চিকিৎসকের আন্তরিক আচরণ রোগীকে অর্ধেক সুস্থ করে দেয়: স্বাস্থ্যমন্ত্রী

প্রকাশ: শনিবার, ১১ জুলাই ২০২৬, ০৫:৩৫ অপরাহ্ণ
চিকিৎসকের আন্তরিক আচরণ রোগীকে অর্ধেক সুস্থ করে দেয়: স্বাস্থ্যমন্ত্রী
অনলাইন ডেস্ক ঃ দেশের চিকিৎসকদের শুধু রোগ নিরাময়ের গতানুগতিক গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ না থেকে সর্বোচ্চ মানবিকতা, নৈতিকতা ও নিঃস্বার্থ সেবার মানসিকতা নিয়ে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন। তিনি বলেছেন, “একজন চিকিৎসকের হাসিমুখে আন্তরিকভাবে কথা বলা একজন রোগীকে মানসিকভাবে অর্ধেক সুস্থ করে দিতে পারে। তাই প্রেসক্রিপশনের ওষুধের পাশাপাশি রোগীদের সঙ্গে সর্বোচ্চ আন্তরিক, সংবেদনশীল ও মানবিক আচরণ নিশ্চিত করতে হবে।”

আজ শনিবার (১১ জুলাই) দেশের ঐতিহ্যবাহী চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান ‘ঢাকা মেডিকেল কলেজ’-এর ৮১তম গৌরবোজ্জ্বল প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত এক বিশেষ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, চিকিৎসকের এই পবিত্র পেশাটি শুধু একটি সাধারণ চাকরি বা জীবিকা নির্বাহের মাধ্যম নয়; এটি সরাসরি মানুষের জীবনের সঙ্গে জড়িত একটি মহান ও মানবিক সেবা। মানুষ যখন জীবনের সবচেয়ে কঠিন ও অসহায় সময়ে অসুস্থ হয়ে পড়ে, তখন পরম করুণাময় আল্লাহর পর একজন চিকিৎসকের ওপরই পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি ভরসা ও বিশ্বাস স্থাপন করে।

তিনি চিকিৎসকদের উদ্দেশে বলেন, জীবনে শুধু বস্তুগত সুবিধা গ্রহণ নয়, বরং মানুষের জন্য কল্যাণকর কিছু করার মানসিকতা হৃদয়ে গড়ে তুলতে হবে। এ সময় নিজের পূর্বতন ব্যাংকিং জীবনের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথা স্মরণ করে তিনি জানান, চাকরির শুরুতে প্রতি মাসে তাঁদের বেতনের একটি নির্দিষ্ট অংশ সমাজের সুবিধাবঞ্চিত মানুষের কল্যাণে ব্যয় করতে উৎসাহিত করা হতো। সেই প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা থেকেই তিনি গভীরভাবে উপলব্ধি করেছেন যে, মানুষের জন্য নিঃস্বার্থভাবে কাজ করার মধ্যেই জীবনের প্রকৃত তৃপ্তি ও সার্থকতা লুকিয়ে রয়েছে।

সরদার সাখাওয়াত হোসেন বলেন, তরুণ ও প্রবীণ চিকিৎসকদের মধ্যে মেডিকেল এথিক্স ও নৈতিক মূল্যবোধের চর্চা আরও জোরদার করতে হবে। রোগীদের গভীর ভালোবাসা, সহানুভূতি ও পরম সম্মানের সঙ্গে চিকিৎসাসেবা প্রদান করলে তা রোগীর দ্রুত সুস্থতায় অত্যন্ত ইতিবাচক ও মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব ফেলে।

দেশের বিভিন্ন সংকটে চিকিৎসকদের গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকার প্রশংসা করে মন্ত্রী বলেন, বিগত করোনা মহামারি, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের হাম পরিস্থিতি এবং সাম্প্রতিক ভয়াবহ বন্যায় আমাদের দেশের চিকিৎসকেরা দায়িত্বশীলতার এক উজ্জ্বল ও অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। তাঁরা নিজেদের ব্যক্তিগত ছুটি ও পরিবারের কথা উপেক্ষা করে উপদ্রুত ও দুর্গত মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে দিনরাত চিকিৎসাসেবা দিয়েছেন। বিশেষ করে চট্টগ্রামে সাম্প্রতিক বন্যার সময় গভীর রাতেও চিকিৎসকদের মাঠপর্যায়ে অক্লান্ত কাজ করার বিষয়টি উল্লেখ করে তিনি বলেন, এটিই মূলত একজন প্রকৃত চিকিৎসকের দায়িত্ববোধ, পেশাদারত্ব ও নৈতিকতার আসল পরিচয়।

স্বাস্থ্যখাতে সরকারের উন্নয়ন পরিকল্পনা তুলে ধরে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, বর্তমান সরকার দেশের স্বাস্থ্যখাতকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা স্বাস্থ্যখাতে এ যাবৎকালের সর্বোচ্চ বাজেট বরাদ্দ দিয়েছেন। চিকিৎসা শিক্ষা ও গবেষণার মান আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উন্নীত করার জন্য প্রয়োজনীয় সব ধরনের আধুনিক যন্ত্রপাতি সরকারি হাসপাতালগুলোতে সরবরাহ করা হচ্ছে। উদাহরণ হিসেবে তিনি জানান, একটি মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থীদের সামান্য আবেদনের পরই অত্যন্ত অল্প সময়ের মধ্যে প্রায় ৮০ থেকে ৯০ লাখ টাকা সরকারি ব্যয়ে একটি সর্বাধুনিক মাইক্রোস্কোপ সেখানে সরবরাহ করা হয়েছে।

তিনি আরও ঘোষণা দেন, দেশের তৃণমূল পর্যায়ের কমিউনিটি ক্লিনিক, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এবং ইউনিয়ন পরিবারকল্যাণ কেন্দ্রগুলোকে আরও আধুনিক ও উন্নত সুযোগ-সুবিধা সম্পন্ন করা হবে, যার বাস্তবমুখী উন্নয়ন কার্যক্রম আগামী মাস থেকেই দেশজুড়ে শুরু হতে যাচ্ছে। রাজধানী ও গ্রামাঞ্চলের বিদ্যমান স্বাস্থ্যসেবার বৈষম্য সম্পূর্ণ দূর করে সারা দেশে সমমানের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করাই এই সরকারের মূল লক্ষ্য।

গ্রাম ও শহরের চিকিৎসাসেবার সমতার ওপর জোর দিয়ে তিনি চিকিৎসকদের উদ্দেশে বলেন, “ঢাকা শহরের একজন মানুষ যেভাবে সরকারিভাবে মানসম্মত ও আধুনিক চিকিৎসাসেবা পাওয়ার সাংবিধানিক অধিকার রাখেন, ঠিক একইভাবে প্রত্যন্ত গ্রামের একজন সাধারণ মানুষও সমমানের সেবা পাওয়ার সমান দাবিদার। দেশের প্রতিটি নাগরিকের জন্য সমান মানের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে আমাদের সবাইকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে।”

সরদার সাখাওয়াত হোসেন আশ্বাস দেন যে, চিকিৎসকদের পেশাগত ও বিভিন্ন যৌক্তিক দাবিদাওয়া সরকার পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়ন করছে এবং ভবিষ্যতেও তা সহানুভূতির সাথে করবে। তবে সেবাদানের ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি বা কোনো ধরনের অবহেলা ও বিলম্ব কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হবে না। চিকিৎসক হিসেবে রাষ্ট্রীয় সনদ অর্জনের পর থেকেই দেশের জনগণের সেবায় নিজেদের সম্পূর্ণরূপে আত্মনিয়োগ করতে হবে। তিনি পরিশেষে চিকিৎসকদের সময়নিষ্ঠা, পেশাগত নৈতিকতা ও মানবিক আচরণের ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করে বলেন, এই গুণাবলি বজায় থাকলে দেশের সাধারণ মানুষের কাছে চিকিৎসকেরা আরও বেশি সম্মানিত, নিরাপদ ও শ্রদ্ধেয় হয়ে উঠবেন।

মন্তব্য করুন