শি জিনপিংকে রাজকীয় অভ্যর্থনা জানাতে প্রস্তুত হোয়াইট হাউস

প্রকাশ: বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৫:৪৩ অপরাহ্ণ
শি জিনপিংকে রাজকীয় অভ্যর্থনা জানাতে প্রস্তুত হোয়াইট হাউস
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং (ফাইল ছবি)।

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: দীর্ঘ প্রায় এক দশক পর মার্কিন মাটিতে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংকে স্বাগত জানাতে ওয়াশিংটনে এক অভূতপূর্ব ও রাজকীয় আয়োজনের প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন। এটি ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের তৃতীয় দ্বিপক্ষীয় রাষ্ট্রীয় বৈঠক, যা দুই পরাশক্তির বৈশ্বিক সম্পর্কে নতুন মোড় আনতে পারে বলে ধারণা করছেন বিশ্লেষকরা।

অ্যান্ড্রুজ বিমানঘাঁটিতে খোদ স্বাগতিক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কর্তৃক ব্যক্তিগত অভ্যর্থনা থেকে শুরু করে হোয়াইট হাউসে প্রায় ৫০০ সামরিক সদস্যের উপস্থিতিতে সামরিক ফ্লাইওভার, বর্ণাঢ্য নৈশভোজ ও সাংস্কৃতিক প্রদর্শনীর মতো নজিরবিহীন আড়ম্বর রাখা হয়েছে এই সফরে। এশিয়া ট্রাস্টের গবেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের কোনো ঐতিহ্যবাহী মিত্র দেশের ক্ষেত্রেও এই মাত্রার সামরিক ও প্রাতিষ্ঠানিক আনুষ্ঠানিকতা প্রদর্শনের ঘটনা অত্যন্ত বিরল, চীন যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান অর্থনৈতিক ও কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বী।

বাণিজ্য চুক্তির নবায়ন দুই পরাশক্তির এই হাই-স্টেক্স বা উচ্চপর্যায়ের বৈঠকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে মেয়াদোত্তীর্ণ হতে যাওয়া ঐতিহাসিক দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য চুক্তি। এর আগে দক্ষিণ কোরিয়ায় ট্রাম্প-জিনপিং বৈঠকের ফলস্বরূপ ওয়াশিংটন অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ স্থগিত করেছিল এবং বেইজিং বিরল খনিজ পদার্থ রপ্তানির ওপর থেকে সাময়িক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করেছিল, যার নির্ধারিত মেয়াদ চলতি বছরের নভেম্বর মাসেই শেষ হতে চলেছে।

উভয় দেশের বাণিজ্য ঘাটতি ৯১ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যাওয়ায় এবং মার্কিন কৃষি পণ্য ও অ-শুল্ক বাণিজ্যের শর্তাবলি নিয়ে সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে অনুষ্ঠিত প্রাথমিক আলোচনা খুব একটা ফলপ্রসূ না হওয়ায়, এই নতুন চুক্তি নবায়নের ওপর তীক্ষ্ণ নজর রাখছেন বৈশ্বিক অর্থনীতিবিদরা। ট্রাম্প প্রশাসন অভ্যন্তরীণ বাজারে চীনা পণ্যের ওপর কঠোর রক্ষণশীল অবস্থান বজায় রাখতে চাইলেও, বেইজিং মার্কিন ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি বাণিজ্যিক সম্পর্ক আরও গভীর করতে আগ্রহী।

এআই প্রযুক্তি নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিযোগিতা বাণিজ্যিক উত্তেজনার পাশাপাশি বিশ্বজুড়ে বহুল আলোচিত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তি নিয়ন্ত্রণ এবং আধিপত্য বিস্তার এই সফরের অন্যতম প্রধান আলোচ্য সূচিতে রূপ নিয়েছে। মার্কিন সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্সসহ প্রভাবশালী আইনপ্রণেতা এবং জাতীয় নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা ট্রাম্পের ওপর ‘সুপার ইন্টেলিজেন্স’ ও এআই প্রযুক্তির লাগাম টানতে বৈশ্বিক বিরতির যৌথ চুক্তি স্বাক্ষরের জন্য চাপ সৃষ্টি করে চলেছেন। তবে ট্রাম্প ব্যক্তিগতভাবে এআই খাতে চীনকে প্রতিযোগিতায় পরাজিত করাকে আমেরিকার অর্থনৈতিক ও বিশ্বক্ষমতার লড়াইয়ের মূল চাবিকাঠি হিসেবে দেখছেন। তা সত্ত্বেও, প্রযুক্তি খাতের সম্ভাব্য কিছু নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে উভয় পক্ষ পারস্পরিক সহযোগিতার ক্ষেত্র উন্মোচনে সমঝোতায় পৌঁছাতে পারে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা।

তাইওয়ান ও কৌশলগত নিরাপত্তা ইস্যু এই সফরের সবচেয়ে বড় কৌশলগত টানাপোড়েনের জায়গাটি হলো স্বশাসিত তাইওয়ান ভূখণ্ড। মার্কিন কংগ্রেসে পাস হওয়া কয়েক বিলিয়ন ডলারের তাইওয়ান অস্ত্র বিক্রি সংক্রান্ত প্রস্তাবে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এখনো চূড়ান্ত স্বাক্ষর করেননি; বরং বিষয়টিকে চীনের সঙ্গে দরকষাকষির টেবিলে একটি শক্তিশালী ‘ট্রাম্পকার্ড’ হিসেবে ব্যবহার করছেন তিনি।

চীন তাইওয়ানকে নিজেদের অবিচ্ছেদ্য ভূখণ্ডের অংশ হিসেবে একীভূত করতে বদ্ধপরিকর। ফলে শি জিনপিং এই সফরকে কাজে লাগিয়ে ট্রাম্পের অস্ত্র বিক্রির প্রক্রিয়া বিলম্বিত বা পুরোপুরি বাতিল করার রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির প্রত্যাশা করছেন। যদিও ট্রাম্পের মন্ত্রিসভা ও নিরাপত্তা উপদেষ্টাদের বড় অংশ চীনের প্রতি চরম সন্দিহান, স্বয়ং ট্রাম্প বিশ্বমঞ্চে দুই পরাশক্তির সরাসরি সংঘাতময় পরিস্থিতি এড়িয়ে চলতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। এখন দেখার বিষয়, এই রাজকীয় আতিথেয়তার আড়ালে দুই নেতার কূটনৈতিক টেবিল থেকে কী বার্তা বেরিয়ে আসে।

মন্তব্য করুন