জ্বালানি মহাপরিকল্পনায় জাতীয় স্বার্থ ও জনঅংশগ্রহণের দাবি বরিশালে
সাঈদ পান্থ, বরিশাল : বাংলাদেশের জাতীয় জ্বালানি মহাপরিকল্পনা প্রণয়নে বিদেশি পরামর্শ বা সংস্থার স্বার্থ বাদ দিয়ে সর্বাগ্রে জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া এবং যেকোনো পরিকল্পনা প্রক্রিয়ায় দেশের সাধারণ জনগণের কার্যকর অংশগ্রহণ সুনিশ্চিত করার জোরালো দাবি জানিয়েছেন বরিশালের বিশিষ্ট নাগরিক সমাজ, গবেষক ও পরিবেশকর্মীরা।
আজ মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর ২০২৬) সকালে বরিশাল প্রেস ক্লাবের সামনের প্রধান সড়কে আয়োজিত এক বিশাল জনসংহতি ও সচেতনতামূলক সমাবেশ থেকে এই সময়োপযোগী দাবি তুলে ধরা হয়। আন্তর্জাতিক পরিবেশ সংগঠন প্রান্তজন ট্রাস্ট, ফোরাম অন ইকোলজি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (বরিশাল) এবং বাংলাদেশ ওয়ার্কিং গ্রুপ অন ইকোলজি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (বিডব্লিউজিইডি) যৌথ সমন্বয়ে এই রাজপথ কর্মসূচির আয়োজন করা হয়। সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ অধ্যক্ষ (অব.) মো. আমিনুল ইসলাম খোকন।
সমাবেশে উপস্থিত বক্তারা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, একটি দেশের সমগ্র জ্বালানি মহাপরিকল্পনা তার অর্থনীতি, প্রাকৃতির পরিবেশ, সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা এবং দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তার সাথে সরাসরি অঙ্গাঙ্গিভাবে যুক্ত। তাই এই ধরনের জাতীয় স্পর্শকাতর ও গুরুত্বপূর্ণ নীতি প্রণয়নে কোনো নির্দিষ্ট বিদেশি ভূরাজনৈতিক স্বার্থ বা উন্নয়ন সংস্থার প্রেসক্রিপশনের ওপর এককভাবে নির্ভর না করে বাংলাদেশের নিজস্ব বাস্তবতা, দেশীয় আর্থিক সক্ষমতা ও জনগণের মূল প্রয়োজনকে অগ্রাধিকার দেওয়া একান্ত আবশ্যক।
ফোরাম অন ইকোলজি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট, বরিশালের সদস্য সচিব অ্যাডভোকেট সুভাষ দাস তাঁর বক্তব্যে বলেন, “দেশের জ্বালানি খাতের ভবিষ্যৎ পথরেখা নির্ধারণে জাতীয় স্বার্থকে সবার উপরে ও সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। আন্তর্জাতিক ও দেশীয় যেকোনো রূপরেখা তৈরির ক্ষেত্রে আমাদের অর্থনৈতিক সক্ষমতা এবং সংবেদনশীল পরিবেশগত বাস্তবতাকে অবশ্যই নিবিড়ভাবে বিবেচনায় নিতে হবে।”
সংগঠনটির অন্যতম সদস্য শুভঙ্কর চক্রবর্তী বলেন, “জাতীয় জ্বালানি মহাপরিকল্পনা কোনো বিশেষ করপোরেট গোষ্ঠী বা বিদেশি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের বাণিজ্যিক স্বার্থে প্রণয়ন করা সম্পূর্ণ অনুচিত। দেশের সচেতন নাগরিক সমাজ, জ্বালানি বিশেষজ্ঞ, গবেষক, মাঠপর্যায়ের পরিবেশকর্মী ও স্থানীয় সাধারণ জনগোষ্ঠীর সরাসরি মতামত গ্রহণ করেই নীতিমালা চূড়ান্ত করতে হবে। একই সঙ্গে এই মহাপরিকল্পনার সম্পূর্ণ খসড়া সাধারণ মানুষের পর্যালোচনার জন্য উন্মুক্ত করে গণশুনানি ও উন্মুক্ত আলোচনার সুযোগ তৈরি করতে হবে।”
সমাবেশে বক্তারা আরও সতর্ক করে বলেন, আন্তর্জাতিক বাজার থেকে চড়া মূল্যে আমদানিনির্ভর বিপজ্জনক জীবাশ্ম জ্বালানির (যেমন এলএনজি বা কয়লা) ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা দেশের ভবিষ্যৎ জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য বিশাল ঝুঁকি তৈরি করবে। এই সংকট নিরসনে দ্রুততম সময়ে সৌরবিদ্যুৎসহ বিভিন্ন নবায়নযোগ্য টেকসই জ্বালানির অপার সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হবে। পাশাপাশি বিদ্যুৎ উৎপাদন ও ব্যবহারের দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক ব্যয়, পরিবেশগত ক্ষতি এবং সাধারণ ভোক্তাদের ওপর পরোক্ষ প্রভাব নিরূপণ করেই চূড়ান্ত পরিকল্পনা গ্রহণ করা উচিত।
সমাবেশ থেকে সরকারের নীতিনির্ধারকদের প্রতি জ্বালানি মহাপরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের প্রতি পদে সর্বাত্মক স্বচ্ছতা ও প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি সুনিশ্চিত করার জোরালো আহ্বান জানানো হয়।
সভাপতির বক্তব্যে অধ্যক্ষ (অব.) মো. আমিনুল ইসলাম খোকন সুনির্দিষ্টভাবে বলেন, “বাংলাদেশের আগামী দিনের জ্বালানি ভবিষ্যৎ এবং নীতি নির্ধারণ করার সম্পূর্ণ সার্বভৌম অধিকার ও দায়িত্ব এ দেশের কোটি কোটি মানুষের। তাই সাধারণ জনগণের সুচিন্তিত মতামতকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে কোনো চাপিয়ে দেওয়া পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা উচিত হবে না। একটি গণমুখী, স্বচ্ছ ও সর্বজনীন অংশগ্রহণের মাধ্যমেই কেবল দেশের টেকসই জ্বালানি নিরাপত্তা সুনিশ্চিত হতে পারে।”
জনসংহতি সমাবেশে অংশগ্রহণকারীরা ‘জ্বালানি মহাপরিকল্পনা, জাপান না, বিদেশি না—জাতীয় পরিকল্পনায় চাই জাতির অংশগ্রহণ’ সমবেত কণ্ঠে এই প্রতিবাদী স্লোগান দেন। এ সময় তাঁরা দেশের সার্বভৌমত্ব, অর্থনৈতিক নিরাপত্তা ও নবায়নযোগ্য শক্তির টেকসই সম্প্রসারণে সরকার ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।