হানিফের ফাঁসির রায়ে কুষ্টিয়ায় স্বস্তি, দ্রুত রায় কার্যকরের দাবি
কাঞ্চন কুমার (কুষ্টিয়া): জুলাই-আগস্টে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলন চলাকালে কুষ্টিয়ায় ছয়জনকে হত্যার ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফসহ চার আসামির রায়ে মৃত্যুদণ্ডসহ সাজা ঘোষণায় কুষ্টিয়ার সাধারণ মানুষের মধ্যে স্বস্তির প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে।
হানিফের মৃত্যুদণ্ডসহ একই মামলার রায়ে কুষ্টিয়া জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি সদর উদ্দিন খান, সাধারণ সম্পাদক আজগর আলী এবং কুষ্টিয়া শহর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান হানিফের নিকটাত্মীয় আতাউর রহমান আতার আমৃত্যু কারাদণ্ড ঘোষণা করা হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এ রায় ঘোষণার পর স্থানীয় বাসিন্দাদের অনেকে এই রায় ঘোষণাকে ন্যায়বিচারের পথে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন।
মামলার প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, কুষ্টিয়ায় ছয়টি হত্যাকাণ্ডে আসামিদের উসকানি, নির্দেশ ও সংশ্লিষ্টতার বিষয়ে টেলিফোন কথোপকথনের অডিওসহ বিভিন্ন দালিলিক প্রমাণ ট্রাইব্যুানালে উপস্থাপন করা হয়েছে। তদন্ত কর্মকর্তা ছাড়াও এ মামলায় মোট ১৯ জন সাক্ষীর জবানবন্দি গ্রহণ এবং যুক্তিতর্ক শেষে রায়ের পর্যায়ে পৌঁছেছে বিচারিক কার্যক্রম।
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের আন্দোলনে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের বিচার নিয়ে দেশজুড়ে যে আলোচনা রয়েছে, কুষ্টিয়ার এ মামলার রায়ও তার অংশ। রায়ের মাধ্যমে ভুক্তভোগী পরিবারগুলো ন্যায়বিচার পাবে—এমন প্রত্যাশা স্থানীয়দের মধ্যে রয়েছে।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় কুষ্টিয়ায় ছয়জনকে হত্যার ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় হানিফসহ আওয়ামী লীগ নেতাদের সাজার রায়ের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর কুষ্টিয়ার মানুষের আলোচনায় উঠে আসে বিচার, নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক ক্ষমতার অপব্যবহার বন্ধের প্রসঙ্গ। স্থানীয়দের একাংশের ভাষ্য, দীর্ঘদিনের নানা অভিযোগ ও বিচারপ্রত্যাশার পর এ রায় তাদের মনে স্বস্তি ফিরিয়ে এনেছে।
কুষ্টিয়া শহরের বাসিন্দা কলেজ শিক্ষার্থী পারভেজ বলেন, রাজনীতি মানুষের জন্য হওয়া উচিত। কিন্তু ক্ষমতার কারণে মানুষ যদি ভয় পায়, মামলা-হামলার আশঙ্কায় কথা বলতে না পারে, তাহলে সেটি কোনোভাবেই ভালো রাজনীতি নয়। হানিফ ও আতার সময়ে অনেক মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে আমরা শুনেছি এবং দেখেছি। আজকের রায়ে মানুষের মধ্যে স্বস্তি এসেছে। আমরা চাই, ভবিষ্যতে কেউ যেন ক্ষমতার অপব্যবহার করে সাধারণ মানুষকে হয়রানি করতে না পারে।
জুলাই সংগঠক আলমাস হাসান মামুন বলেন, ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডগুলোর নির্দেশনার সঙ্গে এই চার ব্যক্তিসহ আরও অনেকে জড়িত ছিলেন। তাদের ফাঁসির রায় হওয়ায় শহীদ জুলাই যোদ্ধাদের আত্মা শান্তি পেয়েছে। আমি আশা করি, এই রায়ের মধ্য দিয়ে ভবিষ্যতে কোনো রাজনৈতিক দল ফ্যাসিবাদী হয়ে ওঠার সাহস পাবে না।
জুলাই যোদ্ধা মোস্তাফিজুর রহমান পলাশ বলেন, আওয়ামী লীগ সরকার যেভাবে ফ্যাসিবাদী শাসনব্যবস্থা কায়েম করেছিল, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে তার অবসান হয়েছে। এই আন্দোলনে কুষ্টিয়ার ছয়জন প্রাণ হারিয়েছেন। আজ তাঁদের হত্যার মামলার রায় ঘোষণা করা হয়েছে। আমরা আশা করি, এই রায় কার্যকর হবে এবং পলাতক আসামিদের গ্রেপ্তার করে সাজা নিশ্চিত করা হবে।
একই সাথে ফ্যাসিবাদী শাসনের অবসান ঘটাতে গিয়ে যাঁরা শহীদ হয়েছেন, তাঁদের অনেকের পরিবারই উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়েছে। তাই শহীদ পরিবারের সদস্যদের পাশে দাঁড়ানোর পাশাপাশি তাঁদের যথাযথ মূল্যায়ন করতে হবে। আমরা চাই, জুলাই যোদ্ধাদের প্রকৃত অবদান স্বীকৃতি পাক এবং শহীদ পরিবারগুলো প্রয়োজনীয় সহযোগিতা পায়।
জুলাই যোদ্ধা সুলতান মারুফ তালহা বলেন, কুষ্টিয়ায় জুলাই অভ্যুত্থানে ছয়জনকে হত্যার মামলায় আসামিদের আজ ফাঁসির রায় হয়েছে। এতে আমরা আনন্দিত। তবে সরকারকে দ্রুত এ রায় কার্যকর করার উদ্যোগ নিতে হবে। আসামিদের খুঁজে বের করে আইনের আওতায় আনতে হবে। যারা দেশের বাইরে পালিয়ে রয়েছে, তাদেরও আইনের আওতায় এনে দ্রুত রায় কার্যকর করার দাবি জানাচ্ছি।
আন্দোলনে নিহত শহীদ আব্দুল্লাহর পিতা লোকমান হোসেন বলেন, এ রায়ে আমরা সন্তুষ্ট। আমরা চাই, দ্রুত আসামিদের গ্রেপ্তার করে রায় কার্যকর করা হোক। আমরা যা হারিয়েছি, তা কখনো ফিরে পাব না। তবে আমাদের এই ত্যাগের বিনিময়ে ফ্যাসিবাদী সরকারের পতন হয়েছে। ভবিষ্যতে যেন কোনো রাজনৈতিক দল ফ্যাসিবাদী শাসনব্যবস্থা কায়েম করতে না পারে।
সাধারণ মানুষের প্রতিক্রিয়ায় স্বস্তির পাশাপাশি উঠে এসেছে দণ্ড কার্যকরের প্রত্যাশাও। তাদের মতে, আদালতের রায়ের মধ্য দিয়ে বিচারপ্রক্রিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ সম্পন্ন হয়েছে। এখন পলাতক আসামিদের আইনের আওতায় আনা এবং আইন অনুযায়ী রায় কার্যকরের পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। একই সঙ্গে নিহতদের পরিবার যেন ন্যায়বিচার ও ক্ষতিপূরণ পায়, সেটিও নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট কুষ্টিয়ায় নিহত ইউসুফ শেখের মেয়ে সীমা বলেন, সরকারের কাছে আবেদন, তারা যেন ভালোভাবে যাচাই-বাছাই করে প্রকৃত দোষীদের শাস্তির ব্যবস্থা করেন। রায় হওয়ায় আমরা খুব খুশি। যারা দেশের বাইরে ও দেশের ভেতরে পলাতক রয়েছে, তাদের যেন আইনের আওতায় এনে সঠিক শাস্তি দেওয়া হয়।
কুষ্টিয়ার সচেতন মানুষের মতে, এ রায়ের মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক ক্ষমতা ও সাধারণ মানুষের অধিকারের প্রশ্নটি আবারও সামনে এসেছে। ভবিষ্যতে রাজনৈতিক পরিচয় কিংবা ক্ষমতার প্রভাবের কারণে কেউ যেন আইনের ঊর্ধ্বে থাকার সুযোগ না পায়। একই সঙ্গে প্রতিহিংসার রাজনীতির পরিবর্তে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, মানুষের নিরাপত্তা এবং স্বাধীনভাবে মতপ্রকাশের পরিবেশ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তারা।
সচেতন নাগরিক মাছুদ বলেন, এই রায়ে আমরা সন্তুষ্ট হয়েছি। তবে সবাইকে একই রায় দিলে আরো ভালো হতো। আমরা মনে করি পলাতক আসামিদের দেশে ফিরিয়ে এনে দ্রুত এ রায় যেন কার্যকর করা হোক। যা ভবিষ্যতে একটি নজিরবিহীন এবং দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। ক্ষমতাবানরা যেন ক্ষমতা পেয়ে কখনো সাধারণ মানুষের উপর জুলুম ও দমন-পীড়ন না করতে পারে।
কুষ্টিয়া জেলা জামায়াতের সাবেক সেক্রেটারী সুজাউদ্দিন জোয়ার্দার বলেন, এ ধরনের মানবতাবিরোধী কর্মকাণ্ডে সকল আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হবে বলে আমরা আশা করেছিলাম। কিন্তু তা হয়নি।
তিনি আরও বলেন, মানুষ অতীত থেকে শিক্ষা নেয় না। ক্ষমতায় থেকে ক্ষমতার দাপটে তারা সাধারণ মানুষের উপর জুলুম-নির্যাতন চালিয়েছে। তারা ভেবেছিল তারা চিরকাল ক্ষমতায় থাকবে।
কুষ্টিয়া জেলা বিএনপির সদস্য সচিব প্রকৌশলী জাকির হোসেন সরকার বলেন, মাহবুব উল আলম হানিফ ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে কুষ্টিয়ার মানুষ রাজনৈতিক দমন-পীড়ন, হামলা-মামলা ও হয়রানির অভিযোগ করে আসছিলেন। আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জামায়াতসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক মতের মানুষ তার ক্ষমতার বলয়ের কাছে অসহায় হয়ে পড়েছিলেন।
তিনি আরও বলেন, আজকের রায়ের মাধ্যমে মানুষের ন্যায়বিচারের প্রত্যাশা পূরণের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ সম্পন্ন হয়েছে। আমরা মনে করি, ফ্যাসিবাদী শাসন ও মানুষের ওপর অত্যাচার-নিপীড়নের বিচার প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়েই গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
এআইএল/সকালবেলা