অভিযোগ ছাড়া চাঁদাবাজির মামলা করতে পারবে পুলিশ, আইন সংস্কার হচ্ছে: আইজিপি

প্রকাশ: শনিবার, ২৪ অক্টোবর ২০২৬, ০৪:২১ অপরাহ্ণ
অভিযোগ ছাড়া চাঁদাবাজির মামলা করতে পারবে পুলিশ, আইন সংস্কার হচ্ছে: আইজিপি
খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের (কেএমপি) অনুষ্ঠানে গণমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে বক্তব্য রাখছেন বাংলাদেশ পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকির।

নিজস্ব প্রতিবেদক: চাঁদাবাজ ও প্রভাবশালীদের ভয়ে সাধারণ মানুষ বা ভুক্তভোগী অভিযোগ করতে সাহস না পেলেও এখন থেকে পুলিশ নিজেই উদ্যোগী হয়ে মামলা করে অপরাধীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিতে পারবে। এই লক্ষ্যে নতুন আইন প্রণয়ন এবং প্রচলিত আইনের প্রয়োজনীয় সংস্কার করার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।

আজ শনিবার (২৪ অক্টোবর) দুপুরে খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের (কেএমপি) পুলিশ লাইন্সে আয়োজিত 'খুলনা বিভাগের কমিউনিটি পুলিশিংবিষয়ক সুধী সমাবেশ' শেষে সাংবাদিকদের ব্রিফিংকালে এসব কথা জানান বাংলাদেশ পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকির। তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন, খুব অল্প সময়ের মধ্যেই এ বিষয়ে একটি কার্যকর ও নতুন আইন পাস হতে পারে।

ব্রিফিংকালে আইজিপি অত্যন্ত স্পষ্ট করে বলেন, “চাঁদাবাজদের অনেকেই রাজনৈতিক বা স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি ও নামকরা সন্ত্রাসীদের ছত্রচ্ছায়ায় থেকে নিয়মিত চাঁদাবাজি করে আসছে। ফলে সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ীরা ভয়ে তাদের বিরুদ্ধে পুলিশের কাছে লিখিত অভিযোগ দিতে চায় না, আদালতেও সাক্ষী হতে চায় না। এই ভীতিকর পরিস্থিতি চিরতরে মোকাবিলা করতে এবং ভুক্তভোগীদের নিরাপত্তা দিতেই পুলিশ যাতে নিজস্ব এখতিয়ারে মামলা করে ব্যবস্থা নিতে পারে, সে বিষয়ে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার (মন্ত্রীর) সঙ্গে সমন্বয় করে আইনি প্রস্তাব তৈরি করা হয়েছে।”

অপরাধ দমনে পুলিশের দ্বিমুখী সমালোচনা প্রসঙ্গে স্বর উঁচিয়ে মো. আলী হোসেন ফকির বলেন, “অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ বা বল প্রয়োগ করলে পুলিশকে অহেতুক 'ফ্যাসিবাদী' আখ্যা দেওয়া হয়, আবার পেশাদারত্ব বজায় রেখে শিথিলতা দেখালে 'দুর্বল' বলে মেহনেতি মানুষ গালমন্দ করেন। আমরা এই দ্ব্যর্থবোধক পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে একটি জনবান্ধব ও কার্যকর পুলিশি ব্যবস্থার মাধ্যমে সমাজে স্থায়ী শান্তি ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে বদ্ধপরিকর।”

তিনি আরও সংযোজন করেন, “বর্তমানে মাদক, কিশোর গ্যাং, উগ্র সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে সমগ্র বাংলাদেশে সমন্বিত যৌথ অভিযান পরিচালিত হচ্ছে। আধুনিক যুগের সাথে তাল মিলিয়ে পুলিশি তৎপরতা আরও গতিশীল ও বস্তুনিষ্ঠ করতে আইনি কাঠামোর পরিবর্তন আনা হচ্ছে। নতুন কাঠামোয় কমিউনিটি পুলিশিং পুলিশের মূল ব্যবস্থার একটি কার্যকর সহযোগী শাখা হিসেবে সরাসরি ভূমিকা রাখবে।”

দেশের মাদক পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে আইজিপি বলেন, “বিগত দীর্ঘ ১৭ বছরে মাদকের আন্তর্জাতিক সিন্ডিকেট ও সামাজিক বিস্তারকে এমনভাবে স্বাভাবিক রূপ দেওয়া হয়েছে, যা সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকে গেছে। তবে বর্তমান সরকার যেকোনো মূল্যে মাদকের বিরুদ্ধে 'জিরো টলারেন্স' নীতি অনুসরণ করছে। দেশ থেকে মাদক, কিশোর গ্যাং ও চাঁদাবাজির উৎখাত ঘটাতে জনগণকে পুলিশের পাশে দাঁড়াতে হবে।”

৫ আগস্টের পরিবর্তিত পরিস্থিতি এবং পরবর্তী আইনশৃঙ্খলা নিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, “সেই বিশেষ সময়ে পুলিশি কার্যক্রম স্তব্ধ থাকায় বিভিন্ন স্থানে কিছু দুষ্কৃতকারী বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করেছিল। তবে বর্তমানে দেশের সব স্থানে পুলিশের নিয়মিত টহল ও আইনি কার্যক্রম পূর্ণদ্যোমে ফিরে এসেছে। বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ দেশ এবং বেকারত্বসহ বহু সামাজিক জটিলতা এখানে রয়েছে। তাই সব সমস্যা একদিনে জাদুকরী উপায়ে সমাধান করা কঠিন, তবে সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অভাবনীয় উন্নতি হয়েছে।”

সাধারণ নাগরিক ও পেশাজীবীদের উদ্দেশ্যে আইজিপি বলেন, “পুলিশকে শুধুই সমালোচনার পাত্র না বানিয়ে গঠনমূলক পরামর্শ দিন। আমরা সত্যিই মানবিক ও আধুনিক সেবা দানকারী প্রতিষ্ঠানে রূপ নিতে চাই। তবে চরম সত্য হলো, অনেক ক্ষেত্রে ভয়ঙ্কর অপরাধীদের ধরে আদালতে চালান করার কয়েকদিনের মাথায় তারা জামিনে বেরিয়ে এসে পুনরায় একই অপরাধে জড়িয়ে পড়ে। এই ধরনের পেশাদার অপরাধীদের পুরোপুরি নিস্তেজ করার লক্ষ্যে শিগগিরই স্থায়ী নীতিগত সংস্কার আনা হচ্ছে।”

কেএমপি কমিশনার মো. সাজ্জadur রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই সুধী সমাবেশে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন খুলনা রেঞ্জের ডিআইজি মো. রেজাউল করিম এবং খুলনা পুলিশ ট্রেনিং সেন্টারের (পিটিসি) কমান্ড্যান্ট এ কে এম মোশাররফ হোসেন মিয়াজীসহ অন্যান্য উচ্চপদস্থ সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তারা।