ইরানে মার্কিন হামলায় ৭ সেনাসহ ৩৭ জন নিহত
আন্তর্জাতিক ডেস্ক: যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার চলমান সংঘাত এখন আর আকাশ বা জলপথের মহড়ায় সীমাবদ্ধ নেই, তা রূপ নিয়েছে এক ভয়াবহ মানবিক ও সামরিক বিপর্যয়ে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ধমনী হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ও নৌ-অবরোধকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া উত্তেজনার ধারাবাহিকতায় টানা পঞ্চম দিনের মতো ইরানের বিভিন্ন সামরিক ও বেসামরিক লক্ষ্যবস্তুতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে মার্কিন বাহিনী।
সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টার এই প্রলয়ঙ্কারী হামলায় ইরানের ৩৮৮তম ব্রিগেডের ৭ জন সেনাসহ অন্তত ৩৭ জন নিহত হয়েছেন। একই সাথে বিগত কয়েক দিনের ধারাবাহিক হামলায় দক্ষিণ ইরানে বহু বেসামরিক নাগরিকের প্রাণহানির খবর পাওয়া গেছে।
ইরানের নিয়মিত সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে দেওয়া এক জরুরি বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, দক্ষিণ ইরানের বমপুর (Bampur) এলাকায় অবস্থিত একটি গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ঘাঁটিতে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী একযোগে ১৩টি অত্যাধুনিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে। মার্কিন এই সুনির্দিষ্ট হামলার মূল লক্ষ্য ছিল ওই সেনাঘাঁটির অতিথিশালা (Guest House), প্রহরীদের সেন্ট্রি চৌকি এবং সাধারণ সৈনিকদের থাকার মূল ব্যারাক বা কোয়ার্টার।
এই হামলায় ঘাঁটিতে দায়িত্বরত ৩৮৮তম ব্রিগেডের ৭ জন সেনা ঘটনাস্থলেই নিহত হন এবং বেশ কয়েকজন গুরুতর জখম হন। ইরানের সেনাবাহিনীর দাবি, যুক্তরাষ্ট্রের মূল লক্ষ্য ছিল আকস্মিক হামলা চালিয়ে সবচেয়ে বেশি মানুষের প্রাণহানি ও অবকাঠামোগত ক্ষতি করা। তবে ইরানের নিজস্ব বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা (Air Defense System) সময়মতো সক্রিয় হওয়ায় এবং কিছু মিসাইল আকাশে ধ্বংস করায় ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কিছুটা কম হয়েছে। এই হামলাকে ‘কাপুরুষোচিত’ আখ্যা দিয়ে সঠিক সময়ে ওয়াশিংটনকে এর কড়া জবাব দেওয়া হবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছে তেহরান।
এদিকে সামরিক স্থাপনার পাশাপাশি বেসামরিক অঞ্চলেও মার্কিন হামলার প্রভাব পড়েছে মারাত্মকভাবে। ইরান সরকারের আনুষ্ঠানিক মুখপাত্র ফাতেমা মোহাজেরানি (Fatemeh Mohajerani) এক প্রেস ব্রিফিংয়ে জানিয়েছেন, বিগত কয়েক দিনে দক্ষিণ ইরানের বিভিন্ন শহর ও দ্বীপে মার্কিন বিমান হামলার কারণে ৩০ জনেরও বেশি সাধারণ নিরীহ নাগরিক প্রাণ হারিয়েছেন।
নিহতদের পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা ও শোক জানিয়ে ফাতেমা বলেন, “বর্তমান সংকটে সরকার সর্বশক্তি দিয়ে জনগণের পাশে আছে। মার্কিন আগ্রাসনে আমরা পিছু হটব না, কারণ দক্ষিণ ইরান হলো আমাদের দেশের হৃদস্পন্দন।”
ইরানের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র হোসেইন কেরমানপুর (Hossein Kermanpour) সর্বশেষ হামলার চিকিৎসা সংক্রান্ত হালনাগাদ তথ্য দিয়ে জানিয়েছেন, মার্কিন বাহিনীর সাম্প্রতিক হামলায় এ পর্যন্ত ২৬০ জনেরও বেশি মানুষ আহত হয়েছেন। উদ্বেগজনক বিষয় হলো, আহতদের মধ্যে অন্তত ৩ জনের বয়স ১৮ বছরের নিচে তথা তারা অপ্রাপ্তবয়স্ক ও শিশু। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় আরও জানায়, আহতদের মধ্যে ২২২ জনকে প্রাথমিক ও জরুরি চিকিৎসা দেওয়ার পর হাসপাতাল থেকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে এবং বাকিদের অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে।
উল্লেখ্য, টানা পাঁচ দিন ধরে ইরানের বিভিন্ন কৌশলগত অঞ্চলে সর্বাত্মক আকাশ ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানোর পাশাপাশি ইরানের প্রধান প্রধান বাণিজ্যিক ও জ্বালানি রফতানিকারক বন্দরগুলোতে নতুন করে কঠোর নৌ-অবরোধ (Naval Blockade) বজায় রেখেছে মার্কিন নৌবাহিনী। এই অবরোধের ফলে মধ্যপ্রাচ্যে যেকোনো সময় বড় ধরনের আঞ্চলিক যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা করছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকেরা।
|