জামালপুরে ১০০ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প একনেকে পাস হলেও মাঠে নেই কাজ
জামালপুর প্রতিনিধি: ব্যবস্থাপনাগত নানা জটিলতা, অর্থসংকট এবং ঠিকাদারি কার্যক্রমে দীর্ঘ স্থবিরতার কারণে আটকে আছে জামালপুরের মাদারগঞ্জ ১০০ মেগাওয়াট আরপিসিএল সোলার পাওয়ার প্ল্যান্টের নির্মাণকাজ। জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় প্রকল্পটি পুনরায় সংশোধিত আকারে অনুমোদন পেলেও মাঠপর্যায়ে এর মূল নির্মাণকাজ এখনো দৃশ্যমানভাবে শুরু হয়নি। ফলে প্রকল্পটি সময়মতো বাস্তবায়ন নিয়ে স্থানীয় লোকজনের মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ ও অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।
মাদারগঞ্জ উপজেলার জোড়খালি ইউনিয়নের কাইজার চরে ৩১৬ দশমিক ৬৫ একর জমির ওপর নির্মিত হতে যাওয়া এই বিদ্যুৎকেন্দ্রটি দেশের অন্যতম বৃহৎ সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প হিসেবে বিবেচিত। ২০২১ সালে কাজ শুরু হওয়া এই প্রকল্প থেকে প্রতিবছর প্রায় ১ লাখ ৭৮ হাজার ২৭৪ মেগাওয়াট ঘণ্টা বিদ্যুৎ উৎপাদনের সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল।
প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্র জানায়, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা, মার্কিন ডলারের মূল্যবৃদ্ধি, বেশ কয়েকবার ঘটে যাওয়া বন্যা, দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন এবং বিদেশি ঋণ ছাড়ের ক্ষেত্রে নানা জটিলতার কারণে প্রকল্পের কাজের গতি মারাত্মকভাবে মন্থর হয়ে পড়ে। একপর্যায়ে ২০২৫ সালের আগস্টে প্রকল্পটির সব ধরনের কার্যক্রম স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ওই বছরের ২০ আগস্ট তৎকালীন বিদ্যুৎ উপদেষ্টার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক সভায় পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত কাজ বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়। একই সঙ্গে তৎকালীন প্রকল্প পরিচালকের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ ওঠায় তাঁর বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্যও আরপিসিএলকে জানানো হয়েছিল।
এদিকে, আরপিসিএলের গত বছরের সেপ্টেম্বরের এক চিঠির মাধ্যমে ভারতীয় ইপিসি ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান ‘Amara Raja Infra Pvt Ltd.’-কে সকল ধরনের উপকরণ সরবরাহ বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে জানানো হয়, সেপ্টেম্বর ২০২৫ থেকে তাদের ২১০ কোটি টাকারও বেশি বিল বকেয়া রয়েছে। এই অর্থ পরিশোধ না করায় প্রকল্পের মূল নির্মাণকাজ কার্যত বন্ধ রয়েছে। এছাড়া সুইজারল্যান্ডভিত্তিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ‘AFRY Switzerland Ltd.’-এর সঙ্গে চুক্তির মেয়াদ ২০২৫ সালের জুনে শেষ হওয়ার পর দীর্ঘ সময় নতুন পরামর্শক নিয়োগ না হওয়ায় নকশা অনুমোদন ও ভৌত অগ্রগতিতেও বড় ধরনের জটিলতা তৈরি হয়। পরবর্তীতে চলতি বছরের আগস্টে ‘ATLANTA Enterprise’ নামের একটি বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠানকে পরামর্শক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হলেও বড় প্রকল্পের ক্ষেত্রে তাদের অভিজ্ঞতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা।
দীর্ঘদিন কাজ বন্ধ থাকায় প্রকল্পের ১৩২ কেভি সঞ্চালন লাইন নির্মাণকাজও ব্যাহত হয়েছে। টাঙ্গাইলের ঘাটাইল গ্রিড উপকেন্দ্র পর্যন্ত প্রায় ৪৭ কিলোমিটার দীর্ঘ এই সঞ্চালন লাইনের বিভিন্ন মূল্যবান উপকরণ পড়ে থেকে নষ্ট বা চুরি হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
অবশ্য সকল বাধা পেরিয়ে গত ১৯ আগস্ট একনেক সভায় ১ হাজার ৬১২ কোটি ৭৩ লাখ টাকা ব্যয়ে সংশোধিত আকারে প্রকল্পটি পুনরায় অনুমোদিত হয়েছে। ফলে আর্থিক বা নীতিগত কোনো বড় বাধা না থাকলেও মাঠপর্যায়ে কাজ শুরু না হওয়ায় স্থানীয়দের মধ্যে হতাশা কাটছে না।
সরেজমিন চিত্র ও পুনর্বাসন জটিলতা সম্প্রতি প্রকল্প এলাকা ঘুরে দেখা যায়, কাজ বন্ধ হওয়ার আগে চরাঞ্চলকে নদীভাঙন থেকে রক্ষা করতে আরসিসি ব্লক স্থাপন, মাটি ভরাট ও সৌর প্যানেলের ফ্রেম তৈরির মতো কিছু প্রাথমিক কাজ সম্পন্ন হয়েছিল। তবে বর্তমানে মূল নির্মাণকাজ সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে।
প্রকল্পের আওতায় নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত ২৪১টি ভূমিহীন পরিবারকে পরিকল্পিত আবাসনের মাধ্যমে পুনর্বাসনের কথা থাকলেও সরেজমিনে দেখা যায়, প্রকল্প এলাকায় প্রায় ২ দশমিক ৫১ একর জমিতে এখনো ৩২টি পরিবার মানবেতর জীবনযাপন করছে। স্থানীয় বাসিন্দারা অভিযোগ করেন, তাঁদের পরিবারের সদস্যসংখ্যার তুলনায় ঘর বা জমির পরিমাণ অত্যন্ত অপ্রতুল হওয়ায় তাঁরা পুরোপুরি সন্তুষ্ট হতে পারছেন না। স্থানীয় বাসিন্দা রফিকুল ইসলাম জানান, বিদ্যুৎকেন্দ্রের কারণে এলাকার উন্নয়নের যে স্বপ্ন তারা দেখেছিলেন, কাজ বন্ধ থাকায় সেই আশাও আটকে গেছে।
বিশেষজ্ঞের মতামত ও প্রকল্পের ভবিষ্যৎ জামালপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক কৌশল (ইইই) বিভাগের চেয়ারম্যান মো. সিজার রহমান বলেন, “২০৩০ সালের মধ্যে দেশের মোট বিদ্যুৎ চাহিদার অন্তত ২০ শতাংশ নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে অর্জনের সরকারি লক্ষ্যের সঙ্গে মাদারগঞ্জ সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পটি অত্যন্ত সংগতিপূর্ণ। এটি চালু হলে জামালপুর, টাঙ্গাইল ও আশপাশের অঞ্চলে পিক আওয়ারের বিদ্যুতের চাহিদা পূরণে বড় ভূমিকা রাখবে।” তবে গ্রিড ব্যবস্থাপনা এবং প্যানেল বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মতো পরিবেশগত বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনার পরামর্শ দেন তিনি।
এ বিষয়ে বর্তমান প্রকল্প পরিচালক জাহাঙ্গীর আলম জানান, প্রকল্পের ছোটখাটো কিছু কাজ চলমান রয়েছে এবং খুব দ্রুতই মূল নির্মাণকাজ শুরু হবে। কয়েক সপ্তাহের মধ্যে কাজ পুরোদমে শুরু হলে সব জটিলতা কেটে যাবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
একনেকে পুনরুমোদন পাওয়ার পর এখন কেবল এলাকাবাসী ও সংশ্লিষ্টদের একটাই প্রতীক্ষা—কবে ঘুচবে অনিশ্চয়তা এবং কবে নাগাদ আলোর মুখ দেখবে মাদারগঞ্জের এই মেগা সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প।