তুরস্ককে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল দিতে চায় বাংলাদেশ

প্রকাশ: শুক্রবার, ০৫ জুন ২০২৬, ০৪:২৪ অপরাহ্ণ
তুরস্ককে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল দিতে চায় বাংলাদেশ

আন্তর্জাতিক ডেস্ক:  বন্ধুত্বপূর্ণ দুই মুসলিম রাষ্ট্র বাংলাদেশ ও তুরস্কের মধ্যেকার দ্বিপক্ষীয় অর্থনৈতিক সম্পর্ক, বাণিজ্যিক অংশীদারিত্ব এবং কূটনৈতিক যোগাযোগকে এক নতুন ও ঐতিহাসিক উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার অভিন্ন অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছে ঢাকা ও আঙ্কারা। বাংলাদেশে তুর্কি পুঁজিপতিদের সরাসরি বিনিয়োগ (FDI) আকর্ষণের লক্ষ্যে তুরস্কের জন্য দেশের প্রধানতম বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল (SEZ) এবং বেসরকারি অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোতে একচ্ছত্র বিনিয়োগের আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব দিয়েছে বাংলাদেশ সরকার। একই সঙ্গে দুই দেশের মধ্যেকার আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যকে শুল্কমুক্ত ও সম্প্রসারিত করতে বহুল প্রতীক্ষিত ‘মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি’ (FTA) এবং ‘অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য চুক্তি’ (PTA) দ্রুত স্বাক্ষরের সম্ভাবনা নিয়ে ফলপ্রসূ আলোচনা হয়েছে।

আজ শুক্রবার (৫ জুন) বিকেল ৪টা ১৭ মিনিটে অনলাইন সংস্করণে প্রকাশিত ‘আন্তর্জাতিক ও কূটনৈতিক’ এবং ‘বৈশ্বিক ভূরাজনীতি, দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য সম্পর্ক ও আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ফোরাম উইং’ বিভাগের বিশেষ যৌথ বুলেটিংয়ে দুই দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের মধ্যকার এই মেগা বৈঠকের গুরুত্বপূর্ণ সব সিদ্ধান্ত বিস্তারিত তুলে ধরা হলো।

সংশ্লিষ্ট কূটনৈতিক সূত্র জানায়, আজ শুক্রবার রাষ্ট্রীয় রাজধানী ঢাকায় সফররত তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান (Hakan Fidan) এবং বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের মধ্যে এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও উচ্চপর্যায়ের দ্বিপক্ষীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে দুই দেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট নানা আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক ইস্যু স্থান পায়। বৈঠক শেষে আয়োজিত এক জমকালো যৌথ সংবাদ সম্মেলনে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান দ্বিপক্ষীয় আলোচনার মূল বিষয়বস্তুসমূহ গণমাধ্যমের সামনে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করেন।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান বলেন, “আমরা তুরস্কের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) স্বাক্ষরের আইনি সম্ভাবনা এবং অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য চুক্তি (পিটিএ) দ্রুত বাস্তবায়নের খুঁটিনাটি নিয়ে অত্যন্ত ইতিবাচক আলোচনা করেছি। বাংলাদেশ ও তুরস্কের মধ্যে বর্তমানে যে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ রয়েছে, তা আগামী দিনগুলোতে উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানোর যথেষ্ট সুযোগ ও সম্ভাবনা রয়েছে।”

যৌথ সংবাদ সম্মেলনে পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য সরকার যে সমস্ত আকর্ষণীয় অর্থনৈতিক প্রণোদনা ও কর অবকাশ সুবিধা দিচ্ছে, সে বিষয়গুলো তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে বিস্তারিতভাবে অবহিত করা হয়েছে। পাশাপাশি সম্ভাব্য বড় তুর্কি বিনিয়োগকারীদের বাংলাদেশের বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে বিনিয়োগের উদাত্ত আহ্বান জানানো হয়েছে। খলিলুর রহমান বলেন, “তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এই সফর বাংলাদেশ-তুরস্ক সম্পর্কের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও ঐতিহাসিক সময়ে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এটি দুই দেশের মধ্যে সহযোগিতা আরও গভীর করার অভিন্ন অঙ্গীকারের এক অনন্য প্রতিফলন।”

বাংলাদেশ যে সমস্ত সম্ভাবনাময় খাতে তুরস্কের সরাসরি ও যৌথ বিনিয়োগের প্রস্তাব দিয়েছে, সেগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো—বাংলাদেশের প্রধান চালিকাশক্তি তৈরি পোশাক ও বস্ত্রশিল্প (RMG), আধুনিক প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম উৎপাদন (Defense Equipment), জাহাজ নির্মাণ শিল্প, উন্নত ওষুধশিল্প (Pharmaceuticals), মেগা অবকাঠামো উন্নয়ন, পরিবেশবান্ধব নবায়নযোগ্য জ্বালানি, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (ICT), স্মার্ট প্রযুক্তি এবং বেসামরিক বিমান পরিবহন খাত। এর পাশাপাশি ঢাকার বুকে আন্তর্জাতিক মানের একটি আধুনিক হাসপাতাল এবং একটি বিশ্বমানের নার্সিং ইনস্টিটিউট স্থাপনে তুরস্ককে এককভাবে বিনিয়োগের বিশেষ প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।

বাণিজ্যিক আলোচনার পাশাপাশি দুই দেশের শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক মেলবন্ধন নিয়ে কথা বলেন খলিলুর রহমান। তিনি বাংলাদেশি মেধারী শিক্ষার্থীদের জন্য তুরস্কে সরকারি বৃত্তির (Scholarship) সংখ্যা আরও উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ানোর জন্য হাকান ফিদানকে বিশেষ অনুরোধ জানান। পররাষ্ট্রমন্ত্রী উল্লেখ করেন, বর্তমানে প্রায় তিন হাজারেরও বেশি বাংলাদেশি নাগরিক তুরস্কে অবস্থান করছেন, যাদের একটি বিশাল বড় অংশই উচ্চশিক্ষারত শিক্ষার্থী।

এদিকে, মানবিক ও আঞ্চলিক নিরাপত্তার দিক থেকে অত্যন্ত সংবেদনশীল রোহিঙ্গা শরণার্থী সংকট প্রসঙ্গে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান বলেন, “মিয়ানমার থেকে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের এই মানবিক সংকটের দেখতে দেখতে দীর্ঘ নয় বছর পূর্ণ হয়েছে। কিন্তু এখনও টেকসই প্রত্যাবাসন শুরু করা যায়নি। এই সংকটের দ্রুত ও স্থায়ী সমাধানে তুরস্কসহ সমগ্র আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আরও অনেক বেশি কার্যকর, জোরালো এবং সমন্বিত কূটনৈতিক উদ্যোগ গ্রহণ করা প্রয়োজন।” পরিশেষে, দুই দেশের মধ্যে সংস্কৃতি, পর্যটন, শিক্ষা ও ব্যবসায়িক যোগাযোগ (B2B) আরও জোরদারে তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে সক্রিয় ভূমিকা রাখার আহ্বান জানান তিনি।

জান্নাত সকালবেলা

মন্তব্য করুন