বঙ্গোপসাগরে তেল-গ্যাস উত্তোলনে সুইডিশ কোম্পানিকে স্পিকারের আহ্বান
নিজস্ব প্রতিবেদক
জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সঙ্গে তাঁর জাতীয় সংসদ ভবনস্থ কার্যালয়ে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেছেন বাংলাদেশে নিযুক্ত সুইডেনের মান্যবর রাষ্ট্রদূত নিকোলাস উইকস। অত্যন্ত আন্তরিক পরিবেশে আয়োজিত এই দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে বাংলাদেশের ব্লু-ইকোনমি বা সমুদ্রসম্পদ ব্যবহারের অংশ হিসেবে বঙ্গোপসাগরে মজুদকৃত প্রঅাকৃতিক সম্পদ তেল ও গ্যাস উত্তোলনে সুইডেনের অভিজ্ঞ ও শীর্ষস্থানীয় কোম্পানিগুলোকে এগিয়ে আসা এবং সরাসরি বিনিয়োগ করার প্রাতিষ্ঠানিক আহ্বান জানিয়েছেন স্পিকার।
আজ রোববার (২৫ অক্টোবর) দুপুরে জাতীয় সংসদ ভবনে স্পিকারের কার্যালয়ে এই গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক ও সৌজন্য সাক্ষাৎ অনুষ্ঠিত হয়।
বৈঠকে বাংলাদেশ ও সুইডেনের মধ্যকার দীর্ঘদিনের কৌশলগত ও দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক জোরদারকরণ, উভয় দেশের জাতীয় সংসদের মধ্যে নিবিড় আন্তঃসম্পর্ক গড়ে তুলতে ‘সংসদীয় মৈত্রী গ্রুপ’ গঠন, দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ও পারস্পরিক বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং ক্রীড়া ও সংস্কৃতি বিনিময়সহ স্বার্থসংশ্লিষ্ট নানা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে বিষদ আলোচনা সম্পন্ন হয়।
বৈঠকে জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, “স্বাধীনতার পর থেকেই বাংলাদেশ ও সুইডেনের মধ্যে অত্যন্ত সুদৃঢ় কূটনৈতিক ও বন্ধুভাবাপন্ন সম্পর্ক বিদ্যমান। দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশকে একটি টেকসই উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে গড়ে তুলতে অন্যতম প্রধান ও বিশ্বস্ত উন্নয়ন সহযোগী হিসেবে নিরবচ্ছিন্ন কাজ করে আসছে সুইডেন।”
সুইডেনের অনন্য গণতান্ত্রিক ও পার্লামেন্টারি ব্যবস্থার প্রতি ভূয়সী প্রশংসা জ্ঞাপন করে স্পিকার আরও বলেন, “সুইডেনের এক-কক্ষবিশিষ্ট সংসদীয় প্রতিনিধিত্বমূলক আধুনিক গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার সঙ্গে বাংলাদেশের বর্তমান সংসদীয় কাঠামোর অনেক ক্ষেত্রে চমৎকার ও প্রাতিষ্ঠানিক সাদৃশ্য রয়েছে। এই বাস্তবতায় বাংলাদেশ ও সুইডেনের সংসদের মধ্যে দ্রুত একটি শক্তিশালী ‘সংসদীয় মৈত্রী গ্রুপ’ গঠন করা সম্ভব হলে তা উভয় দেশের সংসদীয় গণতন্ত্রের বিকাশ, চর্চা ও বিস্তারে অত্যন্ত কার্যকর ও ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।”
আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশের মানুষের গণতান্ত্রিক চেতনা তুলে ধরে স্পিকার স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন, “বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ জন্মগতভাবেই অসাম্প্রদায়িক ও গণতন্ত্রপ্রেমী। এ দেশের সর্বস্তরের জনগণ নিজেদের মৌলিক অধিকার ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার রাজপথের লড়াইয়ে অতীতে নিজের জীবন উৎসর্গ করতে কখনো ন্যূনতম কুণ্ঠাবোধ করেনি। বিগত দীর্ঘ ১৭ বছরের স্বৈরাচারী ও অনিয়মতান্ত্রিক শাসনের মাধ্যমে এ দেশের কোটি কোটি মানুষের পবিত্র ও মৌলিক ভোটাধিকার হরণ করা হয়েছিল। তবে ২০২৪ সালের ঐতিহাসিক ছাত্র-জনতার অভূতপূর্ব গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে আমাদের সাহসী ছাত্রসমাজ এবং আপামর জনগণ সেই দীর্ঘ স্বৈরাচারী শাসনের চূড়ান্ত অবসান ঘটিয়েছে।”
দেশের ভবিষ্যৎ সংসদীয় গণতন্ত্র ও অবাধ ভোটাধিকারের পরিবেশ নিয়ে আলোকপাত করতে গিয়ে স্পিকার আরও যুক্ত করেন, “ভবিষ্যতে দেশের যেকোনো নির্বাচনে জনগণ যাতে কোনো ভয়ভীতি ছাড়া সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে নিজেদের পছন্দসই রাজনৈতিক দল ও পছন্দের যোগ্য প্রার্থীর পক্ষে সরাসরি মতামত প্রদান বা ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারে, বর্তমান প্রশাসন ও সংসদ সেই পরিবেশ নিশ্চিত করতে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। মূলত ভোটারদের সেই প্রত্যক্ষ ও স্বাধীন ভোটাধিকার চর্চায়ই সংসদীয় গণতন্ত্রের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করে।”
সাক্ষাৎকালে স্পিকার জাতীয় সংসদে চলমান সংবিধান সংস্কার কমিটির বিভিন্ন যুগোপযোগী কার্যক্রম, কৌশলগত অগ্রাধিকার ও অগ্রগতি সম্পর্কেও সুইডিশ রাষ্ট্রদূতকে বিস্তারিতভাবে অবহিত করেন।
বৈঠকে সুইডেনের বর্তমান শাসনব্যবস্থা ও ঐতিহাসিক পার্লামেন্টারি চিত্র তুলে ধরে রাষ্ট্রদূত নিকোলাস উইকস জানান, সুইডিশ পার্লামেন্টে মোট ৩৪৯টি সংরক্ষিত আসন রয়েছে এবং সদস্যরা সাধারণ জনগণের সরাসরি ও প্রত্যক্ষ ভোটাধিকারের ভিত্তিতে ৪ বছর মেয়াদের জন্য নির্বাচিত হন। তিনি ব্যাখ্যা করে বলেন, যদিও সুইডেন রাষ্ট্রীয়ভাবে একটি সাংবিধানিক রাজতন্ত্র মেনে চলে, তথাপি রাষ্ট্র পরিচালনার সার্বিক রাজনৈতিক, নীতি নির্ধারণী ও প্রশাসনিক ক্ষমতা সম্পূর্ণভাবে নির্বাচিত পার্লামেন্ট এবং গণতান্ত্রিক সরকারের হাতেই ন্যস্ত থাকে।
বৈঠকের সমাপনী পর্যায়ে উভয় পক্ষই দুই দেশের পার্লামেন্টের মধ্যকার দীর্ঘদিনের ঐতিহাসিক সম্পর্ক আরও গাঢ় ও নিবিড় করতে দ্রুততম সময়ে সংসদীয় মৈত্রী গ্রুপ ও ককাস গঠনের জোর তাগিদ দেন। একই সাথে যুব সমাজ, ক্রীড়া, সংস্কৃতি এবং বাংলাদেশের সম্ভাবনাময় জ্বালানি ও অবকাঠামোগত খাতে সুইডিশ বিনিয়োগের নতুন ক্ষেত্র উন্মোচন নিয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়।
উক্ত সৌজন্য সাক্ষাতের সময় সুইডিশ দূতাবাসের ঊর্ধ্বতন কূটনৈতিক কর্মকর্তা এবং বাংলাদেশ জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের সচিব ব্যারিস্টার মো. গোলাম সরওয়ার ভুঁইয়াসহ উভয় দেশের সংশ্লিষ্ট উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।