোর হাহাকার, অন্যদিকে পাচারকারী দালাল চক্রের ‘আশ্বাস’ ও প্রতারণার জালে বন্দী নিখোঁজদের পরিবার।

উখিয়ার রোহিঙ্গা ক্যাম্পের বাসিন্দা রফিকুল ইসলাম ও রাহেলা বেগম—যাঁরা যমের দুয়ার থেকে ফিরে এসেছেন, তাঁদের বয়ানে উঠে এসেছে ট্রলারের ভেতরের পৈশাচিক চিত্র। ২৮০ জন যাত্রী নিয়ে যাত্রা করা সেই ট্রলারে চারটি ‘গোপন কক্ষ’ ছিল, যেখানে বরফের মতো গাদাগাদি করে মানুষদের ঢুকিয়ে দেওয়া হয়। বেঁচে ফেরা রফিকুল জানান, পানির জন্য চিৎকার করলে দালালরা কক্ষে আটকে ঢাকনা বন্ধ করে দিত। এতে দম বন্ধ হয়ে অনেকে প্রাণ হারান; অন্তত ৩৩ জনের নিথর দেহ সাগরে ছুড়ে ফেলে দেয় দালালরা।

উখিয়ার জালিয়াপালং ইউনিয়নের গিয়াস উদ্দিনের ভাই মোহাম্মদ আলী গত ১০ এপ্রিল দালালের খপ্পরে পড়ে মালয়েশিয়ার পথে পা বাড়ান। ট্রলার ডুবির খবর শুনে দালালের কাছে গেলে মিলছে কেবলই মিথ্যা আশ্বাস। গিয়াস উদ্দিন বলেন, 'দালাল বলছে ভাই অন্য ট্রলারে আছে, কিন্তু বেঁচে ফেরা রফিকুল ভাই আমার ভাইয়ের ছবি দেখে চিনতে পেরেছেন। মা শুধু কান্নাকাটি করছেন আর ভাইরে খুঁজছেন।' একই আকুতি নিখোঁজ মোহাম্মদ আলমের ভাই মো. সেলিমের। তিনি এই খুনি দালালদের বিচার দাবি করেন।

ক্যাম্প-১৫ এর রাহেলা বেগম ২০ জন নারীর মধ্যে একমাত্র জীবিত ফিরতে পেরেছেন। কাঠের টুকরো আঁকড়ে দুই দিন এক রাত সমুদ্রে ভেসে থাকা রাহেলা মানসিকভাবে পুরোপুরি বিপর্যস্ত। তাঁর ভাই মো. আয়াছ জানান, বোন কথা বলার শক্তিটুকুও হারিয়েছেন। অনুসন্ধানে জানা যায়, পাচারকারীরা ভালো কাজের প্রলোভন দিয়ে টেকনাফের গোপন গুদামে আটকে রেখে নির্যাতনের পর গভীর সমুদ্রে বড় ট্রলারে তুলে দেয়। উখিয়ার রাজাপালং ইউপি সদস্য হেলাল উদ্দিন একে একটি আন্তর্জাতিক ও দেশীয় সিন্ডিকেটের কাজ বলে উল্লেখ করেন।

শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মো. মিজানুর রহমান জানান, দীর্ঘস্থায়ী রোহিঙ্গা সংকট ও প্রত্যাবাসন না হওয়াই তাঁদের এই বিপজ্জনক পথে পা বাড়াতে বাধ্য করছে। তিনি জানান, সরকার ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর পাশে আছে এবং জড়িত পাচারকারীদের ধরতে অভিযান অব্যাহত রেখেছে। উল্লেখ্য, আন্দামান সাগরের সেই ঘটনায় এ পর্যন্ত মাত্র ৯ জনকে জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে; বাকি প্রায় দুই শতাধিক মানুষের পরিণতি এখনো অজানা।

আই.এ/সকালবেলা

মন্তব্য করুন