দেশে রোগীদের চিকিৎসা ব্যয়ের ৮০ শতাংশ যায় নিজেদের পকেট থেকে
নিজস্ব প্রতিবেদক: বাংলাদেশে চিকিৎসা ব্যয় লাগামহীনভাবে বৃদ্ধি পাওয়ার বিষয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ডা. এম এ মুহিত। তিনি জানিয়েছেন, দেশে বর্তমানে স্বাস্থ্যসেবায় মোট ব্যয়ের প্রায় ৮০ শতাংশই রোগীদের নিজেদের পকেট থেকে (আউট অব পকেট এক্সপেন্ডিচার) বহন করতে হয়, যা অত্যন্ত আশঙ্কাজনক। এর বিপরীতে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশ থাইল্যান্ডে এই হার মাত্র ১০ শতাংশ এবং মালদ্বীপে প্রায় ১৮ শতাংশ।
আজ রোববার (২৮ জুন) জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী দেশের চিকিৎসা খাতের এই বাস্তব চিত্র তুলে ধরেন।
ডা. এম এ মুহিত বলেন, বর্তমানে বাংলাদেশে একটি প্রধান ও জনদুর্ভোগের সমস্যা হলো চিকিৎসার ব্যয় ক্রমাগত বৃদ্ধি পাওয়া। তবে তার চেয়েও ভয়ঙ্কর ও উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে, এই ব্যয়ের সিংহভাগ অর্থাৎ প্রায় ৮০ শতাংশই রোগীকে নিজের পকেট থেকে টাকা দিয়ে মেটাতে হয়, যা অনেক পরিবারকে নিঃস্ব করে দিচ্ছে।
এবারের বাজেটে কোনো ধরনের অপরিকল্পিত হাসপাতাল বা নতুন ভবন নির্মাণের ক্ষতিকর পরিকল্পনা রাখা হয়নি উল্লেখ করে তিনি বলেন, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের স্বাস্থ্য বাজেটের মূল লক্ষ্য হলো ভেঙে পড়া স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে পুনর্গঠন করা। সরকার এমন একটি সমন্বিত ও টেকসই স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে চায়, যেখানে আর্থিক অবস্থান নির্বিশেষে দেশের প্রতিটি নাগরিক বিনামূল্যে ও সহজে মানসম্মত চিকিৎসাসেবা পাবেন। মূলত সাধারণ মানুষের জন্য একটি সহজপ্রাপ্য, সাশ্রয়ী এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তুলতেই এই বাজেট প্রণয়ন করা হয়েছে।
সংসদে বিরোধী দলের একমুখী সমালোচনার জবাব দিয়ে স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী বলেন, “আমাদের বিরোধী দল মাঝে মধ্যেই রাষ্ট্রের নানা সংস্কারের কথা বলেন, জুলাই সনদের কথা বলেন। কিন্তু তারা শুধু সেই সংস্কারের কথাই বলেন, যে সংস্কার তাদের ক্ষমতার ভাগ দেবে। তারা স্বাস্থ্য খাতের মতো জনগুরুত্বপূর্ণ সংস্কার নিয়ে আজ পর্যন্ত সংসদে একদিনও কথা বলেননি।” স্বাস্থ্য খাত সংস্কার কমিশনের রিপোর্টের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তনের লক্ষ্যে একটি স্বাস্থ্য সংস্কার কমিশন গঠন করা হয়েছিল, যারা অনেক চিন্তাভাবনা করে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ও যুগান্তকারী সুপারিশ জমা দিয়েছে। বিরোধী দল যদি সেই স্বাস্থ্য খাত সংস্কার কমিশনের রিপোর্ট নিয়ে সংসদে গঠনমূলক আলোচনা করত, তবে তিনি বেশি খুশি হতেন বলে জানান।
দেশের স্বাস্থ্য খাতের প্রধান ও নতুন চ্যালেঞ্জগুলো তুলে ধরে ডা. এম এ মুহিত বলেন, বর্তমানে বাংলাদেশে মোট মৃত্যুর প্রায় ৭১ শতাংশই অসংক্রামক রোগের (নন-কমিউনিকেবল ডিজিজ) কারণে ঘটে থাকে। এসব নীরব ঘাতক রোগের মধ্যে ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ, কিডনি রোগ এবং অন্যান্য দীর্ঘমেয়াদি রোগ প্রধান। এই জটিল পরিস্থিতি মোকাবিলায় আধুনিক চিকিৎসা প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো এবং সামগ্রিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার উন্নয়নের মাধ্যমে স্বাস্থ্যসেবাকে আরও কার্যকর করার ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্বারোপ করেন তিনি। একইসঙ্গে স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করা, স্বাস্থ্যসেবা তৃণমূল পর্যায়ে বিকেন্দ্রীকরণ এবং স্বাস্থ্য খাতের সব ধরনের ক্রয় প্রক্রিয়ায় আরও বেশি স্বচ্ছতা, আধুনিকায়ন ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার ওপর জোর দেন।
তিনি দেশের জনগণকে আশ্বস্ত করে বলেন, সরকার আগামীতে এমন একটি বৈষম্যহীন স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তুলবে যেখানে শহর ও গ্রামের মানুষ একই মানের উন্নত স্বাস্থ্যসেবা পাবে এবং এই ব্যবস্থার মূল ভিত্তি হবে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা (প্রাইমারি হেলথ কেয়ার)। এবার স্বাস্থ্য খাতের বাজেট বিগত বছরের তুলনায় ১০০ শতাংশ বৃদ্ধি করা হয়েছে জানিয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, বাজেট দ্বিগুণেরও বেশি বৃদ্ধির ফলে সরকার এখন হাসপাতালের চিকিৎসার চেয়ে রোগ প্রতিরোধেই (প্রিভেন্টিভ হেলথ) বেশি গুরুত্ব দেবে। একইসঙ্গে সাধারণ মানুষের উন্নত স্বাস্থ্যসেবা প্রাপ্তি নিশ্চিত করতে খুব দ্রুত শহর থেকে জেলা-উপজেলা পর্যন্ত একটি কার্যকর রেফারেল নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা হবে।
|