প্রয়োজনের অতিরিক্ত কাপড় থাকলে যাকাত দিতে হবে কি
ধর্ম ডেস্ক:যাকাত ইসলামের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক ইবাদত, যা ধনীদের সম্পদকে পবিত্র করে এবং সমাজে অর্থনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখে। ইসলামি শরিয়তের সুনির্দিষ্ট নিয়ম অনুযায়ী, কোনো মুসলিমের মালিকানায় যদি মৌলিক প্রয়োজনের অতিরিক্ত সাড়ে সাত ভরি সোনা কিংবা সাড়ে বায়ান্ন তোলা রুপা অথবা এর সমমূল্যের নগদ অর্থ ও বাণিজ্যিক পণ্য থাকে এবং তা এক বছরকাল স্থায়ী হয়, তবে তার ওপর ২.৫% হারে যাকাত আদায় করা ফরজ। কিন্তু বর্তমান আধুনিক জীবনযাত্রায় অনেকের ঘরেই, বিশেষ করে নারীদের আলমারিতে প্রয়োজনের অতিরিক্ত বিপুল পরিমাণ দামী শাড়ি, থ্রিপিস বা লেবাস জমা হয়ে থাকে। এই অতিরিক্ত ও অব্যবহৃত পোশাকগুলোর ওপর যাকাত ফরজ হবে কিনা—তা নিয়ে ইসলামি আইনজ্ঞ ও ফেকাহবিদরা সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা দিয়েছেন।
আজ বুধবার (১০ জুন) দুপুর ১টা ১৭ মিনিটে অনলাইন সংস্করণে প্রকাশিত ‘ধর্মীয় মূল্যবোধ, শরিয়াহ সমাধান ও সমাজ সংস্কার’ এবং ‘ইসলামি অর্থনীতি, হাদিস-তাফসির ও ফতোয়া ট্র্যাকিং উইং’ বিভাগের বিশেষ যৌথ বুলেটিংয়ে প্রয়োজনের অতিরিক্ত কাপড়ের যাকাত ও সদকার বিধানের বিস্তারিত খতিয়ান তুলে ধরা হলো।
সম্প্রতি এক দীনদার নারী ইসলামি ফেকাহ বোর্ডের কাছে একটি সুনির্দিষ্ট প্রশ্ন উত্থাপন করে বলেন, “আমার স্বামী একজন প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী। তিনি বছরের বিভিন্ন সময়ে, বিশেষ করে প্রতি ঈদে আমাকে অত্যন্ত দামী দামী অনেক কাপড়-চোপড় ও পোশাক কিনে দেন। তাছাড়াও বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানে আত্মীয়-স্বজনদের কাছ থেকে অনেক থ্রিপিস, শাড়ি ইত্যাদি উপহার হিসেবে পাই। যার কারণে কাপড়ের সংখ্যা দিন দিন বেড়েই চলছে এবং এখন দুটি বড় আলমারিতেও সেগুলো জায়গা হচ্ছে না। অথচ এতো শত কাপড়ের মাঝে মাত্র কয়েক সেট কাপড়ই আমার নিয়মিত ব্যবহার করা হয়, বাকিগুলো ওভাবেই পড়ে থাকে। এখন জানতে চাই, এই অতিরিক্ত ও অব্যবহৃত মূল্যবান কাপড়গুলোর ওপর কি বছর শেষে যাকাত দিতে হবে?”
এই বিষয়ে বিশ্বখ্যাত ইসলামি ফেকাহবিদ ও মুফতিদের স্পষ্ট এবং সর্বসম্মত মতামত হলো—ব্যক্তিগত বা পারিবারিক ব্যবহারের জন্য রাখা প্রয়োজনের অতিরিক্ত ওই কাপড়গুলোর ওপর কোনো যাকাত আসবে না। ইসলামি শরিয়তের নিয়ম অনুযায়ী, মানুষের দৈনন্দিন ব্যবহারের জিনিসপত্র (যেমন—পোশাক-আশাক, বসবাসের বাড়ি, ব্যবহারের গাড়ি বা ঘরের আসবাবপত্র) তা পরিমাণে যত বেশিই হোক না কেন এবং বাজারমূল্যে যত মূল্যবানই হোক না কেন, তার ওপর যাকাত ফরজ হয় না।
তবে এক্ষেত্রে স্বর্ণ ও রূপার অলংকারের বিধান সম্পূর্ণ আলাদা। সোনা বা রূপার অলংকার নারীরা নিয়মিত ব্যবহারের জন্য রাখলেও বা আলমারিতে তুলে রাখলেও—তা নেসাব পরিমাণ হলেই তার ওপর বছর শেষে নির্দিষ্ট নিয়মে যাকাত দেওয়া বাধ্যতামূলক। কাপড়ের ক্ষেত্রে এই নিয়ম প্রযোজ্য নয়, কারণ কাপড় মূলত মানুষের মৌলিক আবশ্যিক চাহিদার (হাওয়ায়েজে আসলিয়্যাহ) অন্তর্ভুক্ত।
ইসলামিক স্কলাররা জানিয়েছেন, ওই অতিরিক্ত কাপড়গুলোর ওপর যাকাত ফরজ না হলেও, সেগুলো আলমারিতে নষ্ট না করে সমাজের গরিব, এতিম ও দুস্থ মানুষের মাঝে নফল সদকা বা দান করে দেওয়া অত্যন্ত সওয়াবের কাজ। হাদিস শরিফে নিজের ব্যবহৃত বা অতিরিক্ত কাপড় সাধারণ মানুষের মাঝে সদকা করার প্রতি বিশেষভাবে উদ্বুদ্ধ করা হয়েছে এবং এর ফজিলতও অপরিসীম।
ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হযরত উমর (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি আল্লাহর রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে বলতে শুনেছি যে, “যে ব্যক্তি নতুন কোনো কাপড় পরিধান করার সময় এই বিশেষ দোয়াটি পাঠ করবে—
আলহামদু লিল্লাহিল্লাজি কাসানি মা উয়ারি বিহি আওরাতি ওয়া আতাজাম্মালু বিহি ফি হায়াতি।
সকল প্রশংসা আল্লাহর জন্য, যিনি আমাকে এমন কাপড় পরিধান করিয়েছেন যা দিয়ে আমি আমার সতর ঢাকতে পারছি এবং আমার জীবনে সৌন্দর্য লাভ করছি।
এরপর সে যদি তার পুরাতন বা অতিরিক্ত কাপড়টি কোনো অভাবী মানুষকে সদকা (দান) করে দেয়, তবে ওই দানকারী ব্যক্তি জীবিত অবস্থায় এবং মৃত্যুর পরও (দুজাহানেই) মহান আল্লাহ তায়ালার খাস হেফাজত, নিরাপত্তা এবং আল্লাহর নির্দেশিত পুণ্যময় পথের ওপর থাকবে।” (জামে তিরমিজি, হাদিস নম্বর: ৩৫৬০)।
তাই ইসলামি চিন্তাবিদদের পরামর্শ হলো, ঘরে অতিরিক্ত কাপড় জমিয়ে রেখে অপচয় না করে, তা সমাজের সুবিধাবঞ্চিত মানুষদের মাঝে বিলিয়ে দেওয়া একজন আদর্শ মুসলিমের অন্যতম বড় গুণ।
জান্নাত সকালবেলা
|