দাঁতের সৌন্দর্য বৃদ্ধিতে দাঁত সোজা করা কি বৈধ

প্রকাশ: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬, ০২:০২ অপরাহ্ণ
দাঁতের সৌন্দর্য বৃদ্ধিতে দাঁত সোজা করা কি বৈধ
ইসলামি জীবন ডেস্ক:ইসলাম মানুষের স্বাভাবিক ও পবিত্র সৌন্দর্যচর্চাকে কেবল স্বীকৃতিই দেয়নি, বরং এর প্রতি বিশেষ গুরুত্বারোপ করেছে। তবে এই সৌন্দর্য অর্জনের নামে যেন মানুষ আল্লাহর নির্ধারিত সৃষ্টিগত সীমানা লঙ্ঘন না করে, সে বিষয়েও ইসলামে রয়েছে সুস্পষ্ট ও ভারসাম্যপূর্ণ নীতিমালা। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, “নিশ্চয়ই আমি মানুষকে সর্বোত্তম অবয়বে সৃষ্টি করেছি।” (সুরা: তিন, আয়াত: ৪)। অন্য আয়াতে আল্লাহ তাআলা আরও বলেন, “হে আদমসন্তান! তোমরা প্রত্যেক ইবাদতের সময় তোমাদের সৌন্দর্য ও শোভা গ্রহণ করো।” (সুরা: আরাফ, আয়াত: ৩১)। একইভাবে সহিহ মুসলিম শরিফের ৯১ নম্বর হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “নিশ্চয়ই আল্লাহ সুন্দর এবং তিনি সৌন্দর্যকে ভালোবাসেন।”

আজ বুধবার (১০ জুন) দুপুর ১টা ৩৯ মিনিটে অনলাইন সংস্করণে প্রকাশিত ‘ধর্মীয় मूल्यবোধ, শরিয়াহ সমাধান ও সমাজ সংস্কার’ এবং ‘ইসলামি অর্থনীতি, হাদিস-তাফসির ও ফতোয়া ট্র্যাকিং উইং’ বিভাগের বিশেষ যৌথ বুলেটিংয়ে দাঁত সোজা করার বৈধতা ও ফেকাহ শাস্ত্রের চুলচেরা বিশ্লেষণের বিস্তারিত খতিয়ান তুলে ধরা হলো।

ইসলামে বৈধ উপায়ে পরিচ্ছন্ন থাকা প্রশংসনীয় হলেও, রাসুলুল্লাহ (সা.) এমন কিছু কৃত্রিম ও অপ্রয়োজনীয় রূপচর্চার ব্যাপারে কঠোরভাবে সতর্ক করেছেন, যা আল্লাহর স্বাভাবিক সৃষ্টিকে বিকৃত করার শামিল। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) বর্ণনা করেন, “রাসুলুল্লাহ (সা.) ওইসব নারীর ওপর লানত (অভিশাপ) করেছেন, যারা সৌন্দর্য বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে দাঁতের মাঝে ঘষে কৃত্রিম ফাঁক সৃষ্টি করে এবং এভাবে আল্লাহর সৃষ্টিতে পরিবর্তন আনে।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫৯৩১; সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২১২৫)।

তবে এই হাদিসের মূল মর্মার্থ বুঝতে হলে ইসলামি আইনবিদদের ব্যাখ্যা লক্ষ করা অত্যন্ত জরুরি। ফেকাহবিদদের মতে, হাদিসে কেবল সেইসব ক্ষেত্রে নিষিদ্ধ করা হয়েছে, যেখানে একদম সুস্থ ও স্বাভাবিক দাঁতকে স্রেফ ফ্যাশন বা কৃত্রিম রূপ দেওয়ার জন্য কেটে বা ঘষে ফাঁক তৈরি করা হয়। এখানে কোনো রোগ নিরাময়, জন্মগত শারীরিক বিকৃতি সংশোধন কিংবা স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনার চিকিৎসাকে নিষিদ্ধ করা হয়নি।

শরিয়তের মূলনীতির আলোকে প্রখ্যাত হাদিস বিশারদ আল্লামা বদরুদ্দীন আইনী (রহ.) তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘উমদাতুল কারি’তে (১৪/১৭৯) লিখেছেন, “যেসব চিকিৎসা বা ওষুধ মুখমণ্ডলের অনাকাঙ্ক্ষিত দাগ দূর করে এবং চেহারাকে স্বাভাবিক সুন্দর করে, সেগুলোতে শরিয়তের কোনো বাধা নেই।” একইভাবে ইমাম নববি (রহ.) সহিহ মুসলিমের ব্যাখ্যায় স্পষ্ট করেছেন যে, কোনো পরিবর্তন যদি স্রেফ বিলাসিতা না হয়ে চিকিৎসা বা শারীরিক ত্রুটি দূর করার উদ্দেশ্যে হয়, তবে তা শরিয়তে সম্পূর্ণরূপে বৈধ ও জায়েজ।

বর্তমান চিকিৎসা বিজ্ঞানের আধুনিক অগ্রগতির যুগে দাঁত সোজা করার জন্য 'ব্রেস' বা অন্যান্য উন্নত পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়। শরিয়তের আলোকেও যদি কারো দাঁত স্বাভাবিকের চেয়ে অত্যধিক বাঁকা হয়, উঁচু-নিচু বা বিক্ষিপ্ত হয়ে থাকে, যার কারণে চোয়ালের গঠনে সমস্যা দেখা দেয়, কিংবা স্বাভাবিকভাবে খাওয়া-দাওয়া ও কথা বলায় স্পষ্ট অসুবিধা সৃষ্টি হয়—তবে মুখমণ্ডলের সেই বিকৃতি সংশোধন এবং কষ্ট দূর করার জন্য ব্রেস লাগানো সম্পূর্ণ জায়েজ ও বৈধ।

কারণ, এই ধরণের আধুনিক চিকিৎসায় আল্লাহর সৃষ্টিকে কোনোভাবেই বিকৃত বা পরিবর্তন করা হয় না; বরং চিকিৎসার মাধ্যমে দাঁতকে তার স্বাভাবিক ও সামঞ্জস্যপূর্ণ অবস্থানে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করা হয় মাত্র। ইসলাম সবসময় মানুষের কষ্ট লাঘব ও ত্রুটি দূর করার পথকে সহজ করে দেয়। অতএব, দাঁতের ডেন্টাল ত্রুটি সংশোধনের জন্য আধুনিক দন্তচিকিৎসার আশ্রয় নেওয়া ইসলামের ভারসাম্যপূর্ণ ও বাস্তবমুখী সৌন্দর্যবোধেরই এক অনন্য এবং প্রশংসনীয় উদাহরণ।

জান্নাত সকালবেলা

মন্তব্য করুন