‘মনে হতো আমি স্বর্গে আছি’: ‘রইদ’ নিয়ে মোস্তাফিজুর নূর ইমরান

প্রকাশ: বুধবার, ০৩ জুন ২০২৬, ০৫:৫০ অপরাহ্ণ
‘মনে হতো আমি স্বর্গে আছি’: ‘রইদ’ নিয়ে মোস্তাফিজুর নূর ইমরান
বিনোদন ডেস্ক : পবিত্র ঈদুল আজহার দিন থেকেই দেশের আধুনিক ও ঐতিহ্যবাহী প্রেক্ষাগৃহগুলোতে সগৌরবে ‘রইদ’ উঠেছে। ‘হাওয়া’ খ্যাত দেশের অন্যতম মাস্টারমাইন্ড নির্মাতা মেজবাউর রহমান সুমনের বহুল আলোচিত ও প্রতীক্ষিত এই চলচ্চিত্রে প্রধান ও কেন্দ্রীয় ‘সাদু’ চরিত্রে অভিনয় করেছেন সময়ের শক্তিমান অভিনেতা মোস্তাফিজুর নূর ইমরান। মুক্তির পর থেকেই সিনেমা হলের ভেতরে ও বাইরে ‘রইদ’ নিয়ে নির্মাতা, কলাকুশলী থেকে শুরু করে সাধারণ চলচ্চিত্রপ্রেমী—সব মহলেই চলছে তুমুল আলোচনা ও চুলচেরা বিশ্লেষণ। তবে এই বিপুল শোরগোলের মধ্যেও স্বভাবসুলভভাবেই কিছুটা নীরব ও প্রচারবিমুখ ভূমিকা পালন করছেন ছবির মূল কাণ্ডারি ইমরান। সম্প্রতি এক বিশেষ ও একান্ত আলাপচারিতায় ‘রইদ’ চলচ্চিত্রের ভেতরের গল্প, নিজের অভিনয় দর্শন এবং চরিত্রের পেছনের এক রোমাঞ্চকর জার্নির কথা অকপটে তুলে ধরেছেন তিনি।

আজ বুধবার (৩ জুন) বিকেল ৫টা ৪৩ মিনিটে অনলাইন সংস্করণে প্রকাশিত ‘বিনোদন’ ও ‘চলচ্চিত্র ও থিয়েটার কর্নার’ বিভাগের বিশেষ আয়োজনে সেই আকর্ষণীয় সাক্ষাৎকারের চুম্বক অংশ বিস্তারিত তুলে ধরা হলো।

সাক্ষাৎকারের শুরুতেই ইমরান তাঁর নীরবতা প্রসঙ্গে হাসিমুখে জানান, তিনি বরাবরই প্রচারের আলো থেকে একটু দূরে থাকতেই ভালোবাসেন। তবে ‘রইদ’ মুক্তির পর চারপাশ থেকে আসা দারুণ সব সাড়ায় তিনি ভীষণভাবে আপ্লুত। স্কুলজীবনের বহু পুরোনো বন্ধুরা দীর্ঘ বছর পর টেক্সট বা ফোন করে শুভেচ্ছা জানাচ্ছে। তবে ইমরান অভিনীত এই চরিত্রে সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি এসেছে তাঁর নিজের বাবার কাছ থেকে। ইমরান জানান, এই চলচ্চিত্রে ‘সাদু’ চরিত্রটি নির্মাণ করতে গিয়ে তিনি তাঁর বাবার বেশ কিছু স্বভাব ও চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য (Characteristics) নিজের ভেতরে ব্লেন্ড বা মিশ্রণ করেছিলেন (যেমনটি তিনি এর আগে ‘আলফা’ ছবির সময় মায়ের ক্ষেত্রে করেছিলেন)। ছবি দেখার পর তাঁর বাবা প্রচণ্ড আবেগপ্রবণ বা ইমোশনাল হয়ে পড়েন এবং প্রেক্ষাগৃহ থেকে বের হওয়ার সময় লিফটে ওঠার মুহূর্তে তিনি আক্ষরিক অর্থেই কাঁপছিলেন। বাবার এই নীরব হাহাকার ও অনুভূতিকে ইমরান তাঁর জীবনের অন্যতম সেরা ও বড় পুরস্কার বলে মনে করছেন।

বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেক দর্শকই বলছেন যে, তাঁরা ‘রইদ’ ছবির মূল দর্শন বা রূপক রূপকথা পুরোপুরি বুঝতে পারছেন না। এই প্রসঙ্গে দর্শকদের একটি সহজ টোটকা দিয়ে ইমরান বলেন, “চলচ্চিত্রটি দেখতে হবে সম্পূর্ণ মন দিয়ে শুনে, দেখে ও বুঝে। এই ছবি সিনেমা হলে বসে পাশের মানুষের সাথে গল্প করতে করতে কিংবা পপকর্ন চিবানোর খড়খড় শব্দের হট্টগোলের মধ্যে উপভোগ করার মতো সিনেমা নয়। কারণ একটি চলচ্চিত্র শুধু সস্তা গল্পের স্ট্রাকচারে তৈরি হয় না; এটি শব্দ, সংগীত ও পারফরম্যান্সের এক জটিল অনুভূতির মিশ্রণ। আমাদের দেশে গত ৩০-৩২ বছর ধরে ফোক বা লোকচর্চার যে অভাব তৈরি হয়েছে, তার ফলেই দর্শকদের মনন বুঝতে কিছুটা সময় নিচ্ছে। তবে ‘রইদ’ দেশের চলচ্চিত্রে একটি নতুন ট্রেন্ড সেট করল, যা আগামীতে অন্য মেকাররা ফলো করবে।”

২০২২ সালে ওটিটি প্ল্যাটফর্ম চরকির ‘এই মুহূর্তে’ অ্যান্থলজির একটি পর্বে কাজ করার সময়ই নির্মাতা সুমন প্রথম ইমরানের কাছে সাদুর চরিত্রটি শেয়ার করেন। এই চরিত্রটিতে প্রাণ দিতে ইমরানকে দীর্ঘদিন শুটিং স্পটের গ্রামীণ প্রকৃতির সাথে একাত্ম হয়ে যাপন করতে হয়েছে। সেই দিনগুলোর স্মৃতিচারণ করে ইমরান আবেগঘন কণ্ঠে বলেন, “সেখানে দীর্ঘদিন প্রকৃতির সাথে মিশে যাওয়া, নদীর ঘাট, নৌকা, এমনকি খেতের গরু-ছাগলগুলোর সাথেও আমার আত্মার এক অলৌকিক অভ্যস্ততা গড়ে উঠেছিল। সাদু চরিত্রে অভিনয়ের খাতিরে পাথরের ওপর দিয়ে দিনের পর দিন খালি পায়ে হাঁটতে হতো। যখন মাঠের মধ্যে গরুগুলোকে গোসল করিয়ে আমি ঘাসের ওপর শুয়ে আকাশ দেখতাম, তখন এক অপরিসীম আনন্দে বুকটা ভরে উঠত। মনে হতো, আমি স্বর্গে আছি; এটাই বোধহয় প্রকৃত স্বর্গ। এই অসাধারণ সফর যদি বক্স অফিস থেকে আর কিছু নাও দেয়, তবুও একজন অভিনেতা হিসেবে আমার প্রাপ্তির খাতা পূর্ণ।”

চলচ্চিত্রে তাঁর সহশিল্পী নাজিফা তুষির অভিনয়ের ভূয়সী প্রশংসা করে ইমরান বলেন, “তুষিই মূলত এই ছবির আসল প্রাণ। পুরো গল্পটা এই পাগলীর চরিত্রটিকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হয়েছে। ও আমাদের ইন্ডাস্ট্রির ‘ব্রাইটেস্ট স্টার’। একটা সময় ছিল যখন মেয়েরা ববিতা বা শাবনূরের মতো হতে চাইত, আমি বিশ্বাস করি সামনে এমন সময় আসবে যখন নবাগত অভিনেত্রীরা তুষির মতো হওয়ার স্বপ্ন দেখবে।”

পাশাপাশি পরিচালক মেজবাউর রহমান সুমনকে দেশের ‘ফাইনেস্ট ফিল্মমেকার’ বা সেরা চলচ্চিত্র নির্মাতা আখ্যা দিয়ে ইমরান ভবিষ্যদ্বাণী করেন, আজ থেকে বহু বছর পর যখন জহির রায়হান, ঋত্বিক ঘটক, আলমগীর কবির কিংবা সত্যজিৎ রায়ের মতো কিংবদন্তিদের চলচ্চিত্র নিয়ে অ্যাকাডেমিক গবেষণা হবে, তখন উচ্চতম পর্যায়ে সুমন ভাইয়ের নামও শ্রদ্ধার সাথে উচ্চারিত হবে।

অভিনয়ে সুখ্যাতি থাকার পরও হঠাৎ নির্মাণে আসা প্রসঙ্গে ইমরান তাঁর ভেতরের ক্রাইসিসের কথা জানান। তিনি বলেন, একজন অভিনেতার সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হলো একটি ভালো কাজের জন্য বছরের পর বছর দীর্ঘ অপেক্ষা করা, যা নিজের নিয়ন্ত্রণে থাকে না। কিন্তু পরিচালনা সম্পূর্ণ নিজের হাতের মুঠোয় থাকে। ইতিমধ্যে তিনি নিজের পরিচালনায় একটি চমৎকার ওয়েব ফিল্মের প্রথম লটের শুটিং সম্পন্ন করেছেন। কোনো বাণিজ্যিক প্ল্যাটফর্ম যদি ভিউ বাণিজ্যের বাইরে গিয়ে একটি আন্তর্জাতিক মানের নিখাদ কোয়ালিটি কনটেন্ট দর্শকদের দেখাতে রাজি হয়, তবে খুব শিগগিরই ইমরানের সেই নতুন ডিরেক্টোরিয়াল প্রজেক্টটি আলোর মুখ দেখবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন এই গুণী তারকা।

জান্নাত সকালবেলা

মন্তব্য করুন