২ হাজার কোটি টাকার হাতিরঝিল এখন দুর্গন্ধময় জলাধার
অনলাইন ডেস্ক: রাজধানী ঢাকার নাগরিক জীবনে একসময় যে হাতিরঝিল ছিল স্বস্তি, নির্মল পরিবেশ ও নৈসর্গিক সৌন্দর্যের এক প্রোজ্জ্বল প্রতীক, প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত সেই স্বপ্নের প্রকল্প এক দশকের ব্যবধানে এখন তীব্র দুর্গন্ধময় ও কালচে দূষিত জলাধারে পরিণত হয়েছে।
আজ মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর ২০২৬) সরজমিনে হাতিরঝিল এলাকা ঘুরে এবং সংগৃহীত প্রতিবেদনে দেখা যায়, সোনারগাঁও, মগবাজার, রামপুরা ও মহানগর অংশসহ পুরো লেকের পানি কালচে ও ময়লাযুক্ত হয়ে পড়েছে। হাতিরঝিলের পাড় ছাড়িয়ে এই বিষাক্ত দুর্গন্ধ এখন পার্শ্ববর্তী আবাসিক এলাকাগুলোতে ঢুকে পড়েছে।
মহানগর প্রজেক্টের একাধিক বাসিন্দা জানান, আগে যেখানে নিয়মিত সকালে বা বিকেলে লেকের পাড়ে হাঁটাহাঁটি করা যেত, এখন তীব্র দুর্গন্ধের কারণে সেখানে অবস্থান করাই দুঃসাধ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেক স্থানে পথচারীদের নাক-মুখ চেপে চলাচল করতে হচ্ছে। বাসাবাড়িতে তীব্র দুর্গন্ধ ঢুকে পড়ায় অনেক ভাড়াটিয়া ইতিমধ্যেই বাসা বদল করতে বাধ্য হয়েছেন।
প্রকল্পটি ২০১৩ সালে চালুর পর থেকে ২০২১ সালের জুন পর্যন্ত বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর স্পেশাল ওয়ার্কস অর্গানাইজেশন (এসডব্লিউও) অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে এর রক্ষণাবেক্ষণ করে। কিন্তু ২০২১ সালের জুলাইয়ে রাজউক স্থায়ী পরিচালন ও তদারকির দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই হাতিরঝিলের সুনির্দিষ্ট কেমিক্যাল প্রয়োগ ও অক্সিজেন সরবরাহ ব্যবস্থা বন্ধ হয়ে যায়।
হাতিরঝিলের মূল নকশাকার প্রতিষ্ঠান ‘ভিত্তি স্থপতি’-এর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা স্থপতি ইকবাল হাবিব ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, "নিয়মিত আধুনিক রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে হাতিরঝিল এখন ভয়াবহ 'ইউট্রোফিকেশন' পর্যায়ে পৌঁছেছে। লেকের পানি মজে গিয়ে জলাধারটি নিজেই নিজের প্রাণ হারাচ্ছে, যার জন্য রাজউক শতভাগ দায়ী।"
তিনি জানান, দেড় বছর আগে বিনা পারিশ্রমিকে বিশেষজ্ঞদের তৈরি করা একগুচ্ছ সুনির্দিষ্ট সুপারিশ রাজউকে জমা দেওয়া হলেও তা বাস্তবায়ন না করে ফাইলবন্দি করে রাখা হয়েছে। সুপারিশে লেকের দুই পাশে থাকা স্পেশাল সুয়ারেজ ডাইভারশন (এসএসডি) পাইপের মাধ্যমে সমস্ত বর্জ্য দাশেরকান্দি পয়ঃশোধনাগারে পাঠানোর জরুরি আহ্বান জানানো হয়েছিল।
একইভাবে স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটির পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. আহমদ কামরুজ্জমান সতর্ক করে বলেছেন, বছরের পর বছর তলদেশে পয়োবর্জ্য পচে মিথেনের মতো মানবস্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকারক বিষাক্ত গ্যাস নির্গত হচ্ছে।
হাতিরঝিলের এই মারাত্মক অবনতির জন্য রাজউক ও ঢাকা ওয়াসা পরস্পরকে দায়ী করছে। রাজউকের প্রধান প্রকৌশলী মো. মুজাফফর উদ্দিনের মতে, ঢাকা ওয়াসার অপর্যাপ্ত পয়োনিষ্কাশন লাইনের কারণে বৃষ্টির সময় ধারণক্ষমতা না থাকায় পান্থপথ, ধানমন্ডিসহ বিভিন্ন এলাকার সরাসরি ময়লা বর্জ্য হাতিরঝিলে ছেড়ে দেওয়া হয়। এ ছাড়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণের কারণে ডিফিউজারগুলো বন্ধ থাকা এবং পানির অক্সিজেন সঞ্চলন ব্যাহত হওয়াকেও অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেন তিনি।
অন্যদিকে, ঢাকা ওয়াসার পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, হাতিরঝিলে তাদের কোনো সরাসরি পয়োনিষ্কাশন লাইন নেই। ওয়াসার মতে, রাজউকের আওতাধীন এসএসডি লাইনে বড় ধরনের কোনো লিকেজ থাকার কারণেই পচা বর্জ্য পানির সঙ্গে মিশে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। দুই সংস্থার এমন দীর্ঘদিনের পাল্টাপাল্টি অবস্থানের জাঁতাকলে পড়ে ঐতিহ্যবাহী এই লেকটির পরিবেশ ও স্বাভাবিক বাস্তুতন্ত্র দিন দিন ধ্বংসের মুখে পড়ছে।
সকালবেলা / নুসরাত