সেপ্টেম্বরের শুরুতেই ডেঙ্গু ঊর্ধ্বমুখী, অক্টোবরে বড় ঝুঁকির আশঙ্কা
নিজস্ব প্রতিবেদক: দেশে ডেঙ্গুর মৌসুমি সংক্রমণ এবারও জনস্বাস্থ্যের জন্য চরম উদ্বেগের বার্তা দিচ্ছে। জুন থেকে সংক্রমণ বাড়ার পর জুলাইয়ে তা গতি পায় এবং আগস্টে এসে পরিস্থিতি অত্যন্ত ভয়াবহ রূপ নেয়। সেই ধারাবাহিকতায় চলতি সেপ্টেম্বরের শুরুতেও হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা ঊর্ধ্বমুখী। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, এখনই সমন্বিত উদ্যোগ নিয়ে এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিতকরণ, উপজেলা পর্যায়ে চিকিৎসা সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং কার্যকর জনসম্পৃক্ততা নিশ্চিত করা না গেলে সেপ্টেম্বর ও আগামী অক্টোবরে ডেঙ্গু পরিস্থিতি বড় ধরনের সংকটে রূপ নিতে পারে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছরের ৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সারা দেশে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন মোট ৪০ হাজার ৪৪ জন। এই সময়ে প্রাণঘাতী এডিস মশাবাহিত এই রোগে মারা গেছেন ১১১ জন। ইতোমধ্যে সুস্থ হয়ে হাসপাতাল ছেড়েছেন ৩৭ হাজার ১৯৩ জন এবং বর্তমানে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন ২ হাজার ৭৪০ জন রোগী। সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৫১২ জন, তবে এ সময়ে কোনো মৃত্যুর ঘটনা ঘটেনি। এর আগের দিন ৩ সেপ্টেম্বর এক দিনেই রেকর্ড ১ হাজার ২৫২ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন এবং চারজনের মৃত্যু হয়েছিল।
চলতি বছরের মাসভিত্তিক ডেঙ্গু সংক্রমণ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বছরের প্রথমার্ধে প্রকোপ কিছুটা সহনীয় থাকলেও মাঝামাঝি এসে তা বিস্ফোরণ রূপ নেয়। জানুয়ারিতে ১ হাজার ৮১, ফেব্রুয়ারিতে ৪০৯, মার্চে ৩৫৩, এপ্রিলে ৬৪০ ও মে মাসে ৭১৪ জন রোগী ভর্তি হন। তবে জুনে তা এক লাফে বেড়ে দাঁড়ায় ২ হাজার ৯০৭ জনে এবং জুলাইয়ে পৌঁছায় ৯ হাজার ২০৬ জনে। আগস্টে পরিস্থিতি সব রেকর্ড ছাড়িয়ে যায়; ওই এক মাসেই হাসপাতালে ভর্তি হন ২০ হাজার ৫৩৬ জন ডেঙ্গু রোগী। মৃত্যুর দিক থেকেও আগস্ট ছিল সবচেয়ে প্রাণঘাতী—এ মাসে মারা যান ৪৩ জন। এর আগে জানুয়ারিতে ২, ফেব্রুয়ারিতে ২, মে মাসে ১, জুনে ১৩ ও জুলাইয়ে ৩৬ জনের মৃত্যু রেকর্ড করা হয়।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশে ডেঙ্গুর উচ্চঝুঁকি সাধারণত আগস্ট, সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর পর্যন্ত বিস্তৃত থাকে। বর্ষা মৌসুমে বিভিন্ন পাত্র, ছাদ, ড্রেন ও নির্মাণাধীন ভবনে জমে থাকা স্বচ্ছ পানিতে এডিস মশার লার্ভা দ্রুত বংশবিস্তার করে। ফলে বৃষ্টি থামার কিছুটা সময়ের ব্যবধানে প্রাদুর্ভাব বহুগুণ বৃদ্ধি পায়। ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে রেকর্ড ৭৯ হাজার ৫৯৮ জন আক্রান্ত ও ৩৯৬ জনের মৃত্যু হয়েছিল। এছাড়া ২০২৪ সালে ১ লাখ ১ হাজার ২১৪ জন এবং ২০২৫ সালে ১ লাখ ২ হাজার ৮৬১ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার তথ্য স্মরণ করিয়ে দিয়ে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অতীত পরিসংখ্যানই বলে দিচ্ছে সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর কেন সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. মুশতাক হোসেন জানান, আগস্টের পর রোগী ও মৃত্যুর যে চাপ তৈরি হয়, তা সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর তো বটেই, এমনকি নভেম্বর পর্যন্ত গড়াতে পারে। তিনি বলেন, “কোথায় এডিস মশার ঘনত্ব বাড়ছে এবং কোন কোন এলাকায় ক্লাস্টার আকারে রোগী বাড়ছে—এ দুটি দিক নিবিড় নজরদারিতে আনতে হবে। স্থানীয় মানুষকে সম্পৃক্ত করে ভলান্টিয়ারদের মাধ্যমে ওয়ার্ড ও পাড়া-মহল্লায় পরিচ্ছন্নতা অভিযান চালাতে হবে। সাধারণ মানুষের সুবিধার্থে বিনামূল্যে ডেঙ্গু পরীক্ষার ব্যবস্থা করা দরকার, যাতে জটিলতা শুরুর আগেই দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া সম্ভব হয়। পাশাপাশি রাজধানীর বাইরে জেলা-উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলোর ব্যবস্থাপনা সক্ষমতা বাড়ানো অপরিহার্য।”
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ডা. বে-নজির আহমেদ বলেন, “বৃষ্টিপাত, তাপমাত্রা ও জমে থাকা পানি—এই তিনটি অনুঘটকই এডিসের প্রজননকে বেগবান করে। শুধু ড্রেনে কীটনাশক ছিটিয়ে বা হাসপাতালে শয্যা বাড়িয়ে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। মূল প্রতিরোধ গড়তে হবে হাসপাতালের বাইরে, কমিউনিটির সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে।”
চলতি বছর উদ্বেগের অন্যতম বড় কারণ ডেঙ্গু ভাইরাসের রূপান্তর বা সেরোটাইপ পরিবর্তন। সাম্প্রতিক গবেষণায় দেশে ‘ডেন-৩’ (DENV-3) সেরোটাইপের উপস্থিতি উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পাওয়ার তথ্য মিলেছে। ঢাকায় আক্রান্ত ৭১ জন রোগীর নমুনা পরীক্ষায় ৯১ দশমিক ৫ শতাংশ ক্ষেত্রে ডেন-৩ এবং ৮ দশমিক ৫ শতাংশে ডেন-২ শনাক্ত হয়েছে। পূর্বে ভিন্ন সেরোটাইপে আক্রান্ত ব্যক্তিরা নতুন সেরোটাইপে আক্রান্ত হলে শারীরিক জটিলতার ঝুঁকি বাড়ে।
চিকিৎসকেরা সতর্ক করে জানিয়েছেন, ডেঙ্গুর ক্ষেত্রে অনেক সময় জ্বর কমে যাওয়ার পরই চরম সংকটকাল শুরু হয়। এ সময় তীব্র পেটব্যথা, বারবার বমি হওয়া, নাক-মুখ বা মাড়ি দিয়ে রক্তপাত, অতিরিক্ত দুর্বলতা, শ্বাসকষ্ট, প্রস্রাব কমে যাওয়া কিংবা অতিরিক্ত অস্থিরতার মতো ‘বিপদচিহ্ন’ দেখা দিলে কালবিলম্ব না করে রোগীকে দ্রুত নিকটস্থ হাসপাতালে নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।