ঐতিহাসিক ৬ দফা দিবস আজ; সরকারি পর্যায়ে নেই কোনো কর্মসূচি

প্রকাশ: রবিবার, ০৭ জুন ২০২৬, ০২:৪৬ অপরাহ্ণ
ঐতিহাসিক ৬ দফা দিবস আজ; সরকারি পর্যায়ে নেই কোনো কর্মসূচি
নিজস্ব প্রতিবেদক : বাঙালি জাতির পরাধীনতার শৃঙ্খল মোচন, স্বাধিকার আন্দোলন এবং স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার নেপথ্যে দীর্ঘ সংগ্রামের ইতিহাসে ৭ জুন একটি অবিস্মরণীয় ও রক্তস্নাত দিন। তৎকালীন পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর চরম শোষণ, বঞ্চনা ও সামরিক স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে পূর্ব বাংলার জনগণের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক মুক্তির ‘ম্যাগনাকার্টা’ বা মুক্তির সনদ হিসেবে খ্যাত ঐতিহাসিক ৬ দফা দাবি আদায়ের আন্দোলনের এক অনন্য স্মারক এই দিবসটি। ১৯৬৬ সালের এই দিনে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সর্বস্তরের মুক্তিকামী মানুষ রাজপথে নেমে এসেছিলেন, যার ধারাবাহিকতায় পরবর্তীতে আমাদের মহান মুক্তিসংগ্রামের পথ সুগম হয়েছিল।

আজ রবিবার (৭ জুন) দুপুর ১টা ১০ মিনিটে অনলাইন সংস্করণে প্রকাশিত ‘জাতীয়, ইতিহাস ও রাজনৈতিক ধারা’ এবং ‘উপমহাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম, স্বাধিকার আন্দোলন ও সমকালীন রাজনৈতিক পটপরিবর্তন পর্যবেক্ষণ উইং’ বিভাগের বিশেষ যৌথ বুলেটিংয়ে ঐতিহাসিক ৬ দফা দিবসের পেছনের রক্তঝরা ইতিহাস এবং দেশের বর্তমান পরিবর্তিত পরিস্থিতির বিবরণ বিস্তারিত তুলে ধরা হলো।

ঐতিহাসিক তথ্যানুযায়ী, ১৯৬৬ সালের ৭ জুন আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন তথা ৬ দফা দাবি আদায়ের লক্ষ্যে সমগ্র দেশব্যাপী দিনব্যাপী রাজপথ-রেলপথ অবরোধ ও সর্বাত্মক পূর্ণদিবস হরতাল আহ্বান করা হয়েছিল। তৎকালীন সামরিক জান্তা আইয়ুব খানের দমন-পীড়নকে উপেক্ষা করে স্বতঃস্ফূর্তভাবে সেই হরতালে সাড়া দেন ছাত্র, শ্রমিক, চাকরিজীবীসহ বাংলার সর্বস্তরের সাধারণ মানুষ। স্বাধিকারকামী জনতার এই অভূতপূর্ব জোয়ার ও আন্দোলন বানচাল করতে পাকিস্তানি পুলিশ ও ইআরপি ঢাকা এবং নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন স্থানে মিছিলে নির্বিচারে গুলি চালায়।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সেই বর্বরোচিত গুলিবর্ষণে ঢাকার তেজগাঁও শিল্পাঞ্চলে শ্রমিক নেতা মনু মিয়া, ওয়াজিউল্লাহসহ ১১ জন এবং নারায়ণগঞ্জে সফিক ও শামসুল হকসহ বেশ কয়েকজন মুক্তিকামী বীর জনতা শহীদ হন। আহত হন শত শত মানুষ। রাজপথে বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দেওয়ার এই ঘটনা তৎকালীন পূর্ব বাংলার মানুষের মাঝে স্ফুলিঙ্গের মতো ছড়িয়ে পড়ে। স্বাধিকারের দাবি রূপ নেয় গণদাবিতে, যা পরবর্তীতে আইয়ুব খানের পতন এবং ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের মূল ভিত্তি তৈরি করে দেয়।

এই আন্দোলনের পটভূমি তৈরি হয়েছিল আরও কয়েক মাস আগে। ১৯৬৬ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তানের লাহোরে তৎকালীন পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের সমস্ত বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর একটি জাতীয় সম্মেলন ডাকা হয়েছিল, যা ইতিহাসে ‘লাহোর সম্মেলন’ নামে পরিচিত। ওই সম্মেলনে পূর্ব বাংলার জনগণের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও প্রতিরক্ষা সংক্রান্ত চরম বঞ্চনার অবসান ঘটিয়ে পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ মুজিবুর রহমান ঐতিহাসিক ৬ দফা দাবি উত্থাপন করেন।

পরবর্তীতে ১১ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় ফিরে দেশব্যাপী ৬ দফার পক্ষে ব্যাপক প্রচারাভিযান ও গণসংযোগ শুরু করেন তিনি। বাংলার প্রতিটি অঞ্চলে গিয়ে সাধারণ মানুষের মাঝে ৬ দফার গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হলে, শোষিত-বঞ্চনাগ্রস্ত বাঙালি সমাজ অত্যন্ত দ্রুততার সাথে এই দাবিকে নিজেদের বাঁচার দাবি হিসেবে গ্রহণ করে। ফলে ৬ দফা হয়ে ওঠে বাঙালি জাতীয়তাবাদের মূল চালিকাশক্তি।

তবে সময়ের আবর্তে ও দেশের রাজনৈতিক পরিমণ্ডলের ব্যাপক পরিবর্তনের ফলে এই দিবসের উদযাপনেও এসেছে বড় ধরণের ভিন্নতা। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার এক ঐতিহাসিক ও অভূতপূর্ব গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটে। এই পরিবর্তিত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের শাসন আমলে গত বছর ২০২৫ সালের মতো চলতি ২০২৬ সালের ৭ জুনও ঐতিহাসিক ৬ দফা দিবস উপলক্ষে সরকারি কিংবা বেসরকারি পর্যায়ে কোনো প্রকার আনুষ্ঠানিক কর্মসূচি বা বিশেষ রাষ্ট্রীয় আয়োজন গ্রহণ করা হয়নি।

রাজনৈতিক অঙ্গনে কার্যত কার্যক্রম নিষিদ্ধ বা নিষ্ক্রিয় থাকা দলটির পক্ষেও দেশজুড়ে কোনো সভা-সমাবেশ বা কর্মসূচি পালন করার খবর পাওয়া যায়নি। কোনো ধরনের আনুষ্ঠানিক ডামাডোল না থাকলেও বাংলাদেশের রাজনৈতিক বিবর্তন ও স্বাধিকার সংগ্রামের ইতিহাসে এই ৭ জুনের গুরুত্ব ও শহীদদের আত্মত্যাগ চিরকাল এক অনন্য মাইলফলক হিসেবে অক্ষুণ্ন থাকবে বলে মনে করেন দেশের ইতিহাসবিদ ও বিশিষ্টজনেরা।

জান্নাত সকালবেলা

মন্তব্য করুন