রংপুরের ঐতিহ্যবাহী শতরঞ্জি বিশ্ববাজারে ছড়াচ্ছে আলো

প্রকাশ: বুধবার, ০৩ জুন ২০২৬, ০৪:০৭ অপরাহ্ণ
রংপুরের ঐতিহ্যবাহী শতরঞ্জি বিশ্ববাজারে ছড়াচ্ছে আলো
লাইফস্টাইল ডেস্ক : ঘাঘট নদীর কোল ঘেঁষে, রংপুর বিভাগীয় শহরের উপকণ্ঠে দাঁড়িয়ে আছে এক শত বছরের ইতিহাসবাহী গ্রাম নিসবেতগঞ্জ। সময়ের দীর্ঘ ও আঁকাবাঁকা পথ পেরিয়ে আজও এই নিভৃত গ্রামে পরম মমতায় বেঁচে আছে সুতায় আঁকা স্বপ্ন আর রঙে রঙে গাঁথা উত্তরবঙ্গের লোকঐতিহ্য ‘শতরঞ্জি’। সাধারণ বাঁশ, দড়ি আর সুতার যুগলবন্দীতে তৈরি এই অনন্য বুনন শিল্পের প্রতিটি সুনিপুণ নকশার ভেতরে লুকিয়ে আছে শত বছরের গৌরবগাথা, রাজা-বাদশাদের আভিজাত্য আর বাঙালি লোকশিল্পের অহংকার। ব্রিটিশ আমলে রংপুরের তৎকালীন কালেক্টর মি. নিসবেতের মুগ্ধতা থেকে যে শিল্প পেয়েছিল এক প্রাতিষ্ঠানিক বৈশ্বিক পরিচয়, সেই শতরঞ্জিই আজ বিশ্বদরবারে বহন করছে বাংলাদেশের শৈল্পিক আত্মপরিচয় এবং একই সাথে দেশের জন্য বয়ে আনছে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা ও বৈশ্বিক সম্মান।

আজ বুধবার (৩ জুন) অনলাইন সংস্করণে প্রকাশিত ‘ফিচার ও ঐতিহ্য’ এবং ‘গ্রামীণ অর্থনীতি ও কারুশিল্প’ বিভাগের এক বিশেষ অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে রংপুরের এই গৌরবময় শিল্পের আদ্যোপান্ত বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হলো।

ইতিহাসবিদদের মতে, ত্রয়োদশ শতাব্দী থেকেই রংপুর অঞ্চলে শতরঞ্জি বুননের প্রচলন ছিল। ১৯১২ সালে প্রকাশিত বিখ্যাত ‘রংপুর গেজেটিয়ার’-এ ইতিহাসবিদ উইলিয়াম হান্টার উল্লেখ করেন, ১৮৩০ সালে তৎকালীন রংপুরের ইংরেজ কালেক্টর মি. নিসবেত সরেজমিন এই বুনন শিল্প দেখে এতটাই মুগ্ধ হয়েছিলেন যে, পরবর্তীতে তাঁর নামানুসারেই এই গ্রামের নামকরণ করা হয় ‘নিসবেতগঞ্জ’। মোগল সম্রাট আকবরের বিলাসবহুল দরবার থেকে শুরু করে ব্রিটেনের রাজপ্রাসাদের সভাকক্ষ—সবখানেই এই শতরঞ্জি আভিজাত্যের প্রতীক হিসেবে শোভাবর্ধন করত। প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের কালজয়ী ‘ধাত্রী দেবতা’ উপন্যাসেও ক্ষয়িষ্ণু জমিদার পরিবারে শতরঞ্জির সামাজিক মর্যাদার এক নিখুঁত বর্ণনা পাওয়া যায়।

একটি মানসম্মত শতরঞ্জি তৈরি মূলত চারটি প্রধান ধাপে সম্পন্ন হয়—কাঁচামাল সংগ্রহ, প্রাথমিক প্রস্তুতি, প্রকৃত বুনন ও নকশা এবং চূড়ান্ত ফিনিশিং। সাধারণত সুতি, মখমল এবং পাটের সুতা দিয়ে এই শতরঞ্জি তৈরি করা হয়। বাজার থেকে সুতা কিনে তা আকর্ষণীয় রঙে রাঙিয়ে রোদে শুকানো হয় এবং পরে বাঁশের ফ্রেমে ১০ থেকে ৩৫ ফুট পর্যন্ত টানা দেওয়া হয়। শতরঞ্জির সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো—এর কোনো উল্টো বা সোজা পিঠ নেই; দুই দিকেই সমান নিখুঁত নকশা ও রঙ থাকে এবং এটি দুই পিঠেই সমানভাবে ব্যবহারযোগ্য।

আগেকার দিনে ঐতিহ্যবাহী নকশা হিসেবে হাতির পা, জাফরি, ইটকাটি, নাটাই, রাজা-রানী, পালকি ও গ্রামবাংলার প্রাকৃতিক দৃশ্য ফুটিয়ে তোলা হলেও বর্তমানে এতে বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধ, হরেক রকম আধুনিক বুটিদার জরি ও বিভিন্ন উপদেশ বাণী স্থান পাচ্ছে। মেঝেতে বিছানোর পাশাপাশি শতরঞ্জি দিয়ে এখন আন্তর্জাতিক মানের টেবিল ম্যাট, ওয়ালম্যাট এবং কুশন কাভারও তৈরি করা হচ্ছে।

রংপুরের এই শতরঞ্জি শিল্পের সবচেয়ে সুন্দর দিক হলো—এর বুনন কাজের সাথে প্রায় শতভাগ গ্রামীণ নারী যুক্ত রয়েছেন। স্থানীয় রাধাকৃষ্ণপুর এলাকার কারিগর জেবিন আক্তার ও গোপীনাথপুরের ঝর্ণা বেগম জানান, ঘরের যাবতীয় গৃহস্থালির কাজ শেষ করে তাঁরা প্রতিদিন সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত কারখানায় কাজ করেন। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা না থাকলেও কেবল মেধা ও বংশপরম্পরায় পাওয়া দক্ষতার জোরে একেকজন নারী শ্রমিক দৈনিক ২০০ থেকে ৩০০ টাকা পর্যন্ত অনায়াসে আয় করছেন, যা তাঁদের সন্তানদের পড়াশোনা ও পারিবারিক সচ্ছলতা নিশ্চিত করছে।

বর্তমানে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের পাশাপাশি দেশের বড় বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানও এই শিল্পের প্রসারে এগিয়ে এসেছে। এর মধ্যে ‘কারুপণ্য রংপুর লিমিটেড’ অন্যতম, যাদের ৫টি বিশাল কারখানায় বর্তমানে হাজার হাজার নারী শ্রমিক কাজ করছেন। এ ছাড়া নিসবেতগঞ্জের চারুশী শতরঞ্জি, শতরঞ্জি পল্লী ও রংপুর ক্রাফটসহ বিভিন্ন কারখানায় বর্তমানে সরাসরি ৮ হাজারেরও বেশি মানুষ জীবিকা নির্বাহ করছেন।

২০২১ সালে রংপুরের শতরঞ্জি বাংলাদেশের অফিশিয়াল ‘ভৌগোলিক নির্দেশক’ (GI) পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার পর থেকে বিশ্ববাজারে এর ব্র্যান্ডভ্যালু রাতারাতি বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। দৃষ্টিনন্দন বুননশৈলীর কারণে বর্তমানে ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা ও এশিয়ার প্রায় ৭৭টি উন্নত দেশে এই শতরঞ্জি সফলতার সাথে রপ্তানি হচ্ছে। এর মধ্যে জার্মানি, ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য, নেদারল্যান্ডস, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া এবং অস্ট্রেলিয়া অন্যতম। প্রতি বছর বাংলাদেশ শুধুমাত্র এই শতরঞ্জি খাত থেকেই প্রায় ৪০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার (৪ কোটি ডলার) সমপরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করছে।

শতরঞ্জি শিল্পের এই জয়যাত্রাকে আরও মসৃণ করতে বাংলাদেশ বিসিক এবং বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন বোর্ড (BRDB) যৌথভাবে কাজ করছে। বিআরডিবির ‘উত্তরাঞ্চলের দরিদ্রদের কর্মসংস্থান নিশ্চিতকরণ কর্মসূচি’ (উদকনিক)-এর অধীনে ইতোমধ্যে প্রায় সাড়ে ৮ হাজার গ্রামীণ নারীকে শতরঞ্জির আধুনিক প্রশিক্ষণ ও সহজ শর্তে ঋণ দেওয়া হয়েছে।

উদকনিক কর্মসূচির রংপুরের পরিচালক সহিদুর রহমান সুমন এক অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক তথ্য শেয়ার করে বলেন, “শতরঞ্জির বাজারকে সরাসরি বিশ্বমঞ্চে পৌঁছে দিতে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় (LGRD) মন্ত্রণালয়ের বিশেষ উদ্যোগে আগামী ১ জুলাই থেকে একটি আন্তর্জাতিক মানের এক্সক্লুসিভ ওয়েবসাইট চালু হতে যাচ্ছে। এই ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মটি পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হলে বিশ্বের যেকোনো প্রান্তের বিদেশি বা দেশি ক্রেতারা সরাসরি মাঠপর্যায়ের গ্রামীণ উৎপাদকের সাথে যোগাযোগ করে পণ্য কিনতে পারবেন। এতে মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমবে এবং গ্রামীণ নারীদের লভ্যাংশ সরাসরি তাঁদের হাতে পৌঁছাবে, যা উত্তরবঙ্গের অর্থনৈতিক চাকা ও নারীবাদকে আরও বহুদূর এগিয়ে নিয়ে যাবে।”

জান্নাত সকালবেলা

মন্তব্য করুন