মুহসিন মোল্লা: সমাজবিজ্ঞান ও অপরাধবিজ্ঞানের সাধারণ একটি তত্ত্ব হলো—ধর্মীয় অনুশাসন, বিশ্বাস এবং বিশেষ ধর্মীয় পর্বগুলো সমাজে অপরাধ নিয়ন্ত্রণে শক্তিশালী অনুঘটক হিসেবে কাজ করে। এই তত্ত্বের ভিত্তিতে প্রচলিত ধারণা হলো, পবিত্র রমজান মাসে মানুষের আত্মনিয়ন্ত্রণ, সংযম ও আধ্যাত্মিক চর্চা বৃদ্ধির কারণে সমাজে সার্বিক অপরাধের হার উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পায়।
গবেষণায় দেখা যায়, এ মাসে চুরি, ছিনতাই, দাঙ্গা বা খুনের মতো সাধারণ অপরাধ ১৫ থেকে ২০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যায়। কিন্তু লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা এবং ধর্ষণের মতো অপরাধগুলোকে কি এই একই সমীকরণে মাপা সম্ভব? বিগত ৫ বছরের (২০২১-২০২৫) পরিসংখ্যান ও অপরাধতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ বলছে ভিন্ন কথা। সাধারণ অপরাধ কমলেও, দেশের চার দেয়ালের ভেতরে বা বাইরে নারীর শরীরের ওপর পুরুষতান্ত্রিক আধিপত্য বিস্তারের জঘন্য অপরাধটি ধর্মীয় সংযমের প্রভাবে হ্রাস পাচ্ছে না।
সাধারণ অপরাধের নিম্নগামী প্রবণতা বনাম ধর্ষণের বাস্তবতা গবেষকদের মতে, রমজান মাসে শারীরিক ক্লান্তি, উপবাস এবং আধ্যাত্মিক পরিবর্তনের কারণে মানুষের মধ্যে সহিংস অপরাধ সংঘটনের সক্ষমতা প্রাকৃতিকভাবেই কমে যায়। চুরির মতো অপরাধ ক্ষেত্রবিশেষে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যাওয়ার প্রমাণ রয়েছে। কিন্তু মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মাসিক ও বার্ষিক পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, রমজান মাসে ধর্ষণের হার সামগ্রিকভাবে হ্রাস পায় না; বরং অন্যান্য মাসের মতোই স্থিতিশীল থাকে এবং আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক সংকটের সময়ে তা ভয়াবহভাবে বৃদ্ধি পায়।
বাংলাদেশ পিস অবজারভেটরি (BPO) এবং ইউএনডিপি (UNDP)-এর গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশে লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা সাধারণত সেপ্টেম্বর-অক্টোবর মাসে সর্বোচ্চ চূড়ায় পৌঁছায়। তবে রমজান মাসে (যা গত ৫ বছরে মার্চ-মে মাসে আবর্তিত হয়েছে) এই হার সাধারণ অপরাধের মতো নাটকীয়ভাবে নিচে নামে না।
বিগত ৫ বছরের (২০২১-২০২৫) চালচিত্র মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক), বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ এবং ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী গত ৫ বছরের চিত্র অত্যন্ত উদ্বেগজনক:
২০২১ (মহামারী কাল): কোভিড-১৯ লকডাউনের কারণে সাধারণ অপরাধ কমলেও গার্হস্থ্য সহিংসতা ও যৌন নির্যাতন ব্যাপক আকার ধারণ করে। এ বছরের প্রথম ১০ মাসে অন্তত ১,১৭৮ জন নারী ধর্ষণের শিকার হন।
২০২২ (শিশু ধর্ষণের ভয়াবহতা): এই বছরের প্রথম ১০ মাসে ৮৩০ জন নারী ও শিশু ধর্ষণের শিকার হয়। এর মধ্যে ২৯০ জনই ছিল ১৮ বছরের কম বয়সী শিশু।
২০২৩ ও ২০২৪ (রাজনৈতিক অস্থিরতা ও প্রাতিষ্ঠানিক শূন্যতা): ২০২৩ সালে ৫৩৯ জন নারী ধর্ষণের শিকার হন। ২০২৪ সালের আগস্টে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ব্যাপক অবনতি ঘটে। মহিলা পরিষদের তথ্যমতে, ২০২৪ সালে ৫২৮ জন নারী ও কন্যাশিশুকে হত্যা করা হয়।
২০২৫ (রমজানে চরম অবনতি): ২০২৫ সালের মার্চ মাসে (রমজান) দেশে যৌন সহিংসতার এক ভয়াবহ সুনামি আঘাত হানে। ইউনিসেফের তথ্যমতে, ১ জানুয়ারি থেকে ১৬ মার্চ পর্যন্ত প্রায় ৫০টি শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। শুধুমাত্র ১০ মার্চ (রমজান চলাকালীন) একদিনেই ৭টি শিশু খুন এবং ৬টি ভয়াবহ যৌন সহিংসতার ঘটনা নিশ্চিত করা হয়।
রমজানেও কেন কমছে না ধর্ষণ? অপরাধবিজ্ঞানীদের মতে, ধর্ষণ কোনো সাধারণ 'পাবলিক ক্রাইম' বা অর্থনৈতিক প্রয়োজনে সংঘটিত অপরাধ নয়। এটি চরম পিতৃতান্ত্রিক আধিপত্যের চর্চা। এর পেছনে বেশ কয়েকটি সামাজিক, কাঠামোগত ও নৈতিক কারণ রয়েছে:
১. পুরুষতান্ত্রিক 'অধিকারবোধ' (Male Entitlement): ইউএন উইমেনের এক জরিপে দেখা গেছে, দেশের ৭৭% শহুরে এবং ৮১% গ্রামীণ পুরুষ মনে করে ‘যৌনতা পুরুষের জন্মগত অধিকার’। ৮৯.২% শহুরে পুরুষ বিশ্বাস করে, কোনো নারী শারীরিকভাবে প্রতিরোধ না করলে সেটি আদৌ ধর্ষণ নয়। এই কাঠামোগত নারীবিদ্বেষী মানসিকতা প্রমাণ করে যে, ধর্মীয় উপবাস এই গভীরে প্রোথিত আধিপত্যকামী মনস্তত্ত্বকে পরিবর্তন করতে ব্যর্থ।
২. বিচারহীনতার সংস্কৃতি ও আইনি ব্যর্থতা: সমাজে বিচার ব্যবস্থার চরম সংকট ও বিচারহীনতা অপরাধীদের বেপরোয়া করে তুলেছে। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের তথ্য অনুযায়ী, ধর্ষণের মামলায় সাজা প্রদানের হার মাত্র ২ শতাংশ। ৯৮ শতাংশ ক্ষেত্রেই অপরাধীরা আইনি ফাঁকফোকর, দীর্ঘসূত্রিতা এবং সাক্ষীর অভাবে পার পেয়ে যায়।
৩. 'মব জাস্টিস' ও মরাল পুলিশিং: ২০২৪-২৫ সালে জনপরিসরে নিরাপত্তাহীনতা চরম আকার ধারণ করে। রমজান মাসে ‘মরাল পুলিশিং’-এর নামে নারীদের পোশাক ও চলাফেরার ওপর আক্রমণাত্মক নজরদারি পরোক্ষভাবে নারীবিদ্বেষকে উসকে দেয়। এর ফলে ভিকটিম ব্লেমিং (Victim Blaming) বা ভুক্তভোগীকেই দোষারোপ করার সংস্কৃতি তৈরি হয়, যা প্রকারন্তরে ধর্ষকদেরই সুরক্ষা দেয়।
৪. ধর্মের প্রকৃত শিক্ষার অভাব ও নৈতিক অবক্ষয়: রমজান মাসে বাহ্যিকভাবে উপবাস ও ধর্মীয় আচার পালন করা হলেও, সমাজে ধর্মের প্রকৃত শিক্ষা—যেমন আত্মশুদ্ধি, নৈতিকতা ও দৃষ্টি অবনত রাখার চর্চা চরমভাবে অনুপস্থিত। ধর্মীয় মূল্যবোধের এই অবক্ষয় সমাজকে ভেতর থেকে ফাঁপা করে দিচ্ছে।
৫. সামাজিক রীতিনীতি ও বিবাহ ব্যবস্থাকে কঠিন করে তোলা: আমাদের সমাজে বর্তমানে বিবাহ ব্যবস্থাকে আর্থিকভাবে অত্যন্ত কঠিন ও জটিল করে তোলা হয়েছে। যৌতুক, লোকদেখানো খরচ এবং প্রতিষ্ঠিত হওয়ার অতিরিক্ত সামাজিক চাপের কারণে তরুণদের বিয়ের বয়স ক্রমাগত বাড়ছে, যা যুবসমাজের মধ্যে এক ধরনের হতাশা ও নৈতিক স্খলনের পথ প্রশস্ত করছে।
৬. পর্নোগ্রাফি ও অ্যাডাল্ট কনটেন্টের সহজলভ্যতা: ইন্টারনেট ও স্মার্টফোনের যুগে পর্নোগ্রাফি ও অ্যাডাল্ট কনটেন্ট অত্যন্ত সহজলভ্য হয়ে গেছে। এই ধরনের বিকৃত কনটেন্টের অবাধ প্রবাহ তরুণদের মনস্তত্ত্বে নারীর প্রতি সম্মানবোধ নষ্ট করছে এবং যৌন সহিংসতাকে স্বাভাবিক হিসেবে উপস্থাপন করে ধর্ষণের মতো অপরাধকে উসকে দিচ্ছে।
উত্তরণের পথ গবেষণা প্রতিবেদনের উপসংহারে বলা হয়েছে, শুধুমাত্র ক্যালেন্ডারের পাতা উল্টে বা মাসের নাম পরিবর্তন করে ধর্ষণ ও নারী নির্যাতন নির্মূল করা কখনোই সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন রাষ্ট্রের কাঠামোগত ও বৈপ্লবিক পরিবর্তন। বিচারব্যবস্থায় সাজা প্রদানের হার বাড়ানো, সাক্ষ্য আইনের অবমাননাকর ধারা বাতিল সেই সঙ্গে বিবাহ ব্যবস্থাকে সহজ করা, ডিজিটাল মাধ্যমে পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ এবং শিক্ষাব্যবস্থা ও সামাজিক সচেতনতার মাধ্যমে পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতার মূলে কুঠারাঘাত করতে হবে।
এম.এম/সকালবেলা