মুখে ঘা হওয়ার কারণ, লক্ষণ ও কখন ক্যান্সারের ঝুঁকি থাকে
আজ শুক্রবার (১২ জুন) বিকেলে অনলাইন সংস্করণে প্রকাশিত ‘ওরাল মেডিসিন, ক্লিনিক্যাল প্যাথলজি ও হেলথ কেয়ার গাইডলাইন খতিয়ান’ এবং ‘ডেন্টাল কেয়ার, Onkology স্ক্রিনিং ও গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি উইং’-এর বিশেষ যৌথ বুলেটিংয়ে মুখে ঘা হওয়ার কারণ ও এর প্রতিকারের পুঙ্খানুপুঙ্খ খতিয়ান বিস্তারিত তুলে ধরা হলো।
মেডিকেল ডায়াগনোসিস অনুযায়ী, মুখের ভেতরের এই যন্ত্রণাদায়ক ক্ষতের নেপথ্যে বেশ কিছু সাধারণ এবং জটিল কন্ডিশন কাজ করে
আঘাতজনিত কারণ (Trauma): দাঁত ব্রাশ করার সময় অসাবধানতাবশত শক্ত ব্রাশের ঘষা লাগা, খাবার চিবানোর সময় গাল বা জিভে দাঁতের কামড় লাগা, অতিরিক্ত গরম চা-কফি বা খাবারে মুখ পুড়ে যাওয়া কিংবা আঁকাবাঁকা দাঁতের ব্রেস ও কৃত্রিম দাঁতের ধারালো ঘর্ষণ থেকে এই ক্ষত তৈরি হতে পারে। পুষ্টির তীব্র অভাব: শরীরে বিশেষ করে ভিটামিন বি-কমপ্লেক্স (যেমন: ভিটামিন বি১২), ফোলেট বা ভিটামিন বি৯ এবং আয়রনের দীর্ঘস্থায়ী ঘাটতি থাকলে মুখে ঘন ঘন আলসার দেখা দেয়। জীবাণুর সংক্রমণ (Infection): হার্পিস সিমপ্লেক্স ভাইরাসের আক্রমণে ঠোঁটের কোণে বা মুখে হওয়া ‘কোল্ড সোর’, ছত্রাকজনিত বা ফাঙ্গাল ইনফেকশনের কারণে সৃষ্ট ‘ওরাল থ্রাশ’ কিংবা ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়ার আক্রমণে মুখে ঘা হতে পারে। লাইফস্টাইল ও মানসিক চাপ: অতিরিক্ত মানসিক দুশ্চিন্তা, অনিয়মিত ঘুম বা অনিদ্রা এবং জর্দা, গুল, ধূমপান বা تামাক সেবনের ক্ষতিকর অভ্যাস মুখের কোষগুলোকে ক্ষতিগ্রস্ত করে ঘায়ের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সাধারণ মাউথ আলসার সাধারণত ৭ থেকে ১০ দিনের মধ্যে কোনো ওষুধ ছাড়াই ভালো হয়ে যায়। তবে এটি যদি দীর্ঘস্থায়ী রূপ নেয়, তবে তা নিচের মারাত্মক রোগগুলোর আগাম লক্ষণ হতে পারে
মুখের ক্যান্সার (Oral Cancer): যদি গালের ভেতরে বা জিভের নিচে কোনো সাদা বা লালচে ছোপ (Leukoplakia/Erythroplakia) দেখা দেয় এবং দীর্ঘ সময় পার হলেও সেই ক্ষত বা চাকা না সারে, তবে তা প্রাথমিক স্টেজের মুখের ক্যান্সারের অন্যতম প্রধান লক্ষণ। অটোইমিউন রোগ: শরীরের নিজস্ব রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা যখন সুস্থ কোষকে আক্রমণ করে, তখন তাকে অটোইমিউন ডিজিজ বলে। ‘পেমফিগাস ভালগারিস’ কিংবা ‘ওরাল লাইকেন প্ল্যানাস’-এর মতো জটিল রোগে মুখের ভেতর জালের মতো সাদা দাগ বা অত্যন্ত যন্ত্রণাদায়ক ব্লিস্টার তৈরি হয়। পরিপাকতন্ত্রের সমস্যা: চিকিৎসকেরা জানান, অন্ত্র বা পাকস্থলীর ভেতরের ইনফ্লামেশন যেমন ‘ক্রোনস ডিজিজ’ (Crohn's Disease) বা ‘সিলিয়াক ডিজিজ’-এর মতো পেটের ভেতরের জটিল রোগের কারণেও রোগীদের বারবার মুখে আলসার হয়ে থাকে।
সাধারণ ক্ষত ভেবে অবহেলা না করে নিচের কন্ডিশনগুলো দেখা দিলে রোগীকে অনতিবিলম্বে একজন রেজিস্টার্ড ডেন্টিস্ট বা ওরাল ম্যাক্সিলোফেসিয়াল সার্জনের শরণাপন্ন হতে হবে
যদি ঘায়ের আকার আধা ইঞ্চির চেয়ে বেশি বড় এবং অত্যন্ত গভীর হয়। যদি যথাযথ চিকিৎসার পরও ঘা একটানা ২ সপ্তাহের বেশি স্থায়ী হয় এবং কোনোভাবেই না সারে মুখের ঘায়ের সাথে যদি রোগীর তীব্র জ্বর, ডায়রিয়া কিংবা শরীরের বিভিন্ন জয়েন্টে বা গিঁটে ব্যথা থাকে। যদি আঙুল দিয়ে স্পর্শ করলে গালের ভেতরে কোনো পিণ্ড, টিউমার বা শক্ত চাকা অনুভব করা যায়।
মুখের ঘা থেকে দ্রুত মুক্তি পেতে এবং এটি স্থায়ীভাবে প্রতিরোধ করতে কিছু প্রাত্যহিক নিয়ম মেনে চলা জরুরি। প্রথমত, খাবারের তালিকায় অতিরিক্ত ঝাল, তৈলাক্ত, নোনতা বা সাইট্রিক অ্যাসিডযুক্ত খাবার (যেমন লেবু, তেঁতুল) সাময়িকভাবে সম্পূর্ণ পরিহার করতে হবে। শরীরকে হাইড্রেট রাখতে প্রচুর পরিমাণে বিশুদ্ধ পানি পান করা এবং শাকসবজি সমৃদ্ধ সুষম ডায়েট মেনে চলা প্রয়োজন। দ্বিতীয়ত, দাঁত পরিষ্কারের জন্য সবসময় নরম মেছওয়াক বা সফট-ব্রিস্টলযুক্ত ব্রাশ ব্যবহার করতে হবে এবং নিয়মিত মাউথওয়াশ ব্যবহার করতে হবে। ঘরোয়া টোটকা হিসেবে ব্যথানাশক কন্ডিশন তৈরি করতে হালকা গরম পানিতে লবণ মিশিয়ে দিনে ৩-৪ বার কুলকুচি করা যেতে পারে কিংবা ক্ষতের স্থানে বেকিং সোডার পেস্ট লাগানো যায়। তবে ঘন ঘন এই সমস্যা হলে নিজে নিজে ওষুধ না খেয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নির্দিষ্ট ডোজের ভিটামিন বি-কমপ্লেক্স বা জিঙ্ক সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ করাই বুদ্ধিমানের কাজ।
জান্নাত সকালবেলা
|