হেপাটাইটিস কি নীরব ঘাতক? হেপাটাইটিসের বিপদচিহ্ন ও করণীয়

প্রকাশ: সোমবার, ২০ জুলাই ২০২৬, ০৫:২৬ অপরাহ্ণ
হেপাটাইটিস কি নীরব ঘাতক? হেপাটাইটিসের বিপদচিহ্ন ও করণীয়

অনলাইন ডেস্ক :  হেপাটাইটিস এমন একটি রোগ, যা অনেক সময় কোনো স্পষ্ট বা বড় ধরনের লক্ষণ প্রকাশ না করেই দীর্ঘদিন মানবদেহে বাসা বেঁধে থাকে। এই নিরবচ্ছিন্ন ও ছদ্মবেশী বৈশিষ্ট্যের কারণেই চিকিৎসা বিজ্ঞানে হেপাটাইটিসকে বলা হয় ‘নীরব ঘাতক’।

তবে শরীরের কোনো অঙ্গ বিশেষ করে লিভার যখন কার্যক্ষমতা হারাতে শুরু করে, তখন কিছু স্পষ্ট সতর্ক সংকেত বা বিপদচিহ্ন দেখা দেয়। ভারতীয় গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজিস্ট ডা. রাজেশ বাথিনির মতে, এই লক্ষণগুলো দেখা দেওয়ার সাথে সাথেই কোনো প্রকার অবহেলা না করে দ্রুত রোগীকে জরুরি চিকিৎসাসেবা দেওয়া অত্যন্ত প্রয়োজন।

যে লক্ষণগুলো দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে যাবেন:

  • ত্বক ও চোখের অতিরিক্ত হলুদ ভাব: হেপাটাইটিসে চোখ ও ত্বক হালকা হলুদ হওয়া সাধারণ বিষয় হলেও, যদি এক-দুই দিনের মধ্যে হলুদ রঙ আশঙ্কাজনকভাবে গাঢ় রূপ নেয়, প্রস্রাব অতিরিক্ত লালচে বা গাঢ় এবং পায়খানার রঙ ফ্যাকাশে হয়ে যায়—তবে তা লিভারের তীব্র অকার্যকারিতার স্পষ্ট লক্ষণ।

  • হেপাটিক এনসেফালোপ্যাথি বা মানসিকভাবে অসংলগ্নতা: লিভার যদি রক্তের ক্ষতিকর টক্সিন বা অ্যামোনিয়া অপসারণ করতে না পারে, তবে তা মস্তিষ্কে বিষাক্ত প্রভাব ফেলে। ফলে রোগী অসংলগ্ন কথাবার্তা বলেন, অতিরিক্ত তন্দ্রাচ্ছন্ন বা ঘুম ঘুম ভাব অনুভব করেন, আচরণের আকস্মিক পরিবর্তন ঘটে অথবা হাত কাঁপতে থাকে। দ্রুত সময়ে চিকিৎসা না পেলে রোগী কোমাতেও চলে যেতে পারেন।

  • রক্ত বমি বা কালো পায়খানা: পরিপাকতন্ত্রে রক্তক্ষরণের ফলে মুখ দিয়ে রক্ত বমি কিংবা আলকাতরার মতো কালো পায়খানা হতে পারে। এটি মারাত্মক জরুরি অবস্থা নির্দেশ করে।

  • অস্বাভাবিক রক্তক্ষরণ ও কালশিটে: লিভার ঠিকভাবে রক্ত জমাট বাঁধার উপাদান (ক্লটিং ফ্যাক্টর) তৈরি করতে না পারলে মাড়ি বা নাক থেকে রক্ত পড়া এবং সামান্য আঘাতেই শরীরে বড় বড় কালশিটে দাগ ফুটে ওঠে।

  • পেটে পানি জমা ও তীব্র জ্বর: পেটে অতিরিক্ত পানি আসা (অ্যাসাইটিস) বা সংক্রমণের কারণে পেটে তীব্র ব্যথা হতে পারে। একই সাথে কাঁপুনি দিয়ে উচ্চ জ্বর হওয়া শরীরে মারাত্মক ইনফেকশন ছড়িয়ে পড়ার ইঙ্গিত দেয়।

  • প্রস্রাব কমে যাওয়া ও অবিরাম বমি: প্রস্রাবের পরিমাণ হঠাৎ কমে যাওয়া লিভারের জটিলতার ফলে কিডনি বিকল হওয়ার পূর্বলক্ষণ। পাশাপাশি অনবরত বমির কারণে দেহে পানিশূন্যতা তৈরি হয়, যা লিভারের ওপর চরম চাপ ফেলে।

উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছেন যারা:

বিশেষজ্ঞদের মতে, হেপাটাইটিস সবার শরীরে সমান তীব্রতায় প্রভাব ফেলে না। গর্ভবতী নারী (বিশেষ করে যারা হেপাটাইটিস ই-তে আক্রান্ত), বয়স্ক ব্যক্তি, পূর্ব থেকেই লিভারের সমস্যায় ভুগতে থাকা রোগী এবং ডায়াবেটিস বা ফ্যাটি লিভারে আক্রান্ত ব্যক্তিরা এই রোগের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ শ্রেণিতে পড়েন।

কেন দ্রুত চিকিৎসা জরুরি?

ডা. রাজেশ বাথিনির ভাষ্যমতে, অনেক সময় প্রাথমিক লক্ষণ দেখা দেওয়ার কয়েক দিনের মধ্যেই রোগী 'অ্যাকিউট লিভার ফেইলিউর' বা তীব্র লিভার বিকলতায় আক্রান্ত হতে পারেন। লিভারের স্বাভাবিকভাবে নিজেকে পুনর্গঠন করার ক্ষমতা থাকলেও জটিলতা একটি নির্দিষ্ট মাত্রা অতিক্রম করলে সেই ক্ষমতা নষ্ট হয়ে যায়। তখন নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (আইসিইউ) বা লিভার প্রতিস্থাপনের (ট্রান্সপ্লান্ট) মতো কঠিন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।

বিপদ সংকেত দেখা দিলে করণীয়:

বিপদচিহ্ন দেখা দেওয়ার সাথে সাথে আতঙ্কিত না হয়ে দ্রুত রোগীকে নিকটস্থ উন্নত হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে। চিকিৎসকের সুনির্দিষ্ট পরামর্শ ছাড়া কোনো ব্যথানাশক বা অতিরিক্ত মাত্রায় প্যারাসিটামল সেবন করা একেবারেই অনুচিত, কারণ এটি লিভারের ক্ষতি আরও বাড়িয়ে দেয়। রোগী মুখে খাবার বা পানি রাখতে না পারলে অনতিবিলম্বে স্যালাইনের ব্যবস্থা করার জন্য বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে।

মন্তব্য করুন