বাধা পেরিয়ে সংসদ ভবনের কাছে ককরোচ পার্টির সদস্যরা, উত্তপ্ত দিল্লি
নিজস্ব প্রতিবেদক: ভারতের রাজধানী দিল্লির বুক চিরে তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে যুব-নেতৃত্বাধীন রাজনৈতিক দল ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি)। দিল্লি পুলিশের কড়া নিরাপত্তা বলয়, মুহুর্মুহু লাঠিচার্জ এবং ঝাঁঝালো কাঁদানে গ্যাসের শেল নিক্ষেপের মতো সব ধরনের কঠোর বাধা অতিক্রম করে সোমবার (২০ জুলাই) দুপুরে লোকসভার (সংসদ) প্রধান ভবনের একেবারে কাছাকাছি পৌঁছে গেছেন দলটির হাজার হাজার ক্ষুব্ধ বিক্ষোভকারী।
ভারতীয় একাধিক শীর্ষস্থানীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, আন্দোলনকারীদের বিশাল মিছিলটি তীব্র গতিতে সংসদের দিকে এগিয়ে আসতে থাকলে চরম নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে তড়িঘড়ি করে সংসদের প্রধান প্রবেশদ্বার বা মূল ফটক সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়া হয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়, পূর্বনির্ধারিত সূচি অনুযায়ী আজ সোমবার থেকেই ভারতের লোকসভায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ‘বাদল অধিবেশন’ বা বর্ষাকালীন অধিবেশন শুরু হয়েছে। ফলে সংসদ ভবনের ভেতরে দেশটির প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার শীর্ষ স্তরের সদস্যবৃন্দসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সংসদ সদস্যরা সশরীরে উপস্থিত রয়েছেন।
সংসদের এমন একটি হাই-প্রোফাইল দিনে ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) এই ঘোষিত ‘সংসদ অভিযান’ কর্মসূচি নিয়ে আগে থেকেই সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে ছিল দিল্লি পুলিশ ও কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থাগুলো। সংসদ ভবনের দিকে যাওয়ার মূল রাস্তায় বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে দিল্লির ‘শ্রমশক্তি ভবন’-এর সামনে পুলিশ অত্যন্ত নির্মমভাবে লাঠিচার্জ শুরু করে। একই সাথে আন্দোলনকারীদের লক্ষ্য করে একের পর এক কাঁদানে গ্যাসের (টিয়ার শেল) শেল ছোড়া হয়। তবে পুলিশের এই সর্বাত্মক বলপ্রয়োগ ও বাধার পরেও বিক্ষোভকারীদের একটি বড় অংশ বুক চিতিয়ে ব্যারিকেড ভেঙে সংসদ ভবনের দিকে অবিরাম এগোতে থাকেন।
মিছিলের সম্মুখভাগ থেকে বেশ কয়েকজন শীর্ষস্থানীয় বিক্ষোভকারীকে পুলিশ জোরপূর্বক আটক করে এবং আগে থেকে প্রস্তুত রাখা বড় বাসে উঠিয়ে দ্রুত বিক্ষোভস্থল থেকে দূরে সরিয়ে নিয়ে যায়। পুলিশের এই অ্যাকশনের তীব্র নিন্দা জানিয়ে সিজেপি নেতারা অভিযোগ করেছেন, সম্পূর্ণ গণতান্ত্রিক ও শান্তিপূর্ণ একটি ছাত্র-যুব আন্দোলনে প্রশাসন অত্যন্ত দমনমূলক, স্বৈরাচারী ও হিংসাত্মক আচরণ করেছে।
আজ সোমবার ভারতের পার্লামেন্টের বর্ষাকালীন অধিবেশন শুরুর প্রথম প্রহরে এই ঐতিহাসিক ‘লং মার্চ’ বা দীর্ঘ পদযাত্রার উদ্দেশ্যে দিল্লির যন্তর মন্তর প্রাঙ্গণে সকাল থেকেই হাজার হাজার সাধারণ শিক্ষার্থী, অধিকারকর্মী ও যুবসমাজ একত্রিত হতে শুরু করেন। আন্দোলনকারীদের এই বিশাল পদযাত্রা যেন কোনোভাবেই সংসদের দিকে এগোতে না পারে, সে জন্য যন্তর মন্তরসহ আশপাশের পুরো রাজপথ লোহার ও কংক্রিটের ব্যারিকেড দিয়ে কার্যত অবরুদ্ধ করে ফেলে দিল্লি পুলিশ। নিরাপত্তার চাদরে ঢেকে দিতে মোতায়েন করা হয় শত শত রায়ট পুলিশ ও সশস্ত্র যৌথ বাহিনী।
সকালে সেন্ট্রাল দিল্লির মূল বিক্ষোভস্থল থেকে হাজার হাজার তরুণের এই মিছিলটি যখন স্লোগানে স্লোগানে পার্লামেন্টের দিকে অগ্রসর হতে চায়, তখনই পুলিশ প্রথম ব্যারিকেড দিয়ে তাদের পথ আগলে দাঁড়ায়। একপর্যায়ে ক্ষুব্ধ ছাত্ররা বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে বসানো বিশাল লোহার নিরাপত্তা ব্যারিকেডগুলো টেনেহিঁচড়ে ভেঙে ফেলার চেষ্টা করলে পুলিশের সঙ্গে আন্দোলনকারীদের তীব্র ধস্তাধস্তি ও হাতাহাতি শুরু হয়। এই রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে বেশ কয়েকজন আন্দোলনকারী শিক্ষার্থী এবং পুলিশের কয়েকজন সদস্য গুরুতর আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে।
ভারতীয় গণমাধ্যমগুলোর মাঠপর্যায়ের তথ্যমতে, প্রশ্নপত্র ফাঁস ও শিক্ষা ব্যবস্থার দুর্নীতির বিরুদ্ধে আয়োজিত সোমবারের এই মেগা কর্মসূচিতে প্রায় ২০ হাজারেরও বেশি মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নিয়েছিলেন, যাদের সিংহভাগই দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ও বেকার যুবক।
উদ্ভূত এই অস্থিতিশীল পরিস্থিতি নিয়ে দিল্লি পুলিশের পক্ষ থেকে জারি করা একটি বিশেষ আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, পুরো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি অত্যন্ত পেশাদারত্বের সঙ্গে এবং ধৈর্যের সাথে সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। একই সাথে দিল্লির সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে কোনো ধরনের বিভ্রান্তিকর গুজব বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের উসকানিতে কান না দেওয়ার জন্য সাধারণ নাগরিকদের বিশেষভাবে অনুরোধ জানিয়েছে প্রশাসন।
উল্লেখ্য, ভারতের মহামান্য প্রধান বিচারপতির একটি তাৎপর্যপূর্ণ আইনি মন্তব্যের সরাসরি প্রতিক্রিয়া ও অভিনব প্রতিবাদ হিসেবে গত মে মাসে মাত্র ৩০ বছর বয়সী তরুণ অভিজিৎ দীপকে এই ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি) গঠন করেছিলেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দলটির ব্যঙ্গাত্মক ও অধিকারসচেতন প্রচারণার ফলে অতি দ্রুত এটি দেশের তরুণ প্রজন্মের মাঝে ব্যাপক ও অভাবনীয় জনপ্রিয়তা লাভ করে। পরবর্তীতে ভারতের মূলধারার বিরোধী রাজনৈতিক দল, বুদ্ধিজীবী, প্রখ্যাত শিল্পী ও সুশীল সমাজের একটি বড় অংশ এই যুব আন্দোলনের প্রতি তাদের প্রকাশ্য নৈতিক সমর্থন ঘোষণা করে।
এর আগে গত শনিবার রাতে পুলিশ, যন্তর মন্তরে টানা ২১ দিন ধরে অনশনরত ৫৯ বছর বয়সী প্রখ্যাত জলবায়ু ও শিক্ষা আন্দোলনকর্মী সোনম ওয়াংচুককে ‘অসুস্থতার কাল্পনিক অজুহাত’ দেখিয়ে অনশনস্থল থেকে জোরপূর্বক তুলে নিয়ে হাসপাতালে বন্দি করায় সাধারণ শিক্ষার্থীদের মনে তীব্র ক্ষোভের আগুন জ্বলছিল। সোনম ওয়াংচুককে অন্যায়ভাবে আটকের সেই পুঞ্জীভূত ক্ষোভই আজ সোমবারের ‘সংসদ অভিযান’ কর্মসূচিতে এক অভূতপূর্ব ও গণবিস্ফোরক বাড়তি উত্তেজনার পারদ যোগ করেছে, যা সামলাতে রীতিমতো হিমশিম খাচ্ছে ভারতের কেন্দ্রীয় প্রশাসন।
|