ইসলামিক ফাউন্ডেশন সংস্কার ও হজ খরচ কমানোর উদ্যোগ: ধর্মমন্ত্রী কায়কোবাদ
নিজস্ব প্রতিবেদক: আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দেশজুড়ে পরিচালিত মডেল মসজিদ নির্মাণসহ বিভিন্ন প্রকল্পের ভয়াবহ অনিয়ম ও দুর্নীতি খতিয়ে দেখতে বিশেষ তদন্ত কমিটি গঠনের আনুষ্ঠানিক নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রী কাজী শাহ মোফাজ্জল হোসাইন কায়কোবাদ। একইসঙ্গে বিতর্কিত ইসলামিক ফাউন্ডেশনকে সব ধরনের রাজনৈতিক প্রভাব থেকে মুক্ত করে নতুন করে ঢেলে সাজানো এবং আগামী মৌসুমে হজ নিবন্ধনের মোট খরচ আরও কমিয়ে সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে আনার দৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন তিনি।
দৈনিক ইনকলাব ডিজিটাল-এর বিশেষ সাক্ষাৎকারভিত্তিক অনলাইন অনুষ্ঠান ‘ইনকলাব রাজনৈতিক আলাপ’-এ অতিথি হিসেবে উপস্থিত হয়ে ধর্মমন্ত্রী এসব গুরুত্বপূর্ণ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন দৈনিক ইনকিলাবের সহকারী সম্পাদক মেহেদী হাসান পলাশ।
সাবেক সরকারের সময়ে নির্মিত মডেল মসজিদ প্রকল্পগুলোতে ব্যাপক লুটপাট, রড-সিমেন্টের অনিয়ম ও আর্থিক দুর্নীতির অভিযোগ প্রসঙ্গে এক প্রশ্নের জবাবে ধর্মমন্ত্রী জানান, বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখতে ইতোমধ্যে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। জাতীয় সংসদে সম্প্রতি উত্থাপিত আলোচনার সূত্র ধরে তিনি বলেন, "আজকেই কমিটি করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহোদয় পার্লামেন্টে আমার পক্ষ থেকে প্রশ্ন উত্তর দেওয়াকালীন সময়ে এ কথাটা বলেছেন যে একটা তদন্ত কমিটি করা হবে। উনি একটা চিঠিও লিখেছেন, আমি সেই চিঠির উপরে তদন্ত করার নির্দেশ দিয়েছি এবং ইনশাআল্লাহ কিছুদিন তদন্ত হয়ে এ ব্যাপারে একটা ব্যবস্থা নেওয়া হবে।"
ইসলামিক ফাউন্ডেশনের অতীত ভূমিকা ও দলীয়করণের তীব্র সমালোচনা করে ধর্মমন্ত্রী স্পষ্ট ভাষায় বলেন, বিগত দিনে এই রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানটি মূল ইসলাম প্রচার ও প্রসারের চেয়ে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলে বেশি ব্যবহৃত হয়েছে। সংস্থায় নতুন মহাপরিচালক (ডিজি) নিয়োগের মাধ্যমে প্রশাসনিক পুনর্গঠন ও সংস্কার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, "আমাদের পরিকল্পনা হলো ইসলামিক ফাউন্ডেশনকে সম্পূর্ণ ঢেলে সাজানো। যারা এতদিন রাজনীতি করে ইসলামিক ফাউন্ডেশনকে কলুষিত করেছে, ফাউন্ডেশনের স্বাভাবিক কাজকর্মকে ব্যাহত করেছে, তাদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আমি অলরেডি নির্দেশ প্রদান করেছি এসব ব্যাপারে সার্বিক তদন্ত করার জন্য।"
বর্তমান সরকারের প্রথম ১৮০ দিনের অর্জনের খতিয়ান তুলে ধরে হজ ব্যবস্থাপনার ইতিবাচক পরিবর্তনের কথা জানান কাজী শাহ মোফাজ্জল হোসাইন কায়কোবাদ। তিনি উল্লেখ করেন, অতীতে হজের মৌসুমে সাধারণ হজযাত্রীদের নানাবিধ ভোগান্তি, এয়ারলাইন্স টিকেটের অনৈতিক কালোবাজারি ও এজেন্সিগুলোর চরম অব্যবস্থাপনা লেগেই থাকত। তবে এবার সরকারের সুনির্দিষ্ট তদারকি ও কঠোর নিয়ন্ত্রণের কারণে কোনো হাজী সাহেব শেষ মুহূর্তে বিমান টিকেট বা ভিসা জটিলতায় বাদ পড়েননি। এমনকি শেষ মুহূর্তে ভিসা থাকা সত্ত্বেও টিকিটের অভাবে আটকে পড়া দুজন সাধারণ হাজীর জন্য তিনি ব্যক্তিগত উদ্যোগে টিকিটের ব্যবস্থা করে দেন।
আসন্ন হজ মৌসুমে হজ খরচ আরও কমিয়ে সাধারণ ধর্মপ্রাণ মানুষের সাধ্যের মধ্যে আনার সুখবর দিয়ে ধর্মমন্ত্রী জানান, "বিমানের ভাড়া একসময় গত সরকারের সময়ে প্রায় ২ লাখ টাকা পর্যন্ত উঠে গিয়েছিল। এবার যে হজটা সম্পন্ন করা হয়েছে, অনেক কম খরচে বিমানের ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছিল। আগামী হজ মৌসুমের জন্য বিমানের ভাড়া ১ লাখ ৩০ হাজার ৩০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।"
বক্তব্যে দেশের আলেম-ওলামা ও কওমি মাদরাসা শিক্ষা ব্যবস্থার ভূয়সী প্রশংসা করে ধর্মমন্ত্রী বলেন, কোনো ধরনের সরকারি সাহায্য বা বৈদেশিক অনুদান ছাড়াই এই দ্বীনি প্রতিষ্ঠানগুলো শত শত বছর ধরে পবিত্র কোরআনের বিশুদ্ধ শিক্ষা ধরে রেখেছে। তিনি আবেগের সাথে বলেন, "বাংলাদেশে যতগুলি মাদরাসা আছে, কোন সরকারি সাহায্য লাগে না, ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের সাহায্য লাগে না, এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের সাহায্য লাগে না—আল্লাহ তাআলা নিজেই এগুলো চালাচ্ছেন। ওখান থেকে যে খুদে হাফেজরা বের হচ্ছেন, ৩০ পারা কোরআন শরীফ এমন নিখুঁতভাবে মুখস্ত করেন যে একটা জের-জবর পর্যন্ত ভুল হয় না।"
এ ছাড়া দেশে অসাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের অধিকার রক্ষায় বর্তমান বিএনপি সরকারের অনড় অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করে মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর ঐতিহাসিক সুন্নাহ ও বাণী স্মরণ করিয়ে দেন ধর্মমন্ত্রী। তিনি বলেন, "আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পরিষ্কারভাবে বলেছেন, ‘সংখ্যালঘুদের জান, মাল, রক্ত তোমাদের আমানত।’ হুজুর (সা.)-এর এই পবিত্র নির্দেশনা যদি দেশের প্রত্যেকটা মুসলমান সঠিকভাবে পালন করি, তাহলে অন্য ধর্মের মানুষরা আমাদের সমাজে সবচেয়ে বেশি শান্তিতে ও আরামে থাকবে।
|