গ্রেড-১ ফ্যাটি লিভার থেকে বাঁচতে ৫ করণীয় ও লাইফস্টাইল
স্বাস্থ্য ডেস্ক: বর্তমান যুগে অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন ও ফাস্টফুডের প্রতি অতিরিক্ত ঝুঁকে পড়ার কারণে দেশজুড়ে ফ্যাটি লিভারের সমস্যা জ্যামিতিক হারে বাড়ছে। অনেক সময়ই দেখা যায়, মানুষ অন্য কোনো শারীরিক সমস্যার কারণে সাধারণ স্বাস্থ্য পরীক্ষা বা আলট্রাসনোগ্রাফি করাতে গিয়ে হঠাৎ জানতে পারেন যে তাঁদের লিভারে চর্বি জমেছে।
মেডিকেল রিপোর্টে যখন ‘গ্রেড-১ ফ্যাটি লিভার’ লেখাটি সামনে আসে, তখন স্বাভাবিকভাবেই মনে এক ধরণের অজানা আতঙ্ক ও তীব্র উদ্বেগ তৈরি হয়। অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগে—এই রোগটি ঠিক কতটা মারাত্মক? কিংবা একবার লিভারে চর্বি জমলে তা কি আর কোনোদিন পুরোপুরি ভালো হওয়া সম্ভব? তবে এই বিষয়ে চিকিৎসাবিজ্ঞান ও লিভার বিশেষজ্ঞরা বরাবরের মতোই আশ্বস্ত করেছেন। তাঁদের মতে, গ্রেড-১ ফ্যাটি লিভার নিয়ে অতিরিক্ত ভয় পাওয়ার কোনো কারণ নেই। কারণ এটি হলো এই সমস্যার একেবারে প্রাথমিক ধাপ। এই পর্যায়ে লিভারের কোষে চর্বি জমতে শুরু করলেও সাধারণত লিভারের কোনো স্থায়ী বা বড় ধরণের ক্ষতি হয় না।
সঠিক সময়ে যদি সচেতন হওয়া যায় এবং দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় ইতিবাচক পরিবর্তন আনা যায়, তবে লিভারের অবস্থা চিকিৎসকের পরামর্শ ও ঘরোয়া যত্নে আবারও পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়ে আসতে পারে।
ফ্যাটি লিভার আসলে কী?
সহজ ভাষায়, লিভারের সাধারণ কোষে যখন প্রয়োজনের চেয়ে অতিরিক্ত চর্বি বা ফ্যাট জমা হয়, তখন তাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় ফ্যাটি লিভার বলা হয়। সাধারণত শরীরের অতিরিক্ত ওজন, অনিয়ন্ত্রিত ও অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস, রক্তে ক্ষতিকর কোলেস্টেরল বা ট্রাইগ্লিসারাইডের মাত্রা বেশি থাকা, শারীরিক পরিশ্রমের তীব্র অভাব এবং নিয়মিত তৈলাক্ত ও অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস এই রোগের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। বর্তমানে শুধু বয়স্করাই নন, বরং কর্মজীবী তরুণদের মধ্যেও ফ্যাটি লিভারের প্রবণতা আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে।
এই সমস্যার সবচেয়ে বড় জটিল দিক হলো, গ্রেড-১ ফ্যাটি লিভারে আক্রান্ত বেশিরভাগ রোগীর শরীরেই কোনো প্রকার বাহ্যিক লক্ষণ বা উপসর্গ দেখা যায় না। ফলে রোগটি ভেতরে ভেতরে বাড়লেও আক্রান্ত ব্যক্তি টের পান না। বেশিরভাগ সময় রুটিন হেলথ চেকআপের সময়ই এটি ধরা পড়ে।
গ্রেড-১ ফ্যাটি লিভার নিয়ন্ত্রণে ৫টি জরুরি অভ্যাস বদল:
যাঁদের শরীরের ওজন স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি, তাঁদের জন্য ওজন নিয়ন্ত্রণে আনা এই রোগ থেকে মুক্তির সবচেয়ে প্রধান শর্ত। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গবেষণায় দেখা গেছে, একজন মানুষ যদি তাঁর শরীরের মোট ওজনের মাত্র ৫ থেকে ১০ শতাংশও বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে কমাতে পারেন, তবে লিভারে জমে থাকা চর্বির পরিমাণ নাটকীয় ও উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পায়।
প্রতিদিনের মূল খাদ্যতালিকায় সবুজ শাকসবজি, টাটকা ফলমূল, আঁশসমৃদ্ধ (ফাইবার) খাবার এবং পুষ্টিকর লাল চাল বা আটার তৈরি খাবার রাখুন। অন্যদিকে অতিরিক্ত চিনি, কোমল পানীয়, কৃত্রিম জুস, ফাস্টফুড, প্যাকেটজাত প্রক্রিয়াজাত খাবার, অতিরিক্ত তেল-চর্বি ও ছাঁকা তেলে ভাজাপোড়া খাবার তালিকা থেকে পুরোপুরি বাদ দিতে হবে
আলসেমি ঝেড়ে ফেলে প্রতিদিন অন্তত ৩০ মিনিট নিয়ম করে জোরে হাঁটা (ব্রিস্ক ওয়াকিং), সাইকেল চালানো, সাঁতার কাটা বা ফ্রি-হ্যান্ড এক্সারসাইজ করা লিভারের চর্বি গলাতে জাদুর মতো কাজ করে। এটি শরীরের মেটাবলিজম বা বিপাকপ্রক্রিয়া ঠিক রেখে লিভারকে সচল রাখে।
ফ্যাটি লিভারের সমস্যার সাথে উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস এবং রক্তে এলডিএল (খারাপ কোলেস্টেরল)-এর অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ও মারাত্মক সম্পর্ক রয়েছে। তাই শরীরে এই হরমোনাল বা মেটাবলিক সমস্যাগুলো যদি নিয়ন্ত্রণে রাখা না যায়, তবে ফ্যাটি লিভারের কোনো উন্নতি সম্ভব নয়।
অ্যালকোহল বা মদ লিভারের কোষকে সরাসরি ধ্বংস করে দেয়। চিকিৎসকদের মতে, যাঁদের লিভারে ইতিমধ্যেই গ্রেড-১ ফ্যাটি লিভার বা লিভারের অন্য কোনো মৃদু সমস্যা ধরা পড়েছে, তাঁদের যেকোনো ধরণের অ্যালকোহল সেবন থেকে আজীবনের জন্য সম্পূর্ণ দূরে থাকতে হবে।
পরিশেষে বিশেষজ্ঞরা বলেন, গ্রেড-১ ফ্যাটি লিভার ধরা পড়লে সামাজিক বা মানসিক কোনো আতঙ্কের প্রয়োজন নেই। তবে একে মৃদু ভেবে অবহেলা করাও বোকামি হবে। সঠিক খাদ্যাভ্যাস, ওজন নিয়ন্ত্রণ এবং চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চললে ওষুধ ছাড়াই এই অবস্থা থেকে সম্পূর্ণ সুস্থ হওয়া সম্ভব।
|