উত্তর কোরিয়ার উন্নত হাইপারসনিক অস্ত্রের সফল পরীক্ষা: কিম জং উনের নজরদারি

প্রকাশ: বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৬:০১ অপরাহ্ণ
উত্তর কোরিয়ার উন্নত হাইপারসনিক অস্ত্রের সফল পরীক্ষা: কিম জং উনের নজরদারি
ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা পর্যবেক্ষণ করছেন উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উন ও তাঁর কন্যা জু অ্যায়ে (ফাইল ছবি: কেসিএনএ)।

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: শত্রুর যেকোনো আধুনিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে সহজেই ফাঁকি দিয়ে অত্যন্ত দ্রুতগতিতে নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে নিখুঁত আঘাত হানতে সক্ষম একটি উন্নত হাইপারসনিক অস্ত্রের সফল পরীক্ষা চালিয়েছে উত্তর কোরিয়া। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন বিশ্লেষকদের বরাত দিয়ে এএফপির এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।

এর আগে গত রোববার উত্তর কোরিয়ার পূর্ব উপকূল থেকে দুটি স্বল্পপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ করা হয়েছিল, যা নিয়ে তাৎক্ষণিকভাবে তীব্র নিন্দা জানায় প্রতিবেশী দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপান। দেশ দুটি জানায়, এ ধরনের উসকানিমূলক পদক্ষেপ আঞ্চলিক শান্তি ও নিরাপত্তার জন্য মারাত্মক হুমকি।

যদিও পিয়ংইয়ং পরীক্ষিত অস্ত্রটির সুনির্দিষ্ট নাম বা প্রযুক্তিগত বিস্তারিত প্রকাশ করেনি। তবে দেশটির রাষ্ট্রীয় ক্ষেপণাস্ত্র ব্যুরো জানিয়েছে, দেশের সর্বাধুনিক প্রতিরক্ষা প্রযুক্তির শক্তি প্রদর্শনের অংশ হিসেবেই নতুন এই অস্ত্রের সফল পরীক্ষা চালানো হয়েছে। প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, পরীক্ষিত অস্ত্রটি মূলত উত্তর কোরিয়ার পূর্বে পরীক্ষিত ‘হোয়াসংফো-১১এমএ-১’ হাইপারসনিক স্বল্পপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রেরই একটি অধিকতর উন্নত ও পরিমার্জিত সংস্করণ।

সিউলের ইউনিভার্সিটি অব নর্থ কোরিয়ান স্টাডিজের সাবেক প্রেসিডেন্ট ইয়াং মু-জিন এএফপিকে জানান, ক্ষেপণাস্ত্রটির আনুমানিক পাল্লা ৪৫০ থেকে ৬০০ কিলোমিটারের মধ্যে। অত্যন্ত অল্প সময়ের ব্যবধানে কোরীয় উপদ্বীপের যেকোনো গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ঘাঁটিয়ে আঘাত হানার উপযোগী করেই এটি তৈরি করা হয়েছে।

উত্তর কোরিয়ার রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম কেসিএনএ প্রকাশিত ছবিতে দেখা যায়, দেশটির সর্বোচ্চ নেতা কিম জং উন ও তাঁর মেয়ে জু অ্যায়ে কন্ট্রোল রুমের একটি ডিজিটাল স্ক্রিনে ক্ষেপণাস্ত্রটির উড্ডয়নপথ নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন। ওই স্ক্রিনে বড় করে ‘হোয়াসংফো-১১এমএ-১ ফ্লাইট ট্রাজেক্টরি’ লেখা ফুটে উঠতে দেখা যায়।

রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা কেসিএনএর প্রতিবেদন অনুযায়ী, সাম্প্রতিক এই ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষার পর কিম জং উন কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছেন, এই অস্ত্রের আধুনিকায়ন প্রতিপক্ষের জন্য একধরনের ‘নিরাময় অযোগ্য মাথাব্যথা’ এবং তাদের ওপর ‘অত্যন্ত নিষ্ঠুর ও অনিবার্য আঘাত’ ডেকে আনবে।

রাশিয়ার সঙ্গে সামরিক সংযোগ ও ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট উত্তর কোরিয়ার দীর্ঘদিনের বিতর্কিত পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে গভীর উদ্বেগ রয়েছে। জাতিসংঘের কঠোর নিষেধাজ্ঞা ও হুমকিকে উপেক্ষা করে পিয়ংইয়ং ইতোমধ্যে নিজেদের সংবিধানে পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্র হিসেবে স্থায়ী আইনি স্বীকৃতি প্রতিষ্ঠা করেছে। দেশটির নেতৃত্ব বারবার স্পষ্ট করে জানিয়েছে, তাদের পরমাণু অস্ত্রভাণ্ডার অপরিবর্তনীয় ও প্রশ্নাতীত।

এদিকে, সাম্প্রতিক সময়ে উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে রাশিয়ার ক্রমবর্ধমান ঘনিষ্ঠ সামরিক ও কৌশলগত সম্পর্ক দেশটির সামরিক শক্তি বৃদ্ধিতে বড় অনুঘটক হিসেবে কাজ করছে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক গবেষকরা। চিরাচরিত মিত্র চীনের পাশাপাশি মস্কোর কাছ থেকেও পিয়ংইয়ং নানাবিধ কূটনৈতিক ও প্রযুক্তিগত সমর্থন লাভ করছে।

উত্তর কোরিয়ার গবেষক আহন চ্যান-ইল এএফপিকে বলেন, পিয়ংইয়ং অনেক সময় তাদের সামরিক সক্ষমতা নিয়ে অতিরঞ্জিত প্রচার চালাতে পারে, তবে এতে কোনো সন্দেহ নেই যে দেশটি হাইপারসনিক প্রযুক্তির বাস্তব প্রয়োগ ও উৎক্ষেপণের পর্যায়ে সফলভাবে পৌঁছে গেছে। তাঁর মতে, এ ধরনের অস্ত্র পরীক্ষার মূল উদ্দেশ্য কেবল নিজেদের সামরিক সামর্থ্য বাড়ানোই নয়, বরং ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়ার সামরিক চাহিদা মেটাতে নিজস্ব প্রতিরক্ষা শিল্পে উৎপাদিত অস্ত্রের কার্যকারিতাও মাঠপর্যায়ে পরীক্ষা করে দেখা হতে পারে।

উল্লেখ্য, ২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার সামরিক অভিযান শুরুর পর থেকে পিয়ংইয়ং মস্কোর অন্যতম বিশ্বস্ত মিত্র হয়ে উঠেছে। বিশ্লেষকদের ধারণা, রুশ যুদ্ধ প্রচেষ্টায় সেনা ও রসদ সরবরাহের বিনিময়ে উত্তর কোরিয়া বহুমুখী অর্থনৈতিক সুবিধা এবং উন্নত সামরিক প্রযুক্তির নাগাল পাচ্ছে।

সিউলভিত্তিক কোরিয়া ইনস্টিটিউট ফর মিলিটারি অ্যাফেয়ার্সের জ্যেষ্ঠ গবেষক হং সুং-পিয়ো সতর্ক করে বলেছেন, দক্ষিণ কোরিয়ার বিরুদ্ধে এ ধরনের হাইপারসনিক অস্ত্র ব্যবহার করা হলে তা দক্ষিণ কোরিয়ার নিরাপত্তা ব্যবস্থার জন্য চরম বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। কারণ এই ক্ষেপণাস্ত্রগুলো উড্ডয়নের শেষ পর্যায়ে নেমে আসার সময় আকস্মিক গতিপথ পরিবর্তন করতে পারে। প্রচলিত ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের তুলনায় হাইপারসনিক গতির সঙ্গে এই কৌশলগত ট্রাজেক্টরি পরিবর্তন রাডার বা প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার পক্ষে শনাক্ত এবং সফলভাবে প্রতিহত করা অত্যন্ত দুরূহ করে তোলে।

মন্তব্য করুন