দক্ষিণ আফ্রিকায় অভিবাসীবিরোধী বিক্ষোভ নিহত ২ ও গ্রেপ্তার ৯ শতাধিক

প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ০২ জুলাই ২০২৬, ১০:৩১ পূর্বাহ্ণ
দক্ষিণ আফ্রিকায় অভিবাসীবিরোধী বিক্ষোভ নিহত ২ ও গ্রেপ্তার ৯ শতাধিক
দক্ষিণ আফ্রিকায় অভিবাসীবিরোধী বিক্ষোভের একটি দৃশ্য (ফাইল ছবি: রয়টার্স)

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: দক্ষিণ আফ্রিকাজুড়ে বৈধ কাগজপত্রহীন বিদেশি নাগরিকদের তাড়িয়ে দেওয়ার লক্ষ্যে ডাকা অভিবাসীবিরোধী এক আন্দোলনের জেরে ব্যাপক উত্তেজনার সৃষ্টি হয়েছে। দেশজুড়ে চলমান এই বিক্ষোভের সময় সহিংসতা, লুটপাট ও আইন লঙ্ঘনের দায়ে এখন পর্যন্ত ৯০০ জনেরও বেশি মানুষকে গ্রেপ্তার করেছে দেশটির পুলিশ। গত মঙ্গলবার দেশজুড়ে অনুষ্ঠিত এই বিক্ষোভের সিংহভাগ শান্তিপূর্ণ থাকলেও বেশ কয়েকটি প্রধান শহরে ভয়াবহ সহিংসতা, গোলাগুলি ও বিদেশি নাগরিকদের দোকানে লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে। বুধবার (১ জুলাই) এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে সাউথ আফ্রিকান পুলিশ এই তথ্য নিশ্চিত করেছে।

পুলিশের দাপ্তরিক তথ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার দক্ষিণ আফ্রিকার বিভিন্ন প্রদেশে একযোগে মোট ১২০টি অভিবাসীবিরোধী বিক্ষোভ ও মিছিল অনুষ্ঠিত হয়। এর মধ্যে ১০৮টি কর্মসূচি কোনো ধরনের বড় সংঘর্ষ ছাড়াই শেষ হলেও বাকি ১২টি মিছিলে উগ্র রূপ ধারণ করায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশকে ব্যাপক লাঠিচার্জ ও কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ করতে হয়।

সংবাদ সম্মেলনে দক্ষিণ আফ্রিকা পুলিশের উপ-জাতীয় কমিশনার তেবেলো মোসিকিলি জানান, দেশজুড়ে গ্রেপ্তার হওয়া ৯ শতাধিক ব্যক্তির বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ আনা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে দেশের অভিবাসন আইন গুরুতরভাবে লঙ্ঘন করা, জনসমক্ষে সহিংসতা সৃষ্টি, বৈধ কাগজপত্র ছাড়া থাকা অবৈধ অভিবাসীদের আইনবহির্ভূতভাবে আশ্রয় দেওয়া এবং ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে ডাকাতির মতো দণ্ডনীয় অপরাধ।

এদিকে পুলিশের এক পৃথক বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, মঙ্গলবার গভীর রাতে জোহানেসবার্গের আলেকজান্দ্রা টাউনশিপে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে সংঘর্ষ ও গোলাগুলিতে একজন নিহত হন। ওই এলাকায় বিদেশি নাগরিকদের মালিকানাধীন ছোট ছোট মুদি দোকান— যা স্থানীয়ভাবে ‘স্পাজা’ (Spaza) দোকান নামে পরিচিত, সেগুলোতে একদল ক্ষুব্ধ স্থানীয় বাসিন্দা অতর্কিত হামলা চালায় এবং মালামাল লুট করে নিয়ে যায়।

একই রাতে দেশের সার্বিক নিরাপত্তা জোরদার ও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে দক্ষিণ আফ্রিকার মোট নয়টি প্রদেশের মধ্যে পাঁচটিতেই অতিরিক্ত দাঙ্গা পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। পাশাপাশি জোহানেসবার্গ শহরের কেন্দ্রস্থল ও অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হিলব্রো এলাকায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরাসরি সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে। সেখানে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তুমুল গোলাগুলির ঘটনায় অন্তত দুইজন গুরুতর আহত হন।

অন্যদিকে, দেশটির অন্যতম প্রধান বন্দরনগরী ডারবানে এক বিদেশি নাগরিকের রহস্যজনক মৃত্যুর ঘটনায় বিশেষ তদন্ত শুরু করেছে পুলিশ। অভিযোগ উঠেছে, মঙ্গলবার বিক্ষোভ শুরুর আগের রাতে সম্ভাব্য বর্ণবাদী হামলা ও অগ্নিসংযোগের আশঙ্কায় প্রাণভয়ে তিনি একটি আবাসিক ভবনের অষ্টম তলা থেকে নিচে লাফ দেন। পরবর্তীতে গুরুতর আহত অবস্থায় হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

প্রকৃতপক্ষে, মঙ্গলবারের এই দেশব্যাপী অস্থিতিশীল পরিস্থিতির পেছনে ছিল অভিবাসীবিরোধী একটি কট্টরপন্থী স্থানীয় নাগরিক সংগঠনের আন্দোলনের ঘোষণা। আন্দোলনকারীরা বেশ কিছুদিন আগেই বৈধ কাগজপত্র ছাড়া দক্ষিণ আফ্রিকায় বসবাসকারী সব বিদেশি অভিবাসীদের দেশ ছেড়ে চলে যাওয়ার জন্য একটি সুনির্দিষ্ট সময়সীমা বা ডেডলাইন বেঁধে দিয়েছিল। সেই আলটিমেটামের সময়সীমা শেষ হওয়ার দিনই ক্ষোভে ফেটে পড়ে স্থানীয়রা এবং দেশজুড়ে এসব উগ্র বিক্ষোভের সূত্রপাত হয়।

এর আগে গত কয়েক মাস ধরেই দক্ষিণ আফ্রিকার বিভিন্ন শহরতলিতে স্থানীয় ও আফ্রিকান কৃষ্ণাঙ্গ বনাম অন্যান্য দেশের অভিবাসীদের মধ্যে তীব্র অর্থনৈতিক ও সামাজিক উত্তেজনা চলছিল। সেই সুযোগে বহু বিদেশি নাগরিককে নিজেদের দীর্ঘদিনের ভিটেমাটি ও ঘরবাড়ি ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য করা হয়। অনেকেরই লাইফটাইম পুঁজি, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও সম্পত্তিতে হামলা, ভাঙচুর এবং প্রকাশ্য দিবালোকে লুটপাটের ঘটনাও ঘটে। দক্ষিণ আফ্রিকার এই চরম উত্তপ্ত বর্ণবাদী পরিস্থিতি নিয়ে বৈশ্বিক রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক মহলে গভীর উদ্বেগ এবং তীব্র সমালোচনা তৈরি হয়েছে। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালসহ একাধিক আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন অবিলম্বে বিদেশি নাগরিকদের সার্বিক জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দক্ষিণ আফ্রিকা সরকারের প্রতি জোর আহ্বান জানিয়েছে।

মন্তব্য করুন