ন্যায়বিচারে দ্বৈত নীতি ও একজন মেধাবী আলেমের কারাবাস

ন্যায়বিচারে দ্বৈত নীতি ও একজন মেধাবী আলেমের কারাবাস

আবু হামদান

সম্প্রতি কারামুক্ত হয়েছেন জামায়াত কর্মী সাওদা সুমি; নিঃসন্দেহে এটি একটি স্বস্তির খবর। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার প্রশ্নে এ ধরনের মুক্তি আমাদের আশাবাদী করে। কিন্তু নাগরিক হিসেবে আমাদের সেই স্বস্তি ম্লান হয়ে যায় যখন দেখি, প্রায় একই ধরনের অভিযোগে গ্রেপ্তার হওয়া অন্য এক নাগরিকের ভাগ্যাকাশে এখনো অন্ধকারের ঘনঘটা। তিনি এদেশের অন্যতম প্রতিভাবান আলেম, গবেষক ও লেখক মাওলানা আইনুল হক কাসেমি।

মাওলানা কাসেমির কারাজীবন চার মাস পেরিয়ে গেলেও এখনো মুক্তির কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। আইনি লড়াই চললেও অজানা কারণে বারবার তাঁর জামিন শুনানি নাকচ করে দেওয়া হচ্ছে। এই পরিস্থিতি আমাদের বিচারব্যবস্থা এবং রাষ্ট্রের ইনসাফ কায়েমের সদিচ্ছাকে বড় ধরনের প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। নাগরিক হিসেবে আমরা আজ বিচলিত—তবে কি একই রাষ্ট্রে ন্যায়বিচারের মানদণ্ড ব্যক্তিভেদে ভিন্ন? কেন একপক্ষের জন্য আইনের দ্বার অবারিত, আর অন্যপক্ষের জন্য তা দুর্ভেদ্য প্রাচীর হয়ে দাঁড়ায়? এই চরম বৈষম্য একটি সুস্থ ও ইনসাফভিত্তিক সমাজ বিনির্মাণের পথে বড় অন্তরায়।

সবচেয়ে বিস্ময়কর ও পীড়াদায়ক বিষয় হলো সুশীল সমাজ ও অ্যাক্টিভিস্টদের ভূমিকা। সাওদা সুমির মুক্তির দাবিতে যারা সোচ্চার ছিলেন, তাদের এক বিশাল অংশ মাওলানা আইনুল হক কাসেমির বেলায় অদ্ভুতভাবে নীরব। তাদের কাছে আমাদের সবিনয় প্রশ্ন—মানবাধিকার এবং ইনসাফ কি কেবল নির্দিষ্ট কোনো মতাদর্শ বা গোষ্ঠীর জন্য সংরক্ষিত? একজন নিরপরাধ আলেমের ওপর যখন দীর্ঘস্থায়ী জুলুম চলে, তখন তথাকথিত প্রগতিশীল কণ্ঠস্বর কেন রুদ্ধ হয়ে যায়? অধিকারের দাবিতেও কি তবে আমরা ‘সিলেক্টিভ’ হয়ে পড়েছি?

মাওলানা আইনুল হক কাসেমি নিছক কোনো সাধারণ ব্যক্তি নন। তিনি এদেশের জ্ঞানতাত্ত্বিক জগতের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। তাঁর তাহকিককৃত ও সম্পাদিত একাধিক গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ আরব বিশ্ব থেকে প্রকাশিত হয়ে বিদেশের মাটিতে বাংলাদেশের মেধা ও গৌরবের স্বাক্ষর রেখেছে। যে মানুষটি কলম আর গবেষণার মাধ্যমে দেশের মুখ উজ্জ্বল করছেন, আজ তাঁকেই অন্যায় ও অবাস্তব অবিচারের শিকলে বন্দি থাকতে হচ্ছে। একজন লেখক ও গবেষকের কলমকে এভাবে রুদ্ধ করা কি একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্য শোভন?

একজন প্রতিভাবান আলেম ও নিভৃতচারী এই জ্ঞানসাধকের ওপর রাষ্ট্রের এই জুলুমের মেয়াদ আর কতকাল দীর্ঘায়িত হবে? আইনুল হক কাসেমির মতো নিরপরাধ মানুষের কান্নার প্রতিধ্বনি কি আমাদের নীতিনির্ধারকদের কান পর্যন্ত পৌঁছায় না? ক্ষমতার দাপটে ন্যায়বিচারকে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার এই সংস্কৃতি দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্রের স্তম্ভগুলোকেই দুর্বল করে দেয়।

আমরা সুস্পষ্টভাবে দাবি জানাই—আইনের এই দ্বিচারিতা বন্ধ হোক। ব্যক্তিকে দেখে নয়, বরং অপরাধের সত্যতা যাচাই করে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা হোক। আমরা অবিলম্বে মজলুম ও প্রতিভাবান মাওলানা আইনুল হক কাসেমির মুক্তি দাবি করছি। রাষ্ট্র যেন তাঁকে যথাযথ মর্যাদা দিয়ে তাঁর সৃজনশীল গবেষণার জগতে ফেরার পরিবেশ তৈরি করে দেয়। ইনসাফ সবার জন্য সমান হোক, এটাই হোক আজকের দিনের প্রধান দাবি।

লেখক: শিক্ষক ও অ্যাক্টিভিস্ট।

মন্তব্য করুন