পদোন্নতির পরও বেতন কমার ঝুঁকি

প্রকাশ: শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৫:২৪ অপরাহ্ণ
পদোন্নতির পরও বেতন কমার ঝুঁকি

অনক আলী হোসেন শাহিদী: সরকারি চাকরিতে পদোন্নতি সাধারণত দায়িত্ব, পদমর্যাদা ও আর্থিক সুবিধা বৃদ্ধির সঙ্গে যুক্ত। কিন্তু বেতন কাঠামোর বিভিন্ন উপাদান—বিশেষ করে বাড়িভাড়া, চিকিৎসা, টিফিন ও অন্যান্য ভাতা—যদি গ্রেডভেদে এমনভাবে নির্ধারণ করা হয় যে উচ্চতর পদে পদোন্নতির পরও মোট মাসিক প্রাপ্তি কমে যায়, তাহলে তা কর্মীদের মধ্যে নতুন ধরনের বেতন-বৈষম্য তৈরি করতে পারে। পদোন্নতির উদ্দেশ্য ও আর্থিক ফলাফলের মধ্যে এ ধরনের অসামঞ্জস্য প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা ও কর্মীদের মনোবল—দুই ক্ষেত্রেই প্রশ্ন তৈরি করতে পারে।

সম্প্রতি প্রচারিত একটি বেতন কাঠামোর চিত্রে ১৪ থেকে ১৭ গ্রেডের জন্য বেসিক বেতন ও বিভিন্ন ভাতা যোগ করে মোট মাসিক প্রাপ্তির যে হিসাব দেখানো হয়েছে, তাতে বিষয়টি বিশেষভাবে দৃশ্যমান। তবে উল্লেখ্য, ছবিতে প্রদর্শিত কাঠামোটিকে সরকারি চূড়ান্ত প্রজ্ঞাপন হিসেবে ধরে নেওয়া ঠিক হবে না। বর্তমানে সরকারি কর্মচারীদের জন্য জাতীয় বেতনস্কেল-২০২৬ কার্যকর হয়েছে এবং এর প্রজ্ঞাপন ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ জারি হয়েছে।

একই পদোন্নতি, কিন্তু সব ক্ষেত্রে আর্থিক লাভ নয়

ছবিতে প্রদর্শিত হিসাব অনুযায়ী—১৪ গ্রেড: মোট ৩৫,৩৭৫ টাকা, ১৫ গ্রেড: মোট ৩৪,৪৩০ টাকা, ১৬ গ্রেড: মোট ৩৫,৪০৫ টাকা, ১৭ গ্রেড: মোট ৩৪,৬৮০ টাকা

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ অসামঞ্জস্য চোখে পড়ে। প্রচলিত গ্রেডক্রমে সংখ্যায় ছোট গ্রেড উচ্চতর। ফলে ১৬ গ্রেড থেকে ১৫ গ্রেডে পদোন্নতি হলে ছবির হিসাব অনুযায়ী মোট মাসিক প্রাপ্তি ৩৫,৪০৫ টাকা থেকে ৩৪,৪৩০ টাকায় নেমে যায়—অর্থাৎ প্রায় ৯৭৫ টাকা কমে যায়।

অন্যদিকে ১৫ থেকে ১৪ গ্রেডে গেলে মোট প্রাপ্তি ৩৪,৪৩০ টাকা থেকে ৩৫,৩৭৫ টাকায় বাড়ে। আবার ১৭ থেকে ১৬ গ্রেডে গেলে মোট প্রাপ্তি ৩৪,৬৮০ টাকা থেকে ৩৫,৪০৫ টাকায় বাড়ে।

অর্থাৎ একই কাঠামোর মধ্যে পদোন্নতির প্রতিটি ধাপে আর্থিক সুবিধা ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে না। এটি যদি বাস্তবে কোনো চূড়ান্ত বেতন কাঠামোর অংশ হয়, তাহলে বেতন-সমতা ও পদোন্নতির আর্থিক যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।

বেসিকের সঙ্গে ভাতার সম্পর্কই মূল বিষয়

এই সমস্যার মূল কারণ হতে পারে বেসিক বেতন এবং বিভিন্ন ভাতার পৃথক হারে নির্ধারণ। একজন কর্মচারীর মোট আয় শুধু মূল বেতন দিয়ে নির্ধারিত হয় না; বাড়িভাড়া, চিকিৎসা, টিফিন, যাতায়াত বা অন্যান্য ভাতার কাঠামোও মোট প্রাপ্তিতে বড় ভূমিকা রাখে।

ফলে কোনো গ্রেডে বেসিক সামান্য বেশি হলেও অন্য গ্রেডে বাড়িভাড়া বা নির্দিষ্ট ভাতার হার তুলনামূলক বেশি হলে মোট প্রাপ্তির ক্ষেত্রে উল্টো ফল তৈরি হতে পারে। সরকারের জাতীয় বেতনস্কেল-২০২৬ প্রণয়নের ক্ষেত্রেও বেতন, ভাতা ও অন্যান্য আর্থিক সুবিধাকে আরও যৌক্তিক ও সময়োপযোগী করার বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে বলে সরকারি সূত্রে জানানো হয়েছে।

পদোন্নতির আর্থিক সুফল নিশ্চিত করা জরুরি

পদোন্নতি কেবল পদবির পরিবর্তন নয়। এর সঙ্গে অধিক দায়িত্ব, জবাবদিহি, প্রশাসনিক ক্ষমতা এবং কর্মদক্ষতার প্রত্যাশা যুক্ত থাকে। তাই একজন কর্মচারী যখন নিম্নতর গ্রেড থেকে উচ্চতর গ্রেডে পদোন্নতি পান, তখন তাঁর মোট আর্থিক সুবিধা অন্তত আগের অবস্থানের তুলনায় যৌক্তিকভাবে বৃদ্ধি পাওয়া প্রত্যাশিত।

বিশেষ করে একই কর্মস্থলে একই ধরনের চাকরি করে কোনো কর্মচারী পদোন্নতির পর যদি দেখতে পান যে তাঁর হাতে পাওয়া মাসিক অর্থ আগের চেয়ে কমে গেছে, তাহলে সেটি ‘উল্টো আর্থিক প্রণোদনা’ হিসেবে কাজ করতে পারে। এর ফলে পদোন্নতি গ্রহণের ক্ষেত্রেও অনীহা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

‘গ্রস বেতন’ ও ‘বেসিক বেতন’ আলাদা করে দেখতে হবে

এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—বেতন কাঠামো Analyses করার সময় শুধু মোট মাসিক অঙ্ক তুলনা করলেই হবে না। বেসিক বেতন, বাড়িভাড়া, চিকিৎসা, টিফিন, মোবাইল বা অন্যান্য ভাতা কোন নিয়মে দেওয়া হবে, তার বিস্তারিত বিধানও দেখতে হবে।

সরকারি বেতন নির্ধারণের ক্ষেত্রে বর্তমানে iBAS++ ব্যবস্থায় জাতীয় বেতনস্কেল অনুযায়ী বেতন নির্ধারণ, উচ্চতর গ্রেড, পদোন্নতি ও বেতন পুনর্নির্ধারণের প্রক্রিয়া রয়েছে। তাই কোনো প্রস্তাবিত কাঠামো কার্যকর করার আগে পদোন্নতির আগে ও পরে একই কর্মচারীর মোট প্রাপ্য বেতন কত দাঁড়াবে—তার একটি ‘Pay Protection’ বা আর্থিক সুরক্ষা পরীক্ষা করা যেতে পারে।

২০২৬ সালের নতুন বেতন কাঠামোর প্রেক্ষাপট

এদিকে জাতীয় বেতনস্কেল-২০২৬ ইতোমধ্যে অনুমোদিত ও প্রজ্ঞাপিত হয়েছে। নতুন কাঠামো ১ জুলাই ২০২৬ থেকে কার্যকর করা হয়েছে এবং এতে ২০টি গ্রেড বহাল রাখা হয়েছে। সর্বনিম্ন গ্রেডে প্রারম্ভিক মূল বেতন ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ গ্রেডে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।

নতুন কাঠামোর বাস্তবায়নও ধাপে ধাপে হচ্ছে। ২০২৬ সালের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী গ্রেড ১০–২০-এর ক্ষেত্রে ২০২৬ সালের প্রথম পর্যায়ে বর্ধিত মূল বেেশনের ৫০ শতাংশ যোগ করার বিধান রাখা হয়েছে; পরবর্তী পর্যায়ে আরও বেশি অংশ কার্যকর হওয়ার কথা রয়েছে। এ কারণে কোনো গ্রেডভিত্তিক মোট বেতন তুলনা করার সময় নতুন বেতনস্কেলের সংশ্লিষ্ট গ্রেড, ধাপ, পদোন্নতিতে বেতন নির্ধারণের নিয়ম এবং প্রযোজ্য ভাতা—সবগুলো একসঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

বৈষম্য এড়াতে যে বিষয়গুলো বিবেচনা করা যেতে পারে

বিশেষজ্ঞ পর্যায়ে নীতিনির্ধারণের সময় কয়েকটি বিষয় বিবেচনা করা যেতে পারে— পদোন্নতির পর মোট প্রাপ্তি আগের চেয়ে কমে যাবে কি না—তা যাচাই করা। গ্রেড পরিবর্তনের কারণে কোনো ভাতা কমে গেলে বেসিক বা অন্য কোনো উপাদানে তার যৌক্তিক সমন্বয় করা। একই ধরনের দায়িত্বের পদগুলোর মধ্যে বেসিক ও মোট বেতনের সামঞ্জস্য রাখা। পদোন্নতিপ্রাপ্ত কর্মচারীর পূর্ববর্তী বেতন যেন নতুন গ্রেডে যাওয়ার কারণে অস্বাভাবিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়—সে জন্য বেতন সুরক্ষা বিধান বিবেচনা করা। নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের আগে বিভিন্ন গ্রেডের পদোন্নতি-পরবর্তী বেতন সিমুলেশন প্রকাশ করা। শুধু বেসিক নয়, গ্রস বেতন ও প্রকৃত হাতে পাওয়া অর্থ—দুই সূচকেই বেতন কাঠামোর প্রভাব পরীক্ষা করা।

একটি কার্যকর বেতন কাঠামোর উদ্দেশ্য শুধু বেতন বাড়ানো নয়; এর অন্যতম উদ্দেশ্য হওয়া উচিত গ্রেডের মর্যাদা, দায়িত্ব, পদোন্নতি এবং আর্থিক সুবিধার মধ্যে যৌক্তিক সামঞ্জস্য প্রতিষ্ঠা করা। পদোন্নতি যদি কোনো কোনো ক্ষেত্রে দায়িত্ব ও পদমর্যাদা বাড়ালেও মোট আর্থিক প্রাপ্তি কমিয়ে দেয়, তাহলে কাঠামোটির নকশা পুনরায় পরীক্ষা করার প্রয়োজন দেখা দিতে পারে।

ছবিতে প্রদর্শিত ১৪–১৭ গ্রেডের হিসাবটি যদি কোনো প্রস্তাবিত কাঠামোর উদাহরণ হয়, তাহলে সেটি চূড়ান্ত করার আগে ‘পদোন্নতি = আর্থিক সুবিধা বৃদ্ধি’—এই নীতিটি প্রতিটি গ্রেডে কার্যকর থাকে কি না, তা যাচাই করা গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বেতন কাঠামোর ন্যায্যতা শুধু সংখ্যার ব্যবধান দিয়ে নয়; একজন কর্মচারীর ক্যারিয়ারে এক গ্রেড থেকে পরবর্তী গ্রেডে যাওয়ার বাস্তব আর্থিক ফলাফল দিয়েও পরিমাপ করতে হয়।

এআইএল/সকালবেলা


মন্তব্য করুন