কলম্বাসের ৫০০ বছর আগেই উত্তর আমেরিকায় পা রেখেছিলেন ভাইকিংরা
অনলাইন ডেস্ক: স্কুলের পাঠ্যবই থেকে শুরু করে বিশ্ব ইতিহাসের প্রচলিত বয়ানে ক্রিস্টোফার কলম্বাসকে ১৪৯২ সালে আমেরিকা আবিষ্কারের মূল কৃতিত্ব দেওয়া হলেও, আধুনিক প্রত্নতত্ত্ব ও ঐতিহাসিক গবেষণা সম্পূর্ণ ভিন্ন এক বাস্তবতার কথা তুলে ধরে। ঐতিহাসিক সত্য হলো, কলম্বাসের প্রায় ৫০০ বছর আগেই উত্তর আমেরিকার মাটিতে নিজেদের স্থায়ী পদচিহ্ন এঁকেছিলেন ভাইকিং বা নর্স অভিযাত্রীরা।
১৯৬০ সালে কানাডার নিউফাউন্ডল্যান্ডের ‘ল’আঁস ও মেডোজ’ অঞ্চলে ভাইকিংদের একটি প্রাচীন বসতি বা শিবিরের সন্ধান মেলে। পরবর্তীকালে ২০২১ সালে উন্নত কার্বন ডেটিং বা কালনির্ধারণ পদ্ধতি প্রয়োগ করে গবেষকেরা নিশ্চিত হন যে, প্রায় এক হাজার বছর আগেই সেখানে ভাইকিংরা বসবাস করতেন। ধারণা করা হয়, উত্তর আমেরিকার মূল ভূখণ্ডের আরও গভীরে অনুসন্ধান ও বাণিজ্যের সুবিধার্থে জায়গাটিকে তারা একটি অগ্রবর্তী ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন।
ক্রিস্টোফার কলম্বাস ১৪৯২ সালের ১২ অক্টোবর আটলান্টিক মহাসাগর পাড়ি দিয়ে বাহামা দ্বীপপুঞ্জে পৌঁছেছিলেন ঠিকই, তবে বর্তমান আমেরিকা মহাদেশে পা রাখা প্রথম ইউরোপীয় তিনি ছিলেন না। শতাব্দীর পর শতাব্দী পেরিয়ে ভাইকিংদের সেই রোমাঞ্চকর অভিযানের গল্পগুলো লিপিবদ্ধ হয়েছিল বিভিন্ন প্রাচীন 'সাগা' বা নর্স উপাখ্যানে।
চতুর্দশ শতকের অত্যন্ত মূল্যবান আইসল্যান্ডীয় পাণ্ডুলিপি ‘ফ্লাতেইয়ারবোক’ বা ‘ফ্লাতেই দ্বীপের বই’-তে দশম শতকে গ্রিনল্যান্ডে নর্সদের বসতি স্থাপন এবং পরবর্তীতে উত্তর আমেরিকা আবিষ্কার ও সেখানে বসতি গড়ার রোমাঞ্চকর ইতিহাস সংরক্ষিত রয়েছে। এসব ঐতিহাসিক দলিলে স্পষ্ট প্রমাণ মেলে যে, ইউরোপীয়রা বহু আগেই এই মহাসাগরীয় পথ পাড়ি দিয়ে আমেরিকায় যাতায়াত করতেন।
এক লাফে বিশাল আটলান্টিক মহাসাগর পাড়ি দেননি ভাইকিংরা। আনুমানিক ৮৭০ খ্রিষ্টাব্দে তারা প্রথমে আইসল্যান্ডে পৌঁছান। এরপর প্রায় এক শতাব্দী পর পা রাখেন গ্রিনল্যান্ডে। সেখান থেকে বর্তমান কানাডার বাফিন দ্বীপে পৌঁছাতে ডেভিস প্রণালি হয়ে প্রায় ২০০ মাইলের জলপথ পাড়ি দেন তারা। নর্স নাবিকেরা এই দ্বীপটির নাম দিয়েছিলেন ‘হেলুল্যান্ড’ বা পাথরের ফলকের ভূমি।
এরপর উপকূলরেখা ধরে আরও দক্ষিণে অগ্রসর হয়ে তারা বর্তমান লাব্রাডরে পৌঁছান, যার নাম দেন ‘মার্কল্যান্ড’ বা বনভূমি। সেখান থেকে আরও দক্ষিণে গিয়ে তারা এক উর্বর অঞ্চলের সন্ধান পান, যার নাম রাখেন ‘ভিনল্যান্ড’ বা আঙুরলতার ভূমি। আইসল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের মতে, সাগাগুলোতে কেবল একবার ঘুরে আসার কথা বলা হয়নি; বরং বিভিন্ন অঞ্চলে থেমে তাঁরা কয়েক বছর ধরে সেখানে নিয়মিত যাতায়াত ও বসতি স্থাপন করেছিলেন।
ভাইকিংদের এই বিশ্বজয়ের ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নামগুলোর একটি হলো—এরিক দ্য রেড। নরওয়েতে হত্যাকাণ্ডের দায়ে নির্বাসিত হয়ে তাঁর পরিবার আইসল্যান্ডে আশ্রয় নেয়। পরবর্তীতে ৯৮২ খ্রিষ্টাব্দে আইসল্যান্ডেও বিরোধে জড়িয়ে পড়লে তাঁকে নির্বাসিত করা হয়। এই নির্বাসনের মাধ্যমেই তিনি প্রথম গ্রিনল্যান্ড আবিষ্কার করেন এবং সেখানে স্থায়ী মানববসতি গড়ে তোলেন। গ্রিনল্যান্ডের এই বসতি প্রায় ৫০০ বছর টিকে ছিল।
পরবর্তী সময়ে এরিক দ্য রেডের সুযোগ্য পুত্র লেইফ এরিকসনের নেতৃত্বে ভাইকিং নাবিকেরা সেখান থেকে সমুদ্র পাড়ি দিয়ে একাধিকবার উত্তর আমেরিকার মূল ভূখণ্ডে যাতায়াত করেছিলেন। প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ সাক্ষ্য দেয় যে, মধ্যযুগের পুরো সময়জুড়েই গ্রিনল্যান্ড এবং উত্তর আমেরিকার উপকূলের মাঝে নিয়মিত নৌচলাচল ও বাণিজ্যিক যোগাযোগ বজায় ছিল।
ঐতিহাসিক ও গবেষকদের মতে, ১৪৯২ সালে কলম্বাস যখন বাহামা দ্বীপপুঞ্জের উপকূলে নোঙর করেন, তখন ভাইকিংদের মুখে মুখে ফেরা ‘ভিনল্যান্ড’ বা উত্তরের এই ভূখণ্ডের কথা তাঁর সম্পূর্ণ অজানা ছিল না। ১৪৯৭-৯৮ সালের শীতকালে জন ডে নামের এক ইংরেজ নাবিক ক্রিস্টোফার কলম্বাসকে একটি চিঠি লিখেছিলেন, যেখানে উল্লেখ ছিল যে ইংল্যান্ডের ব্রিস্টল থেকে আসা অভিজ্ঞ নাবিকেরা তাঁর বহু বছর আগে থেকেই নিয়মিতভাবে এই উত্তরাঞ্চলীয় জলপথে যাতায়াত করে আসছেন।
বিশেষজ্ঞদের ধারণা, কলম্বাস হয়তো সচেতনভাবেই কানাডার উপকূল বা ভাইকিংদের চেনা ‘ভিনল্যান্ড’ অঞ্চলটি এড়িয়ে গিয়েছিলেন, কারণ তাঁর মূল লক্ষ্য ছিল ভিন্ন কোনো সমুদ্রপথ ধরে সুদূর প্রাচ্যের ধনসম্পদের সন্ধান করা। ফলে আধুনিক বিশ্বে ক্রিস্টোফার কলম্বাসের অবদান স্মরণীয় হলেও, উত্তাল আটলান্টিকের বুকে প্রথম বিজয়ের নিশান ওড়ানোর ইতিহাস যে সেই নির্ভীক ভাইকিংদেরই প্রাপ্য—তা আজ অনস্বীকার্য ঐতিহাসিক সত্য।