হারামাইনের সুরক্ষায় ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান
অনক আলী হোসেন শাহিদী: পবিত্র মক্কা ও মদিনাসহ সমগ্র সৌদি আরবের নিরাপত্তা, সার্বভৌমত্ব ও পবিত্র স্থানগুলোর সুরক্ষা নিশ্চিত করতে দলমত-নির্বিশেষে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়েছে বাংলাদেশ জমঈয়তে আহলে হাদিস। সংগঠনটির উদ্যোগে ঢাকাস্থ জাতীয় প্রেসক্লাবে ‘হারামাইন শরিফাইনের সুরক্ষায় হুথি সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে অবস্থান: আমাদের ঈমানি দায়িত্ব’ শীর্ষক এক জাতীয় সেমিনারে বক্তারা এ আহ্বান জানান। একই সঙ্গে সৌদি আরবের নিরাপত্তা রক্ষায় বাংলাদেশের কূটনৈতিক তৎপরতা আরও জোরদার করার দাবি জানান তাঁরা।
বাংলাদেশ জমঈয়তে আহলে হাদিসের সভাপতি ড. আব্দুল্লাহ ফারুকের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সেমিনারে প্রধান আলোচক হিসেবে বক্তব্য দেন সংগঠনটির সেক্রেটারি জেনারেল অধ্যাপক মোহাম্মদ আসাদুল ইসলাম। আলোচনায় অংশ নেন আনোয়ারুল ইসলাম জাহাঙ্গীর, ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ খান মাদানী, প্রফেসর ড. মোহাম্মদ রইসউদ্দিন, ড. মুহাম্মদ হারুন হোসাইন ও প্রফেসর ড. আহমাদুল্লাহ ত্রিশালী। এছাড়া বক্তব্য দেন আব্দুল্লাহিল হাদী, ড. ইব্রাহিম আব্দুল হালিম মাদানী, ড. মুজাফফর বিন মহসিন, অধ্যাপক ড. ইমাম হোসেন, সাইফুদ্দিন বেলাল মাদানী, প্রফেসর ড. মুসলেউদ্দিন ও দেওয়ান আব্দুর রহিম।
সেমিনারে বক্তারা বলেন, পবিত্র মক্কা ও মদিনা বিশ্বের কোটি কোটি মুসলমানের বিশ্বাস, ভালোবাসা ও গভীর ধর্মীয় আবেগের কেন্দ্র। এ দুই পবিত্র নগরীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সৌদি আরবের পাশাপাশি সমগ্র মুসলিম বিশ্বের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই হারামাইন শরিফাইনের সুরক্ষার প্রশ্নে মতপার্থক্য ভুলে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ অবস্থান নিতে হবে।
বক্তারা হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, পবিত্র মক্কা-মদিনা আক্রান্ত হলে তাঁরা বিশ্বব্যাপী জনমত গড়ে তুলতে ব্যাপক আন্দোলন গড়ে তুলবেন। তাঁদের মতে, পবিত্র স্থানগুলোর নিরাপত্তা বিঘ্নিত করার যেকোনো তৎপরতার বিরুদ্ধে শান্তিপূর্ণ, নীতিনিষ্ঠ ও কার্যকর প্রতিবাদ গড়ে তোলা জরুরি।
তাঁরা আরও বলেন, সৌদি আরবের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার সঙ্গে বাংলাদেশের ধর্মীয় অনুভূতি, অর্থনৈতিক স্বার্থ এবং প্রবাসী বাংলাদেশিদের জীবন-জীবিকা গভীরভাবে সম্পৃক্ত। সৌদি আরবে বাংলাদেশের প্রায় ৫০ লাখ মানুষ কর্মরত রয়েছেন বলে সেমিনারে উল্লেখ করা হয়। তাঁদের কর্মসংস্থান, পরিবারের আর্থিক নিরাপত্তা এবং দেশে বৈদেশিক মুদ্রা প্রবাহের সঙ্গে সৌদি আরবের স্থিতিশীলতার গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে।
বক্তারা বলেন, সৌদি আরবের নিরাপত্তার প্রশ্নকে শুধু ধর্মীয় অনুভূতির দৃষ্টিতে দেখলে চলবে না; বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ, অর্থনৈতিক নিরাপত্তা ও প্রবাসী কল্যাণের বিষয়টিও সমান গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করতে হবে।
সভাপতির বক্তব্যে ড. আব্দুল্লাহ ফারুক হুথি হামলায় সৌদি আরবের ক্ষয়ক্ষতির প্রসঙ্গ তুলে ধরে বিশ্ববাসীর প্রতি সৌদি আরবের নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় সোচ্চার হওয়ার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, হারামাইন শরিফাইনের সুরক্ষায় বাংলাদেশ জমঈয়তে আহলে হাদিস আন্তরিকভাবে কাজ করে যাচ্ছে এবং ভবিষ্যতেও এ প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখবে।
সৌদি আরবের পক্ষে বাংলাদেশ সরকারের দেওয়া বিবৃতিকে স্বাগত জানিয়ে তিনি বলেন, দুই দেশের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ও পারস্পরিক সহযোগিতার স্বার্থে সরকারের কূটনৈতিক তৎপরতা আরও কার্যকর করা প্রয়োজন। সৌদি আরবের নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের পক্ষে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরতে সরকারকে আরও সক্রিয় ভূমিকা রাখার আহ্বান জানান তিনি।
তাঁর মতে, কেবল বিবৃতি প্রদানেই সীমাবদ্ধ না থেকে কূটনৈতিক যোগাযোগ, দ্বিপক্ষীয় আলোচনা এবং আন্তর্জাতিক পরিসরে দায়িত্বশীল উদ্যোগের মাধ্যমে সৌদি আরবের প্রতি বাংলাদেশের সংহতি আরও সুদৃঢ় করা সম্ভব।
সেমিনারে বক্তারা সৌদি আরবে কর্মরত বাংলাদেশিদের অবদানের বিষয়টি বিশেষভাবে তুলে ধরেন। তাঁদের বক্তব্য অনুযায়ী, সৌদি আরব বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শ্রমবাজার। সেখানে কর্মরত বাংলাদেশিরা তাঁদের শ্রম ও দক্ষতার মাধ্যমে দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ককে শক্তিশালী করছেন। তাঁদের পাঠানো রেমিট্যান্স দেশের বৈদেশিক মুদ্রার জোগান, গ্রামীণ অর্থনীতি এবং অসংখ্য পরিবারের জীবনযাত্রায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
এ কারণে সৌদি আরবের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা বাংলাদেশের জন্য বহুমাত্রিক তাৎপর্য বহন করে। সৌদি আরবের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখা, প্রবাসীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং পারস্পরিক সহযোগিতা সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের পাশাপাশি রাজনৈতিক, সামাজিক ও ধর্মীয় সংগঠনগুলোরও ইতিবাচক ভূমিকা রাখার সুযোগ রয়েছে বলে মত দেন বক্তারা।
তাঁরা বলেন, সৌদি আরবের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ককে আরও দৃঢ় করতে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সংহতি ও বাস্তব সহযোগিতাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। একই সঙ্গে আঞ্চলিক উত্তেজনা ও নিরাপত্তা সংকটের ক্ষেত্রে দায়িত্বশীল অবস্থান গ্রহণ এবং শান্তিপূর্ণ কূটনৈতিক সমাধানের প্রতি সমর্থন জানানো জরুরি।
সেমিনারে বক্তাদের বক্তব্যে ধর্মীয় অনুভূতি, আন্তর্জাতিক সংহতি, প্রবাসী বাংলাদেশিদের নিরাপত্তা এবং দেশের অর্থনৈতিক স্বার্থকে একই সূত্রে যুক্ত করা হয়। তাঁদের মতে, পবিত্র মক্কা-মদিনার সুরক্ষা এবং সৌদি আরবের স্থিতিশীলতার প্রশ্নে বাংলাদেশের জনগণের সংহতি প্রকাশের পাশাপাশি সরকারের কার্যকর কূটনৈতিক উদ্যোগও গুরুত্বপূর্ণ।
বক্তারা সৌদি আরবের নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের প্রতি সম্মান প্রদর্শন, পবিত্র স্থানগুলোর সুরক্ষায় আন্তর্জাতিক জনমত গঠন এবং দুই দেশের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক আরও সুদৃঢ় করতে সবাইকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের আহ্বান জানান।
সেমিনারের মূল বার্তা—হারামাইন শরিফাইনের সুরক্ষায় মুসলিম বিশ্বের ঐক্য, সৌদি আরবের প্রতি সংহতি এবং বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ সংরক্ষণে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ এখন সময়ের দাবি।
এআইএল/সকালবেলা