বাকৃবিতে ড. রফিকুল ইসলামের নতুন অধ্যায়

প্রকাশ: শনিবার, ০৩ অক্টোবর ২০২৬, ০২:৫৪ অপরাহ্ণ
বাকৃবিতে ড. রফিকুল ইসলামের নতুন অধ্যায়

অনক আলী হোসেন শাহিদী: দেশের কৃষি, মৎস্য, খাদ্য নিরাপত্তা ও কৃষি-প্রযুক্তির উন্নয়নে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) ভূমিকা অনস্বীকার্য। দেশের কৃষি ও কৃষি-সংশ্লিষ্ট খাতে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি, মৌলিক ও প্রয়োগভিত্তিক গবেষণা এবং নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবনের ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন ধরেই নেতৃত্ব দিয়ে আসছে বিশ্ববিদ্যালয়টি। এমন একটি জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্বে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন শিক্ষাবিদ ও গবেষক প্রফেসর ড. মোঃ রফিকুল ইসলাম সরদারের দায়িত্ব গ্রহণ নতুন প্রত্যাশার সৃষ্টি করেছে।

মহামান্য রাষ্ট্রপতি ও বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের চ্যান্সেলর গত ৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তাঁকে আগামী চার বছরের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর হিসেবে নিয়োগ দেন। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রাজুয়েট প্রফেসর ড. মোঃ রফিকুল ইসলাম সরদার বিশ্ববিদ্যালয়টির ২৭তম ভাইস চ্যান্সেলর। দায়িত্ব গ্রহণের পর ইতোমধ্যে এক মাস অতিক্রান্ত হয়েছে। এই স্বল্প সময়েই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা, গবেষণা ও প্রশাসনিক কার্যক্রমকে আরও গতিশীল করার লক্ষ্যে তাঁর সক্রিয়তা শিক্ষক, শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ সংশ্লিষ্ট মহলে নতুন প্রত্যাশা তৈরি করেছে।

দায়িত্ব গ্রহণের পর তাঁর কর্মকাণ্ডের একটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো—তিনি ভাইস চ্যান্সেলরের দায়িত্বকে কেবল আনুষ্ঠানিক প্রশাসনিক দায়িত্ব হিসেবে না দেখে বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক ও গবেষণাভিত্তিক ভবিষ্যৎ বিনির্মাণের দায়িত্ব হিসেবে গ্রহণ করেছেন। এ লক্ষ্যে শিক্ষা মন্ত্রণালয়, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন এবং সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে তিনি মতবিনিময় করেছেন এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা, গবেষণা ও প্রশাসনিক কার্যক্রমের কর্মপরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা করেছেন।

একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়নে শুধু অভ্যন্তরীণ প্রশাসন যথেষ্ট নয়; শিক্ষা মন্ত্রণালয়, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, দেশি-বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয় এবং সংশ্লিষ্ট জাতীয় ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কার্যকর সমন্বয় অপরিহার্য। দায়িত্ব গ্রহণের প্রথম মাসেই এসব অংশীজনের সঙ্গে যোগাযোগ ও মতবিনিময়কে গুরুত্ব দিয়ে প্রফেসর ড. মোঃ রফিকুল ইসলাম সরদার তাঁর প্রশাসনিক অগ্রাধিকারের একটি স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণাকে আরও কার্যকর করা, বিদ্যমান সুযোগ-সুবিধার যথাযথ ব্যবহার, গবেষণার পরিধি সম্প্রসারণ এবং জাতীয় উন্নয়নের প্রয়োজনের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণাকে আরও ঘনিষ্ঠভাবে সম্পৃক্ত করার ক্ষেত্রে সমন্বিত কর্মপরিকল্পনার ওপর গুরুত্ব দেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।

প্রফেসর ড. মোঃ রফিকুল ইসলাম সরদারের নেতৃত্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক তাঁর দীর্ঘ গবেষণা অভিজ্ঞতা। ফিশ ব্রিডিং, মলিকুলার জেনেটিক্স এবং বায়োটেকনোলজি তাঁর বিশেষায়িত গবেষণার ক্ষেত্র। তাঁর তত্ত্বাবধানে ৩৫ জনের বেশি এমএস এবং আটজন পিএইচডি শিক্ষার্থী গবেষণা সম্পন্ন করেছেন। মাঠপর্যায়ে ব্যবহার উপযোগী চারটি মৎস্য প্রযুক্তি উদ্ভাবনের সঙ্গে তিনি যুক্ত ছিলেন। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ২১টি গবেষণার প্রধান গবেষক (Principal Investigator) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।

এই অভিজ্ঞতা বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা কার্যক্রমকে আরও প্রয়োগমুখী করার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ। দেশের মৎস্য উৎপাদন, উন্নত জাত উদ্ভাবন, জেনেটিক উন্নয়ন, জলজ জীববৈচিত্র্য, বায়োটেকনোলজি এবং আধুনিক মৎস্য চাষের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণাকে আরও নিবিড়ভাবে যুক্ত করার সুযোগ রয়েছে।

প্রফেসর ড. মোঃ রফিকুল ইসলাম সরদারের নেতৃত্বের বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো—তিনি এই বিশ্ববিদ্যালয়েরই ছাত্র ছিলেন। ১৯৮৭ সালে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিএসসি ইন ফিশারিজ (অনার্স) এবং ১৯৮৮ সালে এমএসসি ইন ফিশারিজ বায়োলজি অ্যান্ড লিমনোলজি ডিগ্রি অর্জন করেন। উভয় পরীক্ষায় তিনি প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান অর্জন করেন। কৃতিত্বপূর্ণ ফলাফলের স্বীকৃতি হিসেবে তিনি ইউনিভার্সিটি অ্যাওয়ার্ড লাভ করেন।

১৯৯৮ সালে স্টার্লিং বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জনের পর জাপানের STA Fellowship এবং জার্মানির DAAD Fellowship-এর আওতায় গবেষণা সম্পন্ন করেন। আন্তর্জাতিক গবেষণা পরিবেশের অভিজ্ঞতা তাঁর একাডেমিক দৃষ্টিভঙ্গিকে আরও বিস্তৃত করেছে।

একজন শিক্ষার্থী হিসেবে যে ক্যাম্পাসে তাঁর একাডেমিক যাত্রা শুরু হয়েছিল, দীর্ঘ শিক্ষকতা ও গবেষণার পথ পেরিয়ে সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ একাডেমিক ও প্রশাসনিক পদে তাঁর অধিষ্ঠান একটি উল্লেখযোগ্য অধ্যায়।

১৯৯১ সালে প্রভাষক হিসেবে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দিয়ে কর্মজীবন শুরু করেন প্রফেসর ড. মোঃ রফিকুল ইসলাম সরদার। ১৯৯৪ সালে সহকারী অধ্যাপক, ২০০০ সালে সহযোগী অধ্যাপক এবং ২০০৫ সালে অধ্যাপক পদে উন্নীত হন।

দীর্ঘ শিক্ষকতা জীবনে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিশারিজ বায়োলজি অ্যান্ড জেনেটিকস বিভাগের প্রধান, মৎস্যবিজ্ঞান অনুষদের ডিন, ডিন কাউন্সিলের আহ্বায়ক, ফিশ মিউজিয়াম অ্যান্ড জার্মপ্লাজম সেন্টারের পরিচালক, ফজলুল হক হলের প্রভোস্ট এবং প্রভোস্ট কাউন্সিলের আহ্বায়কসহ গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন।

ফলে ভাইস চ্যান্সেলর হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার আগে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কাঠামোর বিভিন্ন স্তরে কাজ করার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা তাঁর রয়েছে। এ অভিজ্ঞতাই বর্তমান দায়িত্ব পালনে একটি শক্তিশালী ভিত্তি হিসেবে কাজ করছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকসমাজের সঙ্গে তাঁর দীর্ঘ সম্পৃক্ততাও নতুন দায়িত্বে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। তিনি ২০২৪ সালের ১ ফেব্রুয়ারি থেকে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছেন। এর আগে ২০১৩ সালে সর্বোচ্চ ভোটে সদস্য নির্বাচিত এবং ২০১৫ সালে সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন।

শিক্ষকসমাজের প্রতিনিধিত্বকারী সংগঠনের নেতৃত্ব দেওয়ার ফলে শিক্ষক, একাডেমিক পরিবেশ, প্রশাসনিক প্রত্যাশা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন স্তরের সমস্যা সম্পর্কে তাঁর প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা রয়েছে।

প্রফেসর ড. মোঃ রফিকুল ইসলাম সরদার যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, অস্ট্রেলিয়া, জাপান, ডেনমার্ক, ইতালি, কানাডা, চীন, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, ভারত, ফিলিপাইন, জার্মানি, কিরগিজস্তান, যুক্তরাষ্ট্র ও শ্রীলঙ্কাসহ বিভিন্ন দেশ সফর করেছেন। আন্তর্জাতিক সেমিনার ও সিম্পোজিয়ামে অংশগ্রহণের মাধ্যমে তিনি বৈশ্বিক শিক্ষা ও গবেষণার সঙ্গে দীর্ঘদিন যুক্ত রয়েছেন।

বর্তমান বিশ্বে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর প্রতিযোগিতা শুধু জাতীয় পর্যায়ে সীমাবদ্ধ নেই। গবেষণা প্রকাশনা, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, বৈশ্বিক গবেষণা নেটওয়ার্ক, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং শিল্প-গবেষণা অংশীদারিত্ব ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। এই বাস্তবতায় তাঁর আন্তর্জাতিক গবেষণা-অভিজ্ঞতা বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের বৈশ্বিক একাডেমিক সম্পৃক্ততা বৃদ্ধিতে কাজে লাগানোর সুযোগ রয়েছে।

প্রথম এক মাসের কার্যক্রমকে সামনে রেখে এখন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও সংশ্লিষ্ট মহলের প্রত্যাশা—প্রাথমিক মতবিনিময় ও কর্মপরিকল্পনাগুলো যেন ধীরে ধীরে দৃশ্যমান প্রাতিষ্ঠানিক কর্মসূচিতে রূপ নেয়।

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রমের মানোন্নয়ন, গবেষণার অর্থায়ন ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বৃদ্ধি, গবেষণার ফল মাঠপর্যায়ে সম্প্রসারণ, শিক্ষার্থীদের দক্ষতা উন্নয়ন, আধুনিক ল্যাবরেটরি ও গবেষণা অবকাঠামো শক্তিশালীকরণ, প্রশাসনিক সেবার গতি বৃদ্ধি এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অবস্থান সুদৃঢ় করা—সবগুলোই তাঁর চার বছরের মেয়াদে গুরুত্বপূর্ণ কর্মক্ষেত্র হতে পারে।

যশোরের কেশবপুর উপজেলার মঙ্গলকোট গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণকারী প্রফেসর ড. মোঃ রফিকুল ইসলাম সরদারের পিতা ছিলেন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ মরহুম মোহাম্মদ মকসেদ আলী সরদার এবং মাতা খোদেজা বেগম। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি বিবাহিত এবং এক কন্যা ও এক পুত্রসন্তানের জনক।

একজন মেধাবী শিক্ষার্থী থেকে আন্তর্জাতিক গবেষক, দীর্ঘদিনের শিক্ষক, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসক এবং শিক্ষকসমাজের নির্বাচিত প্রতিনিধি—বিভিন্ন পর্যায়ের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে তিনি বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলরের দায়িত্বে এসেছেন।

দায়িত্ব গ্রহণের এক মাসে তাঁর কর্মকাণ্ডে সমন্বয়, সক্রিয়তা এবং কর্মপরিকল্পনামুখী নেতৃত্বের প্রাথমিক প্রকাশ ঘটেছে। এখন এই প্রাথমিক গতিশীলতাকে দীর্ঘমেয়াদি প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার, গবেষণার উৎকর্ষ এবং শিক্ষার্থীবান্ধব একাডেমিক পরিবেশে রূপ দেওয়াই হবে তাঁর নেতৃত্বের পরবর্তী বড় কর্মপরিসর।

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় দেশের কৃষি ও কৃষি-সংশ্লিষ্ট উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। ফলে এই প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্বে প্রফেসর ড. মোঃ রফিকুল ইসলাম সরদারের চার বছরের মেয়াদকে ঘিরে প্রত্যাশাও বিস্তৃত।

দায়িত্ব গ্রহণের প্রথম মাসে যে কর্মচাঞ্চল্যের সূচনা হয়েছে, তা যদি ধারাবাহিক, পরিকল্পিত ও ফলাফলভিত্তিক কর্মকাণ্ডে রূপ নেয়, তাহলে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা, গবেষণা ও উদ্ভাবনের পরিসর আরও বিস্তৃত হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।

এআইএল/সকালবেলা

মন্তব্য করুন