‘আমি রাজপথের মানুষ, সাধারণ মানুষের ঘামের দাম বুঝি’

‘আমি রাজপথের মানুষ, সাধারণ মানুষের ঘামের দাম বুঝি’

চাঁপাইনবাবগঞ্জের রাজনীতির এক প্রবীণ ও আপসহীন নাম মো. হারুনুর রশীদ। চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩ (সদর) আসন থেকে চারবারের নির্বাচিত সাবেক এই সংসদ সদস্য কেবল একজন জনপ্রতিনিধিই নন, বরং বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দীর্ঘদিনের বিশ্বস্ত সহচর ও উপদেষ্টা পরিষদের অন্যতম সদস্য। ২০১৮ সালের সংসদ থেকে নীতিগত কারণে পদত্যাগ করে তিনি দেশজুড়ে আলোচনার জন্ম দিয়েছিলেন। 

রাজপথের আন্দোলন আর সংসদের তর্ক বিতর্কে যাঁর কণ্ঠস্বর সব সময় ছিল উচ্চকিত, আজ তিনি জেলা পরিষদ প্রশাসকের এক নতুন প্রশাসনিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই তিনি কাজ শুরু করেছেন জেলা পরিষদের স্থবিরতা কাটাতে। বিশেষ করে শাহজাহানপুর ব্রিজের মতো জনগুরুত্বপূর্ণ মেগা প্রকল্পের জট খোলা এবং আমের রাজধানী হিসেবে পরিচিত চাঁপাইনবাবগঞ্জের অর্থনৈতিক সক্ষমতা বাড়ানোই এখন তাঁর মূল লক্ষ্য। 

আজকের এই বিশেষ সাক্ষাৎকারে তিনি কথা বলেছেন জেলা পরিষদের আমূল সংস্কার, সুশাসনের রোডম্যাপ এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জকে একটি আধুনিক মডেল জেলায় রূপান্তরের স্বপ্ন নিয়ে। এসকল বিষয় নিয়ে তাঁর সঙ্গে কথা বলেছেন দৈনিক সকালবেলার বার্তা সম্পাদক রকিব মুহাম্মদ

সকালবেলা: আপনি চারবার সংসদ সদস্য ছিলেন, রাজপথের লড়াইয়ে আপসহীন ভূমিকা রেখেছেন। এখন জেলা পরিষদ প্রশাসকের এই নতুন প্রশাসনিক দায়িত্বকে কীভাবে দেখছেন?

হারুনুর রশীদ: দেখুন, রাজনীতি মানেই জনগণের সেবা। আগে সংসদে থেকে নীতি-নির্ধারণী কথা বলেছি, আর এখন জেলা পরিষদের মাধ্যমে সরাসরি মানুষের দোরগোড়ায় সেবা পৌঁছে দেওয়ার সুযোগ পেয়েছি। তবে আমার অবস্থান আগের মতোই পরিষ্কার—আমি কোনো ঠুটো জগন্নাথ হয়ে থাকতে আসিনি। জেলা পরিষদকে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা আর দুর্নীতির আখড়া থেকে মুক্ত করে জনগণের প্রকৃত শক্তিতে রূপান্তর করাই আমার লক্ষ্য।

সকালবেলা: আপনি সব সময় ‘পুরো ব্যবস্থার মেরামত’ করার কথা বলেন। জেলা পরিষদের প্রশাসনিক ব্যবস্থায় কী ধরনের মেরামত প্রয়োজন বলে আপনি মনে করেন? 

হারুনুর রশীদ: আমি আগেও বলেছি, শুধু দুই-একজনকে সরিয়ে দিলেই সংকটের সমাধান হয় না; পুরো সিস্টেম বদলাতে হয়। জেলা পরিষদেও আমি তাই করতে চাই। এখানে টেন্ডার সিন্ডিকেট, ফাইল আটকে রাখা আর লুটপাটের যে সংস্কৃতি গড়ে উঠেছিল, তা আমি ভেঙে দেব। আমি চাই এমন এক ব্যবস্থা যেখানে প্রতিটি প্রকল্পের টাকা পাই-পাই করে হিসাব থাকবে। ‘জিরো টলারেন্স’ কেবল মুখে নয়, কাজে প্রমাণ করব।

সকালবেলা: শাহজাহানপুর ব্রিজের মতো জনগুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পগুলো দীর্ঘদিন স্থবির ছিল। প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপে এখন কাজ শুরু হয়েছে। এই সমন্বয়কে আপনি কীভাবে দেখছেন? 

হারুনুর রশীদ: শাহজাহানপুর ব্রিজ একটি জ্বলন্ত উদাহরণ যে, সদিচ্ছা থাকলে কত দ্রুত জনভোগান্তি দূর করা যায়। ১৫ কোটি টাকার প্রকল্প কেবল সংযোগ সড়কের অভাবে অচল পড়ে থাকবে—এটি চরম অবহেলা। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে জেনে সাথে সাথে প্রতিমন্ত্রীকে নির্দেশ দিয়েছেন। এটিই হলো সুশাসনের মডেল। জেলা পরিষদ প্রশাসক হিসেবে আমার কাজ হবে এমন প্রতিটি থমকে থাকা প্রকল্পের জট খোলা। আমি ব্যক্তিগতভাবে মাঠে থাকব।

সকালবেলা: অনেকে বলেন স্থানীয় সরকারে দলীয় প্রভাব অনেক বেশি। আপনি কি মনে করেন চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা পরিষদকে সব দলের মানুষের জন্য উন্মুক্ত রাখা সম্ভব? 

হারুনুর রশীদ: আমি বিশ্বাস করি ভোটাররা যখন দেখেন নেতা তাদের স্বার্থে কাজ করছে, তখন তারা দল দেখে না। অতীতে ‘উকিল সাত্তার মডেল’ করে সরকার ভোটারদের প্রভাবিত করতে পারেনি। আমি চাই ‘জনগণ মডেল’। জেলা পরিষদে কোনো পক্ষপাতিত্ব হবে না। উন্নয়ন হবে সবার জন্য—সেটি সীমান্ত এলাকা হোক বা চরাঞ্চল। চাঁপাইনবাবগঞ্জের আম চাষী থেকে শুরু করে প্রান্তিক মানুষ যেন মনে করে হারুনুর রশীদ তাদের প্রতিনিধি হয়ে বসে আছেন।

সকালবেলা: আপনি প্রধানমন্ত্রীর (তারেক রহমান) উপদেষ্টা। আজকের বৈঠকে প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে আপনি বিশেষ কী পাওয়ার আশা করছেন? 

হারুনুর রশীদ: আমরা কোনো বিশেষ সুবিধা চাই না, আমরা চাই কাজ করার স্বাধীনতা এবং স্বচ্ছতা। আমি আজকের বৈঠকে চাঁপাইনবাবগঞ্জের জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ ‘উন্নয়ন ম্যাপিং’ তুলে ধরব। বিশেষ করে আমের রাজধানী হিসেবে এই জেলার অর্থনৈতিক সক্ষমতা বাড়ানো এবং মহানন্দা তীরের মানুষের জীবনমান উন্নয়নে বড় ধরনের বরাদ্দ ও নীতিগত সমর্থন চাইব। আমার স্বপ্ন—চাঁপাইনবাবগঞ্জ হবে দেশের সবচেয়ে উন্নত ও পরিকল্পিত জেলা।

সকালবেলা: জেলা পরিষদের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের উদ্দেশ্যে আপনার কড়া বার্তা কী? 

হারুনুর রশীদ: বার্তা একটাই—হয় জনগণের কাজ করুন, না হয় পথ ছাড়ুন। অনিয়ম প্রমাণিত হলে কোনো খাতির নেই। আমি রাজপথ থেকে উঠে আসা মানুষ, তাই সাধারণ মানুষের ঘাম আর চোখের পানির দাম আমি বুঝি। প্রশাসনের প্রতিটি স্তরে জবাবদিহি নিশ্চিত করা হবে।

মন্তব্য করুন