খালিদ সাইফুল্লাহ সোহেল ।।
আজ ১২ মার্চ, ২০২৬। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের পটে এক নতুন অধ্যায় রচনার দিন। আজকের সূর্যোদয় কেবল একটি নতুন তারিখের সূচনা নয়, বরং একটি নতুন আশার প্রদীপ হয়ে আমাদের সামনে হাজির হয়েছে। আজ বেলা ১১টায় শেরে বাংলা নগরের সেই চিরচেনা সংসদ ভবনে বসতে যাচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন। এক দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর যখন জনপ্রতিনিধিরা সংসদ কক্ষে একত্রিত হচ্ছেন, তখন সমগ্র জাতির দৃষ্টি নিবদ্ধ সেই পবিত্র আঙিনায়। কারণ, সংসদই হলো গণতন্ত্রের হৃৎপিণ্ড; আর এখান থেকেই নির্ধারিত হবে আগামী দিনের আধুনিক ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশের ভাগ্যলিপি।
একজন সাবেক ছাত্রনেতা এবং বর্তমান সংবাদকর্মী হিসেবে আমি সবসময় বিশ্বাস করি, দেশ পরিচালনার প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত ও সংস্কারের সূতিকাগার হওয়া উচিত জাতীয় সংসদ। দীর্ঘ সময়ের অচলাবস্থা কাটিয়ে মাননীয় সংসদ নেতা তারেক রহমানের নেতৃত্বে এই সংসদ হয়ে উঠুক সকল গণতান্ত্রিক চর্চার কেন্দ্রবিন্দু। সরকারের ঘোষিত রাষ্ট্র সংস্কারের '৩১ দফা' বাস্তবায়নের প্রথম ধাপ হিসেবে এই অধিবেশন অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের ভাষণ এবং স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচনের মধ্য দিয়ে যে নতুন যাত্রার শুভ সূচনা হচ্ছে, তা যেন কেবল আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ না থাকে। বরং জনগণের প্রতিনিধিরা যেন সাধারণ মানুষের প্রতিটি দুঃখ-দুর্দশা ও উন্নয়নের দাবি এই পবিত্র সংসদে জোরালোভাবে উত্থাপন করেন।
সংসদ অধিবেশন শুরুর ঠিক প্রাক্কালে দেশব্যাপী 'ফ্যামিলি কার্ড' বিতরণের যে কর্মসূচি শুরু হয়েছে, তা মূলত একটি মানবিক ও কল্যাণমুখী রাষ্ট্র গড়ার অঙ্গীকার। গত ১০ মার্চ থেকে প্রাথমিকভাবে ১৪টি এলাকায় এই কার্যক্রমের উদ্বোধন করা হয়েছে। এই ফ্যামিলি কার্ড কেবল একটি প্লাস্টিক কার্ড নয়; এটি অভাবগ্রস্ত মানুষের জন্য একটি নির্ভরতার প্রতীক। মাসিক ২,৫০০ টাকা নগদ সহায়তা বা সমমূল্যের পণ্য সহায়তার এই উদ্যোগে সবচেয়ে বড় বিশেষত্ব হলো—কার্ডটি প্রদান করা হচ্ছে পরিবারের নারী সদস্য বা মায়ের নামে। এটি তৃণমূল পর্যায়ে নারীর ক্ষমতায়ন ও আর্থিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে একটি মাইলফলক হয়ে থাকবে। এর মাধ্যমে যেমন মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য বন্ধ হবে, তেমনি সরাসরি সুবিধাপ্রাপ্তি নিশ্চিত হওয়ার ফলে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রার মান উন্নত হবে।
সরকার কেবল ঘোষণা নয়, বরং দ্রুততম সময়ে কাজের বাস্তবায়নের দিকে যে মনোযোগ দিচ্ছে, তা কৃষিখাতে স্পষ্ট। প্রান্তিক কৃষকদের জন্য 'কৃষক কার্ড' চালু এবং ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ মওকুফ করার সিদ্ধান্তটি অত্যন্ত সময়োপযোগী। বিশেষ করে আগামী ১৬ মার্চ থেকে দেশব্যাপী যে খাল খনন কর্মসূচি শুরু হতে যাচ্ছে, তা গ্রামীণ অর্থনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আনবে। জলাবদ্ধতা নিরসন এবং শুষ্ক মৌসুমে সেচের পানির সুব্যবস্থা নিশ্চিত হলে আমাদের কৃষি উৎপাদন বহুগুণ বেড়ে যাবে। প্রতিটি গ্রামকে স্বনির্ভর ইউনিট হিসেবে গড়ে তোলার যে পরিকল্পনা সরকারের রয়েছে, তা বাস্তবায়িত হলে শহরমুখী হওয়ার প্রবণতা যেমন কমবে, তেমনি গ্রামেই গড়ে উঠবে আধুনিক সুযোগ-সুবিধা।
দেশের বিশাল তরুণ জনগোষ্ঠীকে দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তর করা বর্তমান সময়ের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। নতুন সংসদের কাছে আমাদের প্রত্যাশা থাকবে, তরুণদের জন্য আইটি ট্রেনিং, ফ্রিল্যান্সিং সুযোগ এবং নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ শর্তে ঋণ প্রাপ্তি নিশ্চিত করা। প্রযুক্তিগত উৎকর্ষতাকে কাজে লাগিয়ে আমরা যদি আমাদের তরুণ সমাজকে বৈশ্বিক বাজারের উপযোগী করে তুলতে পারি, তবে বেকারত্ব নামক অভিশাপ থেকে জাতি মুক্তি পাবে।
একটি গণতান্ত্রিক ও সমৃদ্ধ রাষ্ট্র গঠনের স্বপ্ন তখনই সার্থক হয়, যখন সরকারের নীতিগুলো সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে যায়। নতুন সংসদের প্রথম অধিবেশনে দাঁড়িয়ে আমরা সেই সুশাসনের স্বপ্ন দেখি। আমরা চাই, প্রতিটি মা হবেন ক্ষমতাবান, প্রতিটি কৃষক পাবেন তার ঘামের সঠিক মূল্য এবং প্রতিটি তরুণ হবে আগামীর স্বনির্ভর বাংলাদেশের কারিগর। সংসদ থেকে শুরু করে গ্রাম পর্যন্ত উন্নয়নের এই মহাযজ্ঞে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বজায় থাকলে, ইনশাআল্লাহ, একটি সাম্য ও ইনসাফভিত্তিক আধুনিক বাংলাদেশ গড়া কেবল সময়ের ব্যাপার মাত্র।
লেখক: খালিদ সাইফুল্লাহ সোহেল
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক দৈনিক সকালবেলা ও সাবেক ভিপি