স্থানীয় সরকার বিভাগে সচিব হিসেবে মোঃ শহিদুল হাসানের নিয়োগঃ দূরদর্শী সিদ্ধান্তে নতুন প্রত্যাশা

স্থানীয় সরকার বিভাগে সচিব হিসেবে মোঃ শহিদুল হাসানের নিয়োগঃ দূরদর্শী সিদ্ধান্তে নতুন প্রত্যাশা


অনক আলী হোসেন শাহিদীঃ
দেশের স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার উন্নয়ন ও গ্রামীণ অবকাঠামো বিকাশে নতুন আশার সঞ্চার করেছে স্থানীয় সরকার বিভাগে সচিব হিসেবে অভিজ্ঞ প্রকৌশলী মোঃ শহিদুল হাসানের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ। রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের জারি করা প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে তাকে এক বছরের জন্য এই গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ দেওয়া হয় এবং গত ৫ মার্চ তিনি নতুন কর্মস্থলে যোগদান করেন। 

দেশের অন্যতম বৃহৎ ও গুরুত্বপূর্ণ এই মন্ত্রণালয়ে একজন দক্ষ, সৎ ও অভিজ্ঞ প্রশাসনিক ব্যক্তিত্বকে দায়িত্ব দেওয়ায় সরকারকে অভিনন্দন জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট মহল।

প্রকৌশলী মোঃ শহিদুল হাসান ১৯৫১ সালে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৭৫ সালে তিনি সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন এবং কর্মজীবনের শুরুতেই উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে নিজেকে যুক্ত করেন। প্রথমদিকে ওয়ার্কস প্রোগ্রামের অধীনে নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে কর্মজীবন শুরু করে পরবর্তীতে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)-এ যোগ দেন। এলজিইডির প্রতিষ্ঠাতা প্রধান প্রকৌশলী মরহুম প্রকৌশলী কামরুল ইসলাম সিদ্দিকীর নেতৃত্বে কাজ করার সুযোগ তার কর্মজীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। তাদের দূরদর্শী নেতৃত্ব, সততা ও নিষ্ঠার ফলে এলজিইডি সারাদেশে গ্রামীণ সড়ক, সেতু, হাট-বাজার ও পানি ব্যবস্থাপনাসহ বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে দেশের অবকাঠামো উন্নয়নে এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।

প্রকৌশলী শহিদুল হাসান দীর্ঘ প্রায় সাড়ে সাত বছর এলজিইডির প্রধান প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০০০ সালের ১০ ডিসেম্বর তিনি এই পদে যোগদান করেন এবং ২০০৮ সালের ২৭ জুন অবসর গ্রহণ পর্যন্ত দায়িত্বে বহাল ছিলেন। তার নেতৃত্বে এলজিইডি গ্রাম, শহর ও পানি সম্পদ খাতে ব্যাপক অবকাঠামোগত উন্নয়ন সাধন করে। অনেকেই সেই সময়টিকে এলজিইডির “স্বর্ণযুগ” বলে উল্লেখ করেন। তিনি প্রতিষ্ঠানটিকে আধুনিকায়ন ও গতিশীল করতে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থার সঙ্গে কার্যকর যোগাযোগ গড়ে তোলেন। এর ফলে বিপুল বৈদেশিক তহবিল সংগ্রহ, নতুন প্রকল্প প্রণয়ন এবং দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে উন্নয়ন কার্যক্রম সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি অর্জিত হয়।

তার কর্মজীবনে সততা, দক্ষতা ও পেশাদারিত্বের পরিচয় সুস্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নে অসামান্য অবদানের জন্য তিনি ২০০০ সালে জসীমউদ্দীন স্বর্ণপদক, ১৯৯৯–২০০০ সালে অতীশ দীপঙ্কর স্বর্ণপদক এবং ২০০০ সালে সাংবাদিক মোনাজাত উদ্দিন স্বর্ণপদকে ভূষিত হন। এছাড়া তিনি যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রে পেশাগত উচ্চতর শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন এবং ইউরোপ, আমেরিকা ও এশিয়ার বিভিন্ন দেশে সেমিনার, ওয়ার্কশপ ও উন্নয়ন আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন। তিনি ইনস্টিটিউশন অব ইঞ্জিনিয়ার্স, বাংলাদেশ-এর ফেলো এবং আমেরিকান সোসাইটি অব সিভিল ইঞ্জিনিয়ার্স-এর সদস্য।

স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে জনমনে নানা সমালোচনা ও অভিযোগ প্রচলিত ছিল। এমন প্রেক্ষাপটে একজন সৎ, পরিশ্রমী ও অভিজ্ঞ প্রশাসককে সচিব হিসেবে নিয়োগ দেওয়া নিঃসন্দেহে একটি সময়োপযোগী ও দূরদর্শী সিদ্ধান্ত। অতীতে এলজিইডিতে তার নেতৃত্বে শৃঙ্খলা, দক্ষতা ও স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল—যা প্রতিষ্ঠানটিকে একটি পেশাদার ও সেবাধর্মী সংস্থায় রূপ দিতে সহায়তা করে।
বিশেষ করে ২০০৭ সালের সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় দেশের বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানে নানা ধরনের প্রশাসনিক চাপ ও অনিশ্চয়তা দেখা দিলেও এলজিইডি তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল ছিল। সেই সময় প্রধান প্রকৌশলী হিসেবে প্রকৌশলী শহিদুল হাসান দক্ষতা, বিচক্ষণতা ও সাহসিকতার সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম পরিচালনা করেন। তার নেতৃত্বে এলজিইডি একটি সুসংগঠিত প্রতিষ্ঠান হিসেবে নিজেদের কার্যক্রম অব্যাহত রাখতে সক্ষম হয়।

প্রায় দুই দশক পর আবারও যখন স্থানীয় সরকার বিভাগের কার্যক্রম নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি, তখন অভিজ্ঞ এই প্রকৌশলীকে সচিব হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া সংশ্লিষ্ট মহলে নতুন আশার সঞ্চার করেছে। এলজিইডির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যেও ইতোমধ্যে উৎসাহ ও প্রত্যাশার সুর শোনা যাচ্ছে। তাদের বিশ্বাস, তার অভিজ্ঞতা ও দূরদর্শী নেতৃত্বে এলজিইডিতে আবারও দক্ষ ও গতিশীল নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হবে এবং গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নের এই গুরুত্বপূর্ণ সংস্থাটি তার হারানো গতি পুনরুদ্ধার করতে পারবে।

সংশ্লিষ্ট মহলের প্রত্যাশা, নতুন সচিবের নেতৃত্বে স্থানীয় সরকার বিভাগ ও এর অধীনস্থ প্রতিষ্ঠানগুলো আরও স্বচ্ছ, গতিশীল ও উন্নয়নমুখী হয়ে উঠবে। দেশের গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন, দারিদ্র্য বিমোচন এবং টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্য অর্জনে তার অভিজ্ঞতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে—এমন বিশ্বাস সবার মধ্যেই জোরালো। এই নিয়োগের মাধ্যমে সরকার যে দূরদর্শী ও ইতিবাচক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে, তা নিঃসন্দেহে দেশের উন্নয়নযাত্রাকে আরও শক্তিশালী করবে।

মন্তব্য করুন