'আগামী ১০০ বছরে আর কোনো গণ-অভ্যুত্থান হবে না'—রুমিন ফারহানা
আজ শনিবার (১১ জুলাই) দুপুরে রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবের তোফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া হলে আয়োজিত এক উচ্চপর্যায়ের আলোচনা সভায় বিশেষ অতিথির বক্তব্যে রুমিন ফারহানা এসব কথা বলেন। ‘গণ–অভ্যুত্থান পরবর্তী রাজনীতি: সংকট, সম্ভাবনা ও উত্তরণের পথ’ শীর্ষক এই গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা সভার আয়োজন করে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জেএসডি)।
বিগত চব্বিশের গণ-আন্দোলনের পরবর্তী রাজনৈতিক পরিস্থিতির সমালোচনা করে রুমিন ফারহানা বলেন, “গণ–অভ্যুত্থানে চব্বিশে মানুষের যে বহুল আকাঙ্ক্ষিত স্বপ্ন ছিল, তার জন্য দেশের সাধারণ মানুষ শেষবারের মতো নিজের জীবন বাজি রেখে রাজপথে নেমেছিল। কিন্তু চব্বিশ-পরবর্তী সময়ে মানুষ যখন দেখল—এই আন্দোলনের ফসল কতিপয় মানুষের নিজস্ব সম্পত্তিতে পরিণত হয়েছে, এটা আসলে বাংলাদেশে উগ্রবাদের নতুন উত্থান এবং অদ্ভুতভাবে কিছু ‘নেই’ থেকে রাতারাতি শতকোটি টাকার মালিক হয়ে যাওয়ার একটা নতুন প্রকল্প, তখন স্বাভাবিকভাবেই দেশের গণমানুষ ভবিষ্যতে এ রকম কোনো গণ–অভ্যুত্থানে যাওয়ার জন্য হাজারবার, লক্ষবার ও কোটিবার চিন্তা করবে।”
জাতীয় সংসদের এই স্বতন্ত্র সদস্য প্রশ্ন তুলে বলেন, চব্বিশের গণ–অভ্যুত্থানে হিজাব পরা এবং হিজাব ছাড়া আধুনিক নারীরা যেভাবে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সমানতালে অংশ নিয়েছিলেন, গণ–অভ্যুত্থানপরবর্তী সময়ে সেই প্রগতিশীল ও নিরাপদ পরিবেশ কেন রক্ষা করা গেল না? চব্বিশের সফল অভ্যুত্থানের ঠিক পরেই দেশের ঐতিহাসিক মুক্তিযুদ্ধের মুর্যাল ও ভাস্কর্যগুলো সুনির্দিষ্টভাবে কারা ভাঙল, সেই প্রশ্নও তোলেন তিনি। একই সঙ্গে একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধ আর চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানকে কেন উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে মুখোমুখি দাঁড় করানো হলো, সে বিষয়েও তিনি তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
রুমিন ফারহানা আরও মন্তব্য করেন, গণ–অভ্যুত্থানপরবর্তী সময়ে দেশে একটি ‘ভয়াবহ উগ্রবাদের উত্থান হয়েছে’। আন্দোলনের আগে যদি এই উগ্রবাদের কথা প্রকাশ পেত, তবে চব্বিশে কয়জন মানুষ রাজপথে বুক চিতিয়ে আন্দোলনে নামতেন, সেই প্রশ্নও তোলেন তিনি। ১৯৪৭ সালের দেশভাগ, ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং ৯০–এর স্বৈরাচারবিরোধী গণ–আন্দোলনের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট স্মরণ করে তিনি বলেন, “দেশের সাধারণ মানুষ বারবার দেশের জন্য রক্ত দিয়েছে এবং প্রতিবারই শেষ পর্যন্ত কতিপয় স্বার্থান্বেষী মহলের দ্বারা প্রতারিত হয়েছে।”
‘চব্বিশেও ব্যর্থ হয়েছি’
আলোচনা সভায় রাষ্ট্রসংস্কার আন্দোলনের সভাপতি হাসনাত কাইয়ুম বলেন, ’৪৭, ৭১ ও ৯০ সালের বড় বড় আন্দোলনের পরে জাতিগতভাবে দেশের সাধারণ মানুষ চরম প্রতারিত হয়েছিল। চব্বিশের গণ–অভ্যুত্থানের পরে যাতে মানুষ আর প্রতারিত না হয়, সে ব্যাপারে আমরা সর্বোচ্চ সতর্ক থাকলেও শেষ পর্যন্ত আমরা আবারও ব্যর্থ হয়েছি।
তিনি দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, প্রতিবারের মতো এবারও আন্দোলনপরবর্তী অংশীজন ও রাজনৈতিক শক্তিগুলোর মধ্যে কৃত্রিম বিভাজনের অপচেষ্টা চলছে। এমনকি যারা নতুন ধারার রাজনীতির কথা বলছিলেন, তাঁরাও আজ বিভক্ত হয়ে পড়েছেন। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “কয়েকটা সংসদের আসনের জন্য কেউ বিএনপির দিকে, অথবা রাষ্ট্র সংস্কারের দোহাই দিয়ে মাত্র কয়েকটা আসনের লোভে কেউ জামায়াতের দিকে ঝুঁকে চলে গেলেন।” তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের পর ১২টি সংস্কার কমিশন গঠন করা হলেও পরবর্তীতে তা একটি ‘ঐক্যমত কমিটিতে’ সীমিত করে জনগণের বৈপ্লবিক আকাঙ্ক্ষাকে ছোট করা হয়েছে। জুলাই সনদ আর রাষ্ট্র পুনর্গঠনের মূল প্রস্তাবনাগুলো বাস্তবায়ন করা এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
‘জন–আকাঙ্ক্ষা এখনো উপেক্ষিত’
আলোচনা সভায় সভাপতির বক্তব্যে জেএসডির জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি তানিয়া রব বলেন, চব্বিশ–পরবর্তী সময়ে দেশের গণমানুষের বহুল আকাঙ্ক্ষিত যে সাম্য ও বৈষম্যহীন নতুন বাংলাদেশ গড়ার কথা ছিল, তা এখনো সম্পূর্ণ উপেক্ষিত রয়ে গেছে। সংস্কারের এই মৌলিক জন–আকাঙ্ক্ষা পুরোপুরি অর্জিত না হলে বাংলাদেশ রাষ্ট্র হিসেবে বারবার হোঁচট খাবে।
সভায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন জেএসডির সাধারণ সম্পাদক শহীদ উদ্দিন মাহমুদ। তিনি বলেন, একটি গণ–অভ্যুত্থান মাঠপর্যায়ে সংগঠিত করা যতটাই সহজ, অভ্যুত্থানের মূল চেতনা ও অঙ্গীকার বাস্তবে রূপায়ন করা ততটাই কঠিন। তাই জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের অঙ্গীকার বাস্তবায়নে বাংলাদেশের সামনে এখন রাষ্ট্র পুনর্গঠনের একটি বিরল সুযোগ রয়েছে, যা হেলায় হারানো যাবে না। আলোচনা সভায় অন্যান্যের মধ্যে আরও বক্তব্য দেন বিশিষ্ট রাজনৈতিক বিশ্লেষক হেলালুজ্জামান আহমেদ, জেএসডির সহসভাপতি নুরুল আখতার, সিরাজ মিয়া প্রমুখ।
|