যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল সম্পর্কে টানাপোড়েন: নেতানিয়াহুর ‘ট্রাম্প কার্ড’ কি অকার্যকর?

প্রকাশ: বুধবার, ২৯ জুলাই ২০২৬, ০২:৫৯ অপরাহ্ণ
যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল সম্পর্কে টানাপোড়েন: নেতানিয়াহুর ‘ট্রাম্প কার্ড’ কি অকার্যকর?
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত—উভয় কৌশলগত দিক থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নিজের সুদৃঢ় সম্পর্ককে ক্ষমতার প্রধান অপরিহার্য হাতিয়ার হিসেবে বহুকাল ধরে ব্যবহার করে এসেছেন ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু। অনর্গল মার্কিন উচ্চারণে কথা বলার দক্ষতা ও ওয়াশিংটনের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি বোঝার ক্ষমতার জোরে বহু মার্কিন প্রেসিডেন্টকে তিনি ব্যক্তিগত ও রাষ্ট্রীয় স্বার্থে পাশে রাখতে সক্ষম হলেও, বর্তমানে চিত্রটি সম্পূর্ণ উল্টো।

ধারণা করা হয়েছিল, বর্তমান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পই হয়তো তেল আবিব ও নেতানিয়াহুর জন্য সবচেয়ে বেশি অনুকূল মিত্র। বিশেষ করে ইরানের বিরুদ্ধে যৌথ সামরিক অভিযানে সম্মত হওয়ার পর সেই ধারণা তীব্র রূপ নেয়। তবে সেই ইরান যুদ্ধ হঠাৎ থমকে যাওয়া, ইসরায়েলের সামরিক মতামত উপেক্ষা করে ট্রাম্পের একতরফা মধ্যপ্রাচ্য নীতি অনুসরণ এবং খোদ যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে ইসরায়েলি নীতির ওপর তীব্র সমালোচনার মধ্যে এখন ইসরায়েলেই প্রশ্ন উঠেছে—নেতানিয়াহুর বহুল আলোচিত ‘ট্রাম্প কার্ড’ কি তবে কার্যকারিতা হারাচ্ছে?

এমন এক চরম নাজুক সময়ে নেতানিয়াহু এই ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছেন যখন চলতি ২০২৬ সালের অক্টোবরের শেষের দিকে ইসরায়েলে কঠিন সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। অন্যদিকে, তাঁর বিরুদ্ধে দেশীয় দুর্নীতির বিচার প্রক্রিয়া এখনো চলমান। এই পরিস্থিতিতে ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর প্রথমবার ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে সরাসরি সাক্ষাৎ করতে গতকাল মঙ্গলবার ওয়াশিংটন সফর করেন নেতানিয়াহু। আপাতদৃষ্টিতে ট্রাম্পের সঙ্গে আলোকচিত্র ধারণ ও সুসম্পর্ক ইসরায়েলি জনগণের সামনে ফের তুলে ধরার চেষ্টা করলেও জল গড়িয়েছে অনেক দূর।

ট্রাম্পের সঙ্গে নেতানিয়াহুর সম্পর্কের টানাপোড়েন মূলত ইরান যুদ্ধ স্থবির হওয়ার পর থেকেই জনসম্মুখে দৃশ্যমান হয়। গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে উঠে আসে, সামরিক অভিযানে তেহরান সরকারের পতন ঘটানোর অলীক প্রতিশ্রুতি দিয়ে ট্রাম্পকে যুদ্ধে নামিয়েছিলেন নেতানিয়াহু। তাছাড়া, অধিকৃত অঞ্চলের চরমপন্থী ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতাকে অনবরত প্রশ্রয় দেওয়া ওয়াশিংটনে তীব্র ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে—যার অংশ হিসেবে একজন মার্কিন সিনেটরকে বেআইনিভাবে আটকের মতো বিতর্কিত ঘটনা ঘটে। পাশাপাশি, মার্কিন প্রশাসন কর্তৃক তুরস্কের কাছে এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান বিক্রির তোড়জোড় এবং সৌদি আরবের সঙ্গে কৌশলগত পারমাণবিক সহযোগিতা চুক্তির পথে এগিয়ে যাওয়ার পদক্ষেপ দুই দেশের সুসম্পর্ককে খাদে ফেলেছে।

নিউ ইয়র্কে নিযুক্ত ইসরায়েলের সাবেক রাষ্ট্রদূত ও আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক অলন পিনকাস আল জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে কড়া প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে বলেন, "নেতানিয়াহুর এই ওয়াশিংটন সফরের প্রধান উদ্দেশ্য অত্যন্ত স্বার্থপর। তিনি সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহামের শেষকৃত্যে যোগ দেওয়ার অজুহাতে যুক্তরাষ্ট্রে এলেও আসল মূল উদ্দেশ্য দুটি: প্রথমত, ইসরায়েলের ভোটারদের দেখানো যে ট্রাম্প এখনো তাঁর বন্ধু এবং দ্বিতীয়ত, নিজের দুর্নীতির বিচারে ট্রাম্প যেন পুনরায় তাঁকে রাষ্ট্রপতির ক্ষমা (Pardon) প্রদানের আহ্বান জানান—যেমনটি নজিরবিহীনভাবে ২০২৫ সালের নভেম্বরে ট্রাম্প করেছিলেন।"

তবে নেতানিয়াহুর ভাবমূর্তি বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে সর্বনিম্ন পর্যায়ে গিয়ে ঠেকেছে। এমনকি মার্কিন রিপাবলিকান শিবিরের শীর্ষ পডকাস্টার টাকার কার্লসন, সাবেক প্রতিনিধি মার্জরি টেলর গ্রিন এবং মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সও ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের তীব্র সমালোচনা করছেন। জেডি ভ্যান্স ইঙ্গিত দেন, মধ্যস্থতার মাধ্যমে ইরান যুদ্ধ বন্ধের কূটনৈতিক প্রচেষ্টাকে ইসরায়েল সরকারের কিছু ব্যক্তি অকার্যকর করার ষড়যন্ত্র করছিল।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা স্পষ্ট ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, ট্রাম্প নিজের ব্যবসায়ী মানসিকতার ওপর ভিত্তি করেই নীতি নির্ধারণ করছেন। সম্প্রতি এয়ার ফোর্স ওয়ানে ভ্রমণকালে তুরস্কের কাছে এফ-৩৫ সামরিক বিমান বিক্রির বিষয়ে নেতানিয়াহুর কঠোর বিরোধিতার জবাবে ট্রাম্প অত্যন্ত রূঢ়ভাবে সাংবাদিকদের বলেন, "আমরা কার কাছে কী অস্ত্র বিক্রি করব, তা আমাকে বা যুক্তরাষ্ট্রকে অন্য কেউ বলে দেওয়ার অধিকার রাখে না।"

কিংস কলেজ লন্ডনের বিশিষ্ট নিরাপত্তা বিশ্লেষক আহরন ব্রেগম্যান গোটা পরিস্থিতির যৌক্তিক ব্যাখ্যা দিয়ে বলেন, "নেতানিয়াহু এমন একসময়ে ওয়াশিংটনে গিয়েছেন যখন ট্রাম্পের উপদেষ্টা ও আমেরিকানদের চোখে তিনি একপ্রকার বর্জনীয় ব্যক্তিতে পরিণত হয়েছেন। ট্রাম্পকে তাঁর অনিচ্ছার এক দীর্ঘ যুদ্ধে টেনে নিয়ে গিয়ে কৌশলগত মহাবিপর্যয় তৈরি করার জন্য তাকেই দায়ী ভাবা হচ্ছে। ট্রাম্প এখন আর তাঁকে 'ঘরের সবচেয়ে বুদ্ধিমান ব্যক্তি' হিসেবে গণ্য করছেন না।"

যদিও নির্বাচন সামনে রেখে উভয় পক্ষ প্রকাশ্যে কোনো বিরোধ দেখাবে না, তবে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষার ক্ষেত্রে নিজেকে ‘অনন্য ও একমাত্র অপরিহার্য’ ব্যক্তিত্ব হিসেবে তুলে ধরার নেতানিয়াহুর ক্ষমতা এখন অনেকটাই সংকুচিত। নেতানিয়াহুর প্রাক্তন রাজনৈতিক সহকারী মিচেল বারাকও ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, ট্রাম্প খুব সহজেই নেতানিয়াহুকে বিদায় জানিয়ে আগামী নির্বাচনে ইসরায়েলের নতুন কোনো বিকল্প প্রধানমন্ত্রীকে সমর্থন জানিয়ে বসতে পারেন।

মন্তব্য করুন