কম খাবার খেয়েও ওজন বাড়ার কারণ ও প্রতিকার
লাইফস্টাইল ডেস্ক : সাধারণ মানুষের মাঝে একটি চিরন্তন ধারণা প্রচলিত রয়েছে যে, শুধুমাত্র অতিরিক্ত বা বেশি পরিমাণে খাবার খাওয়ার ফলেই শরীরের ওজন বাড়ে। কিন্তু চিকিৎসাবিজ্ঞানের আলোকে বিষয়টি এতটা সহজ বা সরল নয়। অনেক সময় দেখা যায়, পরিমিত কিংবা কম খাবার খাওয়ার পরেও অনেকের ওজন হু হু করে বাড়ছে। মূলত শরীরের ওজন বৃদ্ধির পেছনে বিভিন্ন শারীরিক জটিলতা, হরমোনজনিত ওঠানামা এবং প্রাত্যহিক জীবনযাত্রাসংক্রান্ত নানাবিধ কারণ ভূমিকা রাখতে পারে। তাই জীবনযাপনে বড় কোনো পরিবর্তন ছাড়াই হঠাৎ করে ওজন বাড়তে শুরু করলে বিষয়টিকে অবহেলা না করাই বুদ্ধিমানের কাজ।
আজ শুক্রবার (২২ মে) বিকেলে প্রকাশিত এক বিশেষ স্বাস্থ্য ও লাইফস্টাইল প্রতিবেদনে চিকিৎসকদের বরাতে এই বিষয়ে জরুরি তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, খাদ্যাভ্যাসে উল্লেখযোগ্য কোনো পরিবর্তন ছাড়াই যদি শরীরে অস্বাভাবিকভাবে মেদ জমে বা ওজন বাড়ে, তবে বুঝে নিতে হবে সেটি শরীরের ভেতরে ঘটে যাওয়া অন্য কোনো পরিবর্তনের স্পষ্ট ইঙ্গিত বহন করছে। চিকিৎসকদের পরামর্শ অনুযায়ী, যদি কোনো ব্যক্তির জীবনযাত্রায় পরিবর্তন না এনেও এক সপ্তাহে প্রায় দেড় থেকে দুই কেজি ওজন বেড়ে যায় কিংবা এক মাসে মোট শরীরের ওজনের প্রায় পাঁচ শতাংশ বৃদ্ধি পায়, তবে কালক্ষেপণ না করে দ্রুত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সঙ্গে পরামর্শ করা উচিত।
কম খাবার খেয়েও ওজন বৃদ্ধির প্রধান কারণগুলো নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
মানুষের বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শরীরের ভেতরের স্বাভাবিক বিপাকক্রিয়া বা মেটাবলিজম (Metabolism) ধীরে ধীরে কমতে শুরু করে। একই সঙ্গে শরীরের প্রয়োজনীয় মাংসপেশির (Muscle) পরিমাণ হ্রাস পায় এবং চর্বি বা মেদ জমার প্রবণতা বহুগুণ বেড়ে যায়। এর ফলে একজন মানুষ যৌবনে যে পরিমাণ খাবার খেয়ে ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখতেন, মাঝবয়সে বা বার্ধক্যে ঠিক আগের মতোই খাবার গ্রহণ করলেও তাঁর ওজন দ্রুত বেড়ে যেতে পারে। যদিও এটি একটি প্রাকৃতিক ও স্বাভাবিক প্রক্রিয়া, তবে কিছু মানুষের ক্ষেত্রে এর প্রভাব তুলনামূলক অনেক বেশি দেখা যায়।
মানবজীবনের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সময়ে হরমোনের আকস্মিক পরিবর্তন ওজন বৃদ্ধিতে সরাসরি প্রভাব ফেলে। বিশেষ করে নারীদের ক্ষেত্রে এই সমস্যা বেশি দেখা যায়
কৈশোরে শরীরের দ্রুত বৃদ্ধি ও অভ্যন্তরীণ হরমোনের পরিবর্তনের কারণে এই সময় সাময়িকভাবে ওজন বাড়তে পারে। অনেক নারীই মাসিকের ঠিক আগের দিনগুলোতে শরীরে অতিরিক্ত পানি জমার (Water Retention) কারণে সাময়িকভাবে ওজন বৃদ্ধি অনুভব করেন। গর্ভকালীন সময়ে গর্ভস্থ শিশুর স্বাভাবিক বৃদ্ধি, অমরা তৈরি ও শারীরিক হরমোনজনিত পরিবর্তনের কারণে ওজন বাড়া অত্যন্ত স্বাভাবিক একটি বিষয়। বয়সজনিত কারণে নারীদের মাসিক স্থায়ীভাবে বন্ধ বা মেনোপজ হয়ে গেলে শরীরে ইস্ট্রোজেন হরমোনের মাত্রা তীব্রভাবে কমে যায়। এর ফলে অনেক নারীর শরীরে, বিশেষ করে পেটের অংশে অতিরিক্ত চর্বি জমতে শুরু করে।
ব্যস্ততম নাগরিক জীবনে দীর্ঘ সময় ধরে তীব্র মানসিক চাপের (Stress) মধ্যে থাকলে মানবদেহে ‘কর্টিসল’ নামক স্ট্রেস হরমোনের মাত্রা অনেক বেড়ে যায়। এই হরমোনটি বিশেষ করে পেটের অংশে চর্বি জমাতে সরাসরি সহায়তা করে এবং মস্তিষ্কে বেশি ক্যালরিযুক্ত বা মিষ্টি জাতীয় খাবারের প্রতি তীব্র আকর্ষণ বাড়িয়ে দেয়। অন্যদিকে, দৈনিক পর্যাপ্ত ঘুম না হলে শরীরে ক্ষুধা নিয়ন্ত্রণকারী হরমোনের স্বাভাবিক ভারসাম্য নষ্ট হয়। ফলে কম খেলেও মেটাবলিজম ধীর হয়ে যায় এবং ধীরে ধীরে শরীরের ওজন বাড়তে থাকে।
কিছু সুনির্দিষ্ট শারীরিক ও হরমোনজনিত রোগ ব্যাধিও হঠাৎ ওজন বৃদ্ধির প্রধান কারণ হতে পারে। যেমন
থাইরয়েড হরমোনের ঘাটতি বা হাইপোথাইরয়েডিজম। ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স (যা ডায়াবেটিসের পূর্ব লক্ষণ)। নারীদের পলিসিস্টিক ওভারি সিনড্রোম (PCOS)। শরীরে অতিরিক্ত তরল বা পানি জমে যাওয়া, যাকে চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় এডিমা বলা হয়। দীর্ঘমেয়াদী বিষণ্নতা (Depression) বা অন্যান্য মানসিক সমস্যা।
এ ছাড়া কিছু প্রয়োজনীয় ওষুধের নিয়মিত সেবনের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হিসেবেও শরীরে দ্রুত ওজন বাড়তে পারে। বিশেষ করে মানসিক রোগের ওষুধ (অ্যান্টিডিপ্রেসেন্ট), জন্মনিরোধক বড়ি (পিল), উচ্চ রক্তচাপের কিছু ওষুধ এবং কর্টিকোস্টেরয়েড জাতীয় জীবনরক্ষাকারী ওষুধ এ ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা পালন করে।
হঠাৎ করে ওজন বাড়তে থাকলে নিজেকে বা নিজের ভাগ্যকে দায়ী না করে প্রথমে এর আসল কারণটি খুঁজে বের করা অত্যন্ত জরুরি। প্রয়োজনে অভিজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে রক্তের প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা (যেমন থাইরয়েড বা হরমোন প্রোফাইল) করানো যেতে পারে। পাশাপাশি প্রতিদিনের জীবনযাত্রায় কিছু স্বাস্থ্যকর অভ্যাস গড়ে তুললে এই সমস্যা থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব
দৈনন্দিন খাবার তালিকা থেকে অতিরিক্ত চিনি, মিষ্টি পানীয় ও প্রক্রিয়াজাত বা ফাস্টফুড খাবার সম্পূর্ণ বাদ দেওয়া বা কমিয়ে আনা। কম খেলেও পুষ্টিকর ও নির্দিষ্ট পরিমাপের ব্যালেন্সড ডায়েট গ্রহণ করা। অলসতা কাটিয়ে প্রতিদিন অন্তত ৩০ মিনিট দ্রুত হাঁটা, সাঁতার কাটা বা হালকা ফ্রি-হ্যান্ড ব্যায়াম করা। অতিরিক্ত মানসিক চাপ কমাতে নিয়মিত ধ্যান (Meditation) বা যোগব্যায়াম করা। রাত না জেগে প্রতিদিন রাতে অন্তত ৭ থেকে ৮ ঘণ্টার পরিমিত ও নিয়মিত ঘুম নিশ্চিত করা।
শরীরের ওজনের এই হঠাৎ পরিবর্তন মূলত কোনো বড় শারীরিক সমস্যার গুরুত্বপূর্ণ পূর্ব বার্তা বহন করতে পারে। তাই অস্বাভাবিক মেদ বা ওজন বৃদ্ধি দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকলে অবহেলা না করে সচেতন হওয়াই সুস্থ থাকার একমাত্র উপায়।
জান্নাত সকালাবেলা
|