২টি অ্যান্টিবায়োটিক ছাড়া কোনো অ্যান্টিবায়োটিক কাজ করছে না বাংলাদেশের শিশুদের শরীরে

প্রকাশ: সোমবার, ১৫ জুন ২০২৬, ০৪:১৮ অপরাহ্ণ
২টি অ্যান্টিবায়োটিক ছাড়া কোনো অ্যান্টিবায়োটিক কাজ করছে না বাংলাদেশের শিশুদের শরীরে
প্রতীকী ছবি

নিজস্ব প্রতিবেদক: দেশের বিভিন্ন জীবাণুর অ্যান্টিবায়োটিক-প্রতিরোধী (রেজিস্ট্যান্স) হয়ে ওঠা নিয়ে একের পর এক খবরের মধ্যে চিকিৎসকদের চরম উদ্বিগ্ন করেছে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের একটি সাম্প্রতিক গবেষণা। এতে দেখা গেছে, হাসপাতালটির শিশু নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (পিআইসিইউ) চিকিৎসাধীন শিশুদের শরীরে প্রথম সারির প্রায় ৯৬ শতাংশ অ্যান্টিবায়োটিকই সম্পূর্ণ অকার্যকর হয়ে পড়েছে। পরিস্থিতি এতটাই শোচনীয় যে, শিশুদের বাঁচাতে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকদের হাতে ‘শেষ অস্ত্র’ হিসেবে অবশিষ্ট আছে মাত্র দুটি অ্যান্টিবায়োটিক।

চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত চার মাস ধরে পিআইসিইউতে চিকিৎসাধীন ৪৯টি শিশুর শরীর থেকে জীবাণু (৩০টি গ্রাম-নেগেটিভ ও ১৯টি গ্রাম-পজিটিভ) সংগ্রহ করে এই গবেষণা পরিচালনা করা হয়। গবেষণাটি চিকিৎসা সাময়িকী ‘জার্নাল অব টিচার্স অ্যাসোসিয়েশনে’ প্রকাশিত হয়েছে। হাসপাতালের আইসিইউ বিভাগের ইনচার্জ ডা. আবু হেনা মোস্তফা কামালের নেতৃত্বে এই গবেষণা দলে সহগবেষক হিসেবে ছিলেন ডা. ওয়াহিদা খাতুন, ডা. নাসরিন সুলতানা, ডা. সুলতানা আক্তার, ডা. শামীমা নাসরিন ও ডা. সিরাজুম মুনির।

গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, পিআইসিইউতে সবচেয়ে বেশি সংক্রমণ ঘটাচ্ছে ‘অ্যাসিনেটোব্যাক্টার বাউমানি কমপ্লেক্স’ নামের একটি মারাত্মক জীবাণু। সবশেষ এপ্রিল মাসে সংগৃহীত প্রতিটি গ্রাম-নেগেটিভ জীবাণুই প্রথম সারির ছয়টি প্রধান অ্যান্টিবায়োটিকের (ইমিপেনেম, মেরোপেনেম, পাইপেরাসিলিন-টাজোব্যাক্টাম, সিপ্রোফ্লক্সাসিন, জেন্টামাইসিন ও অ্যামিকাসিন) বিরুদ্ধে শতভাগ প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে। এ অবস্থায় সেখানকার চিকিৎসকদের হাতে বাকি রয়েছে মাত্র দুটি বিশেষ অস্ত্র—টাইজেসাইক্লিন ও কলিস্টিন। তবে গবেষকদের আশঙ্কা, কলিস্টিনের ক্ষেত্রেও ভবিষ্যতে সম্পূর্ণ প্রতিরোধের ঝুঁকি রয়েছে।

উদ্বেগের বিষয় হলো, গ্রাম-পজিটিভ জীবাণুর ক্ষেত্রে ‘অ্যারিথ্রোমাইসিন’ অ্যান্টিবায়োটিকের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ এখন ১০০ শতাংশ। অর্থাৎ, এই শ্রেণির সবকটি জীবাণুর ওপরই অ্যারিথ্রোমাইসিন সম্পূর্ণ অকার্যকর। চিকিৎসকেরা জানান, আগে থেকে মাত্রাতিরিক্ত বা অকারণ অ্যান্টিবায়োটিক গ্রহণ করা শিশুদের শরীরে একাধিক ওষুধ-প্রতিরোধী বা এমডিআর (MDR) জীবাণু সংক্রমণের ঝুঁকি সাধারণ শিশুদের চেয়ে প্রায় সাত গুণ বেশি। এই এমডিআর জীবাণুতে আক্রান্ত শিশুদের সুস্থ হতে সাধারণ শিশুদের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি সময় (গড়ে ১৪ দিন) লাগছে।

গবেষক দলের প্রধান ডা. আবু হেনা মোস্তফা কামাল জানান, পিআইসিইউতে থাকা শিশুদের শরীরে একের পর এক অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োগেও কোনো সুফল না পেয়ে তাঁরা এই অনুসন্ধান চালান। তিনি জরুরি ভিত্তিতে অকারণে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার বন্ধ করা, হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে কঠোর স্বাস্থ্যবিধি ও হাত ধোয়ার নিয়ম নিশ্চিত করার তাগিদ দেন। একই সঙ্গে সারা দেশের সামগ্রিক চিত্র জানতে এবং এই মহাসংকট থেকে উত্তরণে একটি বহুকেন্দ্রিক জাতীয় তদারকি ব্যবস্থা গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট গবেষকেরা।

মন্তব্য করুন