বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেছেন, একটি শক্তিশালী ও স্বনির্ভর বাংলাদেশ গড়ে তোলার জন্য জনগণের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন অপরিহার্য। তিনি বলেন, “নাগরিককে দুর্বল রেখে রাষ্ট্র কখনও শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারে না। আমরা মনে করি, জনগণের পূর্ণ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা না গেলে দেশের গণতন্ত্র, উন্নয়ন কিংবা বিকেন্দ্রীকরণ— কোনোটিই টেকসই হবে না।”
সোমবার (৯ ফেব্রুয়ারি) সন্ধ্যায় দেশের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম বাংলাদেশ টেলিভিশন (বিটিভি) ও বাংলাদেশ বেতারে দেওয়া বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
প্রথম দিন থেকেই বাস্তবায়ন
রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পেলে কালক্ষেপণ না করার ঘোষণা দিয়ে তারেক রহমান বলেন, “ক্ষমতায় যেতে পারলে প্রথম দিন থেকেই আমরা পরিকল্পনা বাস্তবায়নের কাজ শুরু করবো। আমাদের লড়াই শুধু ক্ষমতা দখলের নয়, বরং রাষ্ট্রীয় সম্পদ ও প্রতিষ্ঠানগুলোকে দলীয়করণের হাত থেকে মুক্ত করে জনগণের হাতে ফিরিয়ে দেওয়াই মূল লক্ষ্য।”
প্রতিষ্ঠান সংস্কার ও সুশাসন
তিনি অঙ্গীকার করেন, বিএনপি ক্ষমতায় গেলে প্রতিটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান চলবে সংবিধান মোতাবেক। শাসকরা নিজেদের মালিক মনে করবে না, বরং জনগণের সেবক হিসেবে কাজ করবে। তিনি বলেন, “বিগত বছরগুলোতে সরকারি পদ-পদবিকে ব্যক্তিগত স্বার্থে ব্যবহার করে রাষ্ট্রকে ভেতর থেকে ফোকলা করে দেওয়া হয়েছে। আমরা এই সংস্কৃতির অবসান ঘটাবো।”
পাচার হওয়া অর্থ ও জনকল্যাণ
অর্থনীতি নিয়ে তারেক রহমান বলেন, “দেশ থেকে যে বিপুল পরিমাণ টাকা পাচার হয়েছে, তা রোধ ও ফিরিয়ে আনা গেলে ফ্যামিলি কার্ড, কৃষি কার্ড এবং বেকার ভাতা দেওয়ার মতো জনকল্যাণমূলক কাজের জন্য অর্থের কোনও সংকট হবে না। আমরা পাচার হওয়া সম্পদ ফিরিয়ে এনে সাধারণ মানুষের পকেটে দিতে চাই।” এছাড়া বেকারত্ব দূরীকরণ এবং মেধাবীদের মূল্যায়নকে প্রধান অগ্রাধিকার দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন তিনি।
ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ ও ভোটাধিকার
তারেক রহমান বলেন, “জনগণের রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের পূর্ব শর্ত হলো সরাসরি ভোটাধিকার। আমরা ক্ষমতা বিকেন্দ্রীকরণ করবো এবং স্থানীয় পরিষদের মাধ্যমে এই অধিকার তৃণমূল পর্যায়ে পৌঁছে দেবো। ক্ষমতা কোনও নির্দিষ্ট গোষ্ঠী বা দলের হাতে কুক্ষিগত থাকলে রাষ্ট্র শক্তিশালী হতে পারে না।”
শহীদদের স্বপ্ন ও জনগণের মালিকানা
জুলাই অভ্যুত্থানসহ সব গণতান্ত্রিক আন্দোলনের শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে তারেক রহমান বলেন, “সব শহীদের আকাঙ্ক্ষিত বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করা আমাদের পবিত্র দায়িত্ব। আমরা বিশ্বাস করি, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণ দেশের প্রকৃত মালিকানা ফিরে পাবে।”
তিনি আরও বলেন, “দেশের প্রকৃত মালিক জনগণ হলেও অতীতে ফ্যাসিস্ট সরকারগুলো জনগণের ক্ষমতা কেড়ে নিয়েছিল। তাই এবার জনগণ নিজেদের প্রকৃত মালিকানা বুঝে নেওয়ার সুযোগ পেয়েছে। গত ১৬ বছর দেশের মানুষ তাদের ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত ছিলেন; এবারের ভোট সেই অধিকার পুনরুদ্ধারের ঐতিহাসিক সুযোগ।”
বিগত দেড় দশকের ত্যাগ ও আন্দোলনের স্মৃতি
তারেক রহমান তাঁর ভাষণে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের দীর্ঘ সংগ্রামের কথা স্মরণ করে বলেন, “গণতন্ত্রকামী মানুষের জীবনে আজকের এই শুভ সময় এমনি এমনি আসেনি। এর জন্য গত দেড় দশকে বিএনপিসহ সকল গণতান্ত্রিক শক্তিকে অসীম ত্যাগ স্বীকার করতে হয়েছে। ফ্যাসিবাদী শাসনামলে হাজার হাজার মানুষকে গুম ও খুন করা হয়েছে। ‘আয়নাঘর’ নামক গোপন বন্দিশালাগুলো ছিল একেকটি জ্যান্ত কবরস্থান।”
জুলাই অভ্যুত্থানের ক্ষয়ক্ষতি ও শ্রদ্ধাঞ্জলি
২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার আন্দোলনের ভয়াবহতা তুলে ধরে তিনি অভিযোগ করেন, “গত আন্দোলনে প্রায় ১৪০০ মানুষকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে এবং আহত হয়েছেন কমপক্ষে ৩০ হাজার মানুষ। বাংলাদেশের জন্ম থেকে এ পর্যন্ত যত গণতান্ত্রিক আন্দোলন-সংগ্রামে যারা শহীদ হয়েছেন, আমি তাদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করছি এবং আহত ও তাদের পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানাচ্ছি।”
প্রাণের বিসর্জনের সার্থকতা
ইতিহাসের বিভিন্ন বাঁকে মানুষের আত্মত্যাগের কথা উল্লেখ করে বিএনপি চেয়ারম্যান বলেন, “১৯৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধ, ৭৫-এর ৭ নভেম্বর, ৯০-এর গণআন্দোলন, শাপলা চত্বরের হত্যাকাণ্ড কিংবা চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান—প্রতিটি ক্ষেত্রেই অগণিত মানুষ অকাতরে জীবন দিয়েছেন। একটি মানুষের মৃত্যুর সাথে সাথে একটি পরিবারের সব আকাঙ্ক্ষা ও সম্ভাবনারও মৃত্যু ঘটে।”
তিনি প্রশ্ন রেখে বলেন, “এই মানুষগুলো কেন জীবন দিয়েছিল? কী ছিল তাদের চাওয়া? কোনও কিছু দিয়েই প্রাণের এই প্রতিদান দেওয়া সম্ভব নয়। তবে আমরা এই বিপুল প্রাণের বিসর্জনকে বৃথা যেতে দিতে পারি না। তাদের সেই স্বপ্ন পূরণের মাধ্যমেই আমাদের প্রকৃত ঋণ শোধ করতে হবে।”
ঐক্যের ডাক ও শেষ বার্তা
তারেক রহমান দেশের সব ধর্ম-বর্ণের মানুষকে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানিয়ে বলেন, “একটি ফ্যাসিবাদমুক্ত বাংলাদেশে আমাদের সবার লক্ষ্য হবে জাতীয় ঐক্য এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা।” ভাষণের শেষে তিনি ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে ‘ধানের শীষ’ প্রতীকে ভোট দিয়ে গণতান্ত্রিক ধারাকে শক্তিশালী করার জন্য দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানান।
উল্লেখ্য, ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠেয় এই নির্বাচনে তারেক রহমান ঢাকা-১৭ ও বগুড়া-৬ আসন থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। আজ সন্ধ্যায় তার এই বক্তব্য একযোগে বিটিভি, বাংলাদেশ বেতার এবং বিভিন্ন বেসরকারি টেলিভিশনে সরাসরি সম্প্রচার করা হয়।
আই.এ/সকালবেলা