বাংলাদেশে পুনরায় বিদ্যুৎ রপ্তানি শুরু করেছে নেপাল
ভয়াবহ পাহাড়ি ঢল ও বন্যার কারণে টানা প্রায় দুই মাস বন্ধ থাকার পর প্রতিশ্রুত চুক্তি অনুযায়ী বাংলাদেশে পুনরায় উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ রপ্তানি শুরু করেছে বন্ধুপ্রতীম দেশ নেপাল। ভারতের জাতীয় বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন ব্যবহার করে গত শুক্রবার (২৩ অক্টোবর ২০২৬) বিকেল বা সন্ধ্যা থেকে বাংলাদেশে সুনির্দিষ্ট ৪০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু করা হয়েছে।
নেপালের রাষ্ট্রীয় বিদ্যুৎ সংস্থা ‘নেপাল বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষ’ (এনইএ)-এর আনুষ্ঠানিক বক্তব্যের উদ্ধৃতি দিয়ে দেশটির জনপ্রিয় দৈনিক সংবাদপত্র ‘কাঠমান্ডু পোস্ট’ আজ এক বিশেষ প্রতিবেদনে এই স্বস্তিদায়ক খবর নিশ্চিত করেছে।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, গত ২৬ আগস্ট নেপালের অভ্যন্তরে প্রবাহিত ভোতেকোশি নদীতে সৃষ্ট আকস্মিক ও ভয়াবহ বন্যায় দেশটির বিখ্যাত ত্রিশূলী এবং চিলিমে জলবিদ্যুৎকেন্দ্র দুটি চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। মূলত বাংলাদেশে নির্ধারিত বিদ্যুৎ রপ্তানির জন্য ভারত সরকার কর্তৃক এ দুটি কেন্দ্রকেই পূর্বে অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল। ফলে কেন্দ্র দুটিতে উৎপাদন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহ স্থগিত হয়ে পড়ে। একই প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে ত্রিপক্ষীয় চুক্তির আওতায় ভারতের হরিয়ানা রাজ্যে নেপাল থেকে নির্ধারিত বিদ্যুৎ রপ্তানি কার্যক্রমও আংশিকভাবে চরম ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
বিদ্যুৎ সরবরাহ সচল হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করে নেপাল বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষের (এনইএ) ব্যবস্থাপনা পরিচালক দীর্ঘায়ু কুমার শ্রেষ্ঠা গণমাধ্যমকে জানান, বন্যায় পূর্বে অনুমোদিত কেন্দ্রগুলো বিকল হওয়ার পর নেপালের বিকল্প দুটি জলবিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ বাংলাদেশে রপ্তানি করার জন্য ভারতের কেন্দ্রীয় বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষের (সিইএ) নিকট নতুন করে ছাড়পত্র চাওয়া হয়। পরবর্তীতে ভারতের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক অনুমোদন পাওয়ার পর নতুন বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে সংযোগ চালুর মাধ্যমে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহ পুনরায় শুরু করা সম্ভব হয়েছে।
নতুন এই প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়ায় নেপালের ‘সোলু খোলা’ এবং ‘কাবেলি বি-১’ জলবিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ বাংলাদেশে সরবরাহ বা রপ্তানির অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে, নেপালের ‘লোয়ার মোদি খোলা’ জলবিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ ভারতের হরিয়ানায় পাঠানোর অনুমতি মিলেছে। উল্লেখ্য, এর পূর্বে কেবল ত্রিশূলী, চিলিমে ও দেবীঘাট জলবিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে সরাসরি বিদ্যুৎ রপ্তানির অনুমোদন কার্যকর ছিল।
ব্যবস্থাপনা পরিচালক দীর্ঘায়ু কুমার শ্রেষ্ঠা উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে বলেন, “সাম্প্রতিক ভয়াবহ বন্যায় একাধিক জলবিদ্যুৎকেন্দ্র ও সঞ্চালন অবকাঠামো মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া সত্ত্বেও দ্রুত সময়ের মধ্যে বিকল্প উৎস প্রস্তুত করে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ রপ্তানি সচল রাখা নেপালের বিদ্যুৎ বাণিজ্য ও আঞ্চলিক কূটনৈতিক সহযোগিতার জন্য অত্যন্ত বড় একটি অগ্রগতি। বাংলাদেশে রপ্তানি পুনরায় চালু হওয়ায় বর্ষা মৌসুমে নেপালে উৎপাদিত উদ্বৃত্ত বিদ্যুতের সঠিক ব্যবস্থাপনা যেমন সহজ হবে, তেমনি সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ায় আঞ্চলিক বিদ্যুৎ বাণিজ্যের নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে।”
উল্লেখ্য, এর আগে ২০২৪ সালের ৩ অক্টোবর বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি) এবং নেপাল বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষের মধ্যে ঐতিহাসিক এক পাঁচ বছর মেয়াদি বিদ্যুৎ ক্রয়-বিক্রয় চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। উক্ত চুক্তি অনুযায়ী, প্রতিবছর বর্ষা ও তৎপরবর্তী মেয়াদে অর্থাৎ ১৫ জুন থেকে ১৫ নভেম্বর পর্যন্ত টানা পাঁচ মাস বাংলাদেশে প্রতিদিন ৪০ মেগাওয়াট করে বিদ্যুৎ সরবরাহ করার আইনি বাধ্যবাধকতা রয়েছে নেপালের।
এদিকে প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে বেশ কয়েকটি উৎপাদন কেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া সত্ত্বেও আন্তর্জাতিক বাজারে বিদ্যুৎ রপ্তানি থেকে নেপালের রাজস্ব আয় আগের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। এনইএ-এর দেওয়া তথ্যমতে, চলতি বছরের মধ্য-সেপ্টেম্বর থেকে মধ্য-অক্টোবর পর্যন্ত সময়কালে দেশটি কেবল ভারতে ৬৩ কোটি ৩৯ লাখ ৮৬ হাজার ইউনিট বিদ্যুৎ রপ্তানি করে প্রায় ৫৯ কোটি ২৫ লাখ নেপালি রুপি আয় করেছে, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় বহুগুণ বেশি।