ঈদ সামনে রেখে সক্রিয় জাল নোটের সিন্ডিকেট, বাজারে ছাড়ার ছক শতকোটি টাকা

ঈদ সামনে রেখে সক্রিয় জাল নোটের সিন্ডিকেট, বাজারে ছাড়ার ছক শতকোটি টাকা

পবিত্র ঈদুল ফিতর যত ঘনিয়ে আসছে, ততই সক্রিয় হয়ে উঠছে জাল নোটের কারবারিরা। রাজধানী ঢাকা ও আশপাশের এলাকায় সক্রিয় রয়েছে অন্তত অর্ধশতাধিক জাল নোট সিন্ডিকেট। ইফতার ও কেনাকাটার ভিড়কে পুঁজি করে শতকোটি টাকার জাল নোট বাজারে ছাড়ার ছক কষেছে এসব চক্র।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, রাজধানী ঢাকা ও আশপাশের এলাকায় সক্রিয় রয়েছে অর্ধশতাধিক জাল নোট সিন্ডিকেট। চক্রের লক্ষ্য— শতকোটি টাকার জাল নোট বাজারে ছড়িয়ে দেওয়া। রাজধানীর অভিজাত শপিংমল থেকে শুরু করে গ্রামের হাটবাজার— সবখানেই জাল নোট চক্রের দৌরাত্ম্য বাড়ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। এমন তথ্যের ভিত্তিতে অভিযান জোরদার করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

অনলাইন ও কুরিয়ারে জাল টাকার কারবার

অনুসন্ধানে জানা গেছে, বর্তমানে জাল নোটের কারবার কেবল অন্ধকার গলিতে সীমাবদ্ধ নেই। ফেসবুক ও ইউটিউবে শত শত গ্রুপ ও চ্যানেল খুলে চলছে ‘ধামাকা অফার’। চটকদার বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে ক্রেতাদের আকৃষ্ট করা হচ্ছে এবং কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে গৃহস্থালি পণ্যের আড়ালে পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে এই ‘নকল টাকা’।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিতে তারা আসল নোটের বান্ডিলের সঙ্গে ৫ থেকে ১০ শতাংশ জাল নোট মিশিয়ে দিচ্ছে। এক লাখ টাকার জাল নোট মিলছে মাত্র ১৫ হাজার টাকায়। আর ‘এ’ গ্রেডের এক লাখ জাল টাকা বিক্রি হচ্ছে ২০ হাজার টাকায়। ৫০ টাকা থেকে শুরু করে সব ধরনের নোট নকল হচ্ছে।

নিখুঁত জাল নোট ও মেধাবীদের সম্পৃক্ততা জাল নোট কারবারিদের এখন বড় হাতিয়ার আধুনিক প্রযুক্তি। ল্যাপটপ, লেজার প্রিন্টার ও বিশেষ ডাইস ব্যবহার করে গ্রাফিক্স সফটওয়্যারের সাহায্যে তারা জলছাপ ও নিরাপত্তা সুতা পর্যন্ত নিখুঁতভাবে নকল করছে।

জানা গেছে, অল্প সময়ে বড়লোক হওয়ার লোভে উচ্চশিক্ষিত তরুণদের একটি অংশও জড়িয়ে পড়ছে এই কারবারে। সম্প্রতি জাল টাকা তৈরির সময় র‌্যাবের অভিযানে ধরা পড়েছে নাইমুল ইসলাম ইশান ও কেফায়েত উল্লাহ নামে দুই মেধাবী শিক্ষার্থী। তারা প্রযুক্তি ব্যবহার করে এমন জাল নোট তৈরি করছিল, যা খালি চোখে চেনা প্রায় অসম্ভব। তাদের তৈরি ৫০০ ও ১০০০ টাকার জাল নোট খালি চোখে চেনা প্রায় অসম্ভব বলে জানিয়েছেন তদন্তকারীরা।

কারবারিদের ভাষায়, ‘এ’ গ্রেডের নোট ব্যাংক ছাড়া অন্য সবখানেই চালানো যায়। এসব নোট এতটাই নিখুঁত যে, সহজে আসল-নকল বোঝার কোনো উপায় থাকে না।

যেসব এলাকায় চক্রের শক্তিশালী নেটওয়ার্ক কেরানীগঞ্জ, কামরাঙ্গীরচর, লালবাগ, কদমতলী, ডেমরা, উত্তরা, তুরাগ, সাভার ও আশুলিয়া— এসব এলাকায় চক্রগুলো শক্তিশালী নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছে। ছগির মাস্টার, লিয়াকত হোসেন জাকির, বাবুল ও রহিম বাদশাসহ অন্তত ৫০ জন কারিগর বর্তমানে সক্রিয়। প্রত্যেকের অধীনে রয়েছে পাঁচ থেকে ছয়জন করে ‘পুশার’ বা বাজারজাতকারী। কিছুদিন পরপরই তারা আস্তানা বদল করে জাল নোট তৈরির কার্যক্রম চালিয়ে যায়।

জানা গেছে, এরা বারবার গ্রেফতার হলেও জামিনে বেরিয়ে আবারও একই অপরাধে জড়াচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা জানান, জাল নোট কারবারিদের ধরতে সারা বছরই অভিযান চলে। অনেক সময় তারা গ্রেফতারও হয়। কিন্তু আইনি ফাঁকফোকরে অল্পদিনের মধ্যেই জামিনে বেরিয়ে আবার পুরোনো কারবারে ফিরে যায়।

ভুক্তভোগী ছোট ব্যবসায়ীরা ঈদ বাজারের এই ব্যস্ততায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন ছোট ব্যবসায়ীরা। বনশ্রীর ইফতার বিক্রেতা মামুন বলেন, ভিড়ের মধ্যে খেয়াল করে টাকা নেওয়া যায় না। এই সুযোগে ইফতারি কিনে জাল নোট দিয়ে চলে যায়। তিনি বলেন, “আমাদের কাছে তো এমন কোনো মেশিন নেই যা দিয়ে যাচাই করবো।”

রামপুরার ইফতার বিক্রেতা আল-আমিন জানান, রমজানে এই পর্যন্ত তাকে দুটি ৫০০ টাকার নোট এবং একটি ১০০০ টাকার নোট ধরিয়ে দিয়ে গেছে প্রতারকরা।

কাওরান বাজারের ডাব বিক্রেতা আব্দুল জলিল বলেন, “৫০০ টাকার চকচকে নোট দেখলে ভয় লাগে। এমন সব লোক জাল টাকা দিয়ে যায়, তাদের সন্দেহ করারও সুযোগ থাকে না।”

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর হুঁশিয়ারি র‌্যাব-৩ এর সিনিয়র সহকারী পরিচালক সনদ বড়ুয়া জানান, ঈদকে সামনে রেখে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। নজর রাখা হচ্ছে বিভিন্ন অনলাইন মাধ্যমেও। তার ভাষায়, “আমাদের বার্তা পরিষ্কার, জাল নোট কারবারিদের কোনো ছাড় দেওয়া হবে না।”

ডিএমপি মিডিয়া বিভাগের উপ-কমিশনার তালেবুর রহমান বলেন, “জাল নোট প্রস্তুতকারক এবং কারবারিদের ধরতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান অব্যাহত আছে।”

পুলিশের পক্ষ থেকে জনগণকে জাল নোট সম্পর্কে সচেতন থাকতে বলা হয়েছে। এছাড়া সন্দেহজনক কোনো নোট বা লেনদেনের তথ্য পাওয়া মাত্রই নিকটস্থ থানায় যোগাযোগ করতে আহ্বান জানানো হয়েছে।

আই.এ/সকালবেলা

মন্তব্য করুন