শুরু হচ্ছে কি নতুন মহাকাশ যুদ্ধ
অনলাইন ডেস্ক: কক্ষপথে অবস্থানরত কৃত্রিম উপগ্রহে বা স্যাটেলাইটে সফলভাবে জ্বালানি ভরার সাম্প্রতিক এক দাবি ঘিরে বৈশ্বিক মহাকাশ প্রযুক্তিতে এক নীরব বিপ্লবের সূচনা হয়েছে। দীর্ঘকাল ধরে উপগ্রহ সচল রাখার এই বিশেষ ক্ষমতা ও প্রযুক্তি বর্তমান আধুনিক পরাশক্তিগুলোর মহাকাশ প্রতিরক্ষা কৌশল এবং আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতিতে এক চরম প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ মাত্রা যোগ করেছে।
সম্প্রতি ‘সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট’ (এসসিএমপি)-এর প্রকাশিত একটি চাঞ্চল্যকর প্রতিবেদনে জানা যায়, চীনা গবেষকরা দেশটির নিজের তৈরি একটি নেভিগেশন স্যাটেলাইটে কক্ষপথেই সফলভাবে পুনরায় জ্বালানি পাঠাতে সক্ষম হয়েছেন। চীনা অ্যাকাডেমি অব সায়েন্সেস ও মহাকাশ গবেষণা ল্যাবরেটরির তথ্যমতে, ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে তাদের 'শিজিয়ান-২৫' নামের একটি সার্ভিসিং স্পেসক্রাফট অন্য এক 'বেইদৌ-২ জি৭' স্যাটেলাইটে সফলভাবে ১৪২ কেজি জ্বালানি স্থানান্তরিত করে। এর ফলে স্যাটেলাইটটির সার্বিক কর্মক্ষমতার মেয়াদ আরও প্রায় আট বছর বেড়ে গেছে।
যদিও যুক্তরাষ্ট্রের স্পেস ফোর্স এবং বিখ্যাত মহাকাশ পর্যবেক্ষক জোনাথন ম্যাকডওয়েলের দাবি, সেই নির্দিষ্ট সময়ে ওই দুটি উপগ্রহের অবস্থান পর্যালোচনা করে তাদের মধ্যে প্রত্যক্ষ সংযোগ বা স্পর্শের কোনো নিশ্চিত ভৌগোলিক প্রমাণ মেলেনি। তবে প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে, চীনা গবেষকদের এই প্রযুক্তিগত দাবি যদি বাস্তবে সত্যি হয়ে থাকে, তবে তা পুরো বৈশ্বিক সামরিক ও প্রযুক্তিগত ভারসাম্যে বড় ধরনের একটি উল্লম্ফন ঘটাবে।
মহাকাশে স্যাটেলাইটের চলাচলে অবাধ স্বকীয়তা আনায় এই 'রিফুয়েলিং প্রযুক্তি' কেবল বাণিজ্যিক ক্ষেত্রে লাভজনক নয়, বরং শত্রুপক্ষকে সামরিক কৌশলেও অভাবনীয় সুবিধা দেবে। এতদিন স্যাটেলাইটের নির্দিষ্ট পরিমাণ সীমাবদ্ধ জ্বালানি থাকত, যা শেষ হয়ে গেলে সেটিকে ফেলে দেওয়া ছাড়া উপায় ছিল না। কিন্তু কক্ষপথে সুবিধামতো জ্বালানি ভরার সুযোগ তৈরি হওয়ায় স্যাটেলাইটগুলো এখন যখন-তখন গতি ও কক্ষপথ পরিবর্তন করে শত্রুপক্ষকে বিভ্রান্ত করতে পারবে।
সাম্প্রতিক একাধিক প্রতিরক্ষা গবেষণায় উঠে এসেছে, মহাকাশ এখন এক নীরব কিন্তু অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ 'গ্রে জোন' বা ধূসর লড়াইয়ের অঞ্চলে পরিণত হয়েছে। এখানে সরাসরি ধ্বংসাত্মক কোনো হামলা চালানোর প্রয়োজন পড়ছে না, যার ফলে ক্ষতিকর মহাকাশ বর্জ্যও তৈরি হয় না। বরং একটি স্যাটেলাইট অন্যটির কাছে গিয়ে সংকেত বা সিগন্যাল জ্যাম করে দেওয়া, কিংবা গতিবিধি ট্র্যাকিং ও রোবোটিক বাহু দিয়ে পথ পাল্টে দেওয়ার মতো কাজগুলোই আধুনিক মহাকাশ যুদ্ধের প্রধান অস্ত্র হয়ে উঠেছে।
চীনের এই ধরনের নিরবচ্ছিন্ন সক্ষমতা বৃদ্ধির জবাবে চুপ করে বসে নেই যুক্তরাষ্ট্র ও তার পশ্চিমা মিত্ররাও। তারা মহাকাশে নিজস্ব প্রতিরক্ষা জোরদার করতে গোপনীয় চালকহীন স্পেসপ্লেন ও তড়িৎ-চুম্বকীয় অস্ত্র মোতায়েন সহ নানামুখী কৌশল জোরদার করছে। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবিত 'গোল্ডেন ডোম' প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাটিকেও ভবিষ্যতে মহাকাশে আক্রমণাত্মক ও প্রতিরক্ষামূলক ব্যবহারের উপযোগী করে রূপান্তর করার চিন্তা শুরু হয়েছে।
সব মিলিয়ে প্রযুক্তিগত রক্ষণাবেক্ষণ ও আন্তর্জাতিক সামরিক প্রতিযোগিতার সূক্ষ্ম পার্থক্যটি দিন দিন মুছে যাচ্ছে। ধারণা করা হচ্ছে, মহাকাশে গতিশীল থাকা এবং দীর্ঘমেয়াদে রিফুয়েলিং করার এই নীরব লড়াইয়ে যে পরাশক্তি আধিপত্য বিস্তার করতে পারবে, আগামী দিনের বৈশ্বিক নিরাপত্তা ও মহাকাশ কৌশলের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ তাদের হাতেই থাকবে।