ব্লক প্রিন্ট—হাতে ছাপা নকশায় সময়ের গল্প বলে যে মাধ্যম

প্রকাশ: বুধবার, ১৫ এপ্রিল ২০২৬, ১২:১৪ অপরাহ্ণ
ব্লক প্রিন্ট—হাতে ছাপা নকশায় সময়ের গল্প বলে যে মাধ্যম

শেখ সাইফুর রহমান: আজকের দ্রুতগতির ডিজিটাল যুগে ব্লক প্রিন্টিং হলো এক ধীর, মিন্তর অথচ গভীর শিল্পচর্চা। চার হাজার বছরের দীর্ঘ পথচলায় এই শিল্প বহুবার হারিয়ে যেতে বসেছে, কিন্তু মানুষের সৃজনশীলতা ও ভালোবাসায় বারবার ফিরে এসেছে নতুন রূপে।

ব্লক প্রিন্টিংয়ের আদি ইতিহাস

ব্লক প্রিন্টিংয়ের শিকড় প্রোথিত প্রাচীন চীনে। প্রায় চার হাজার বছর আগে কাঠের ব্লক খোদাই করে কাপড়ে নকশা ছাপার প্রথা শুরু হয়। পরবর্তীতে এটি কাগজে ছাপার ক্ষেত্রেও বিস্তৃত হয়। ৮৬৮ সালে মুদ্রিত বিখ্যাত বৌদ্ধধর্মগ্রন্থ 'ডায়মন্ডসূত্র' ব্লক প্রিন্টিং পদ্ধতিতে ছাপা বিশ্বের প্রাচীনতম মুদ্রিত গ্রন্থ। তাং রাজবংশের সময় এটি আরও পরিণত হয় এবং ধীরে ধীরে জাপান, কোরিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে।

ভারতীয় উপমহাদেশে বিকাশ

দ্বাদশ শতাব্দীতে ব্লক প্রিন্টিং ভারতবর্ষে প্রবেশ করলেও মোগল আমলে এটি নতুন উচ্চতায় পৌঁছায়। রাজস্থানের জয়পুর, বাগরু ও সাঙ্গান এ শিল্পের প্রধান কেন্দ্র হয়ে ওঠে। প্রতিটি রঙের জন্য আলাদা ব্লক তৈরি করে কাপড়ে নিখুঁত নকশা ফুটিয়ে তোলাই ছিল এই শিল্পের বিশেষত্ব।

ব্লক তৈরির শিল্প ও প্রক্রিয়া

ব্লক প্রিন্টিংয়ের প্রাণ হলো এর কাঠের ব্লক। সাধারণত শক্ত কাঠ (যেমন শিশু কাঠ) মসৃণ করে তাতে নকশা খোদাই করা হয়। খোদাই করার সময় নকশাটি আয়নার মতো উল্টো করে কাটা হয়, যাতে ছাপ দেওয়ার পর কাপড়ে তা সঠিক দেখায়।

প্রক্রিয়াটি প্রধানত চারটি ধাপে সম্পন্ন হয়:

  1. কাপড় প্রস্তুতকরণ: ধোয়া, সেদ্ধ করা এবং রাসায়নিক অপসারণ।

  2. রং তৈরি: উদ্ভিজ্জ (প্রাকৃতিক) অথবা কেমিক্যাল রঙের মিশ্রণ।

  3. ছাপ দেওয়া: ব্লককে রঙে ডুবিয়ে নির্দিষ্ট চাপে কাপড়ে নকশা বসানো।

  4. শুকানো ও ফিনিশিং: রোদে শুকিয়ে অতিরিক্ত রং ধুয়ে ফেলা।

রঙের বৈচিত্র্য

ব্লক প্রিন্টিংয়ে মূলত দুই ধরনের রং ব্যবহৃত হয়:

রঙের ধরনউৎস/বৈশিষ্ট্যউদাহরণ/উপকরণ
প্রাকৃতিক রংউদ্ভিজ্জ উৎস থেকে প্রাপ্ত, পরিবেশবান্ধব।নীল (ইন্ডিগো), লাল (মাদার রুট), হলুদ (হলুদ বা ডালিম)।
কেমিক্যাল রংউজ্জ্বলতা বেশি, দ্রুত শুকায় ও ব্যয় কম।রিঅ্যাকটিভ ডাই, পিগমেন্ট ডাই, ন্যাপথল।

প্রধান তিন পদ্ধতি

  • ডাইরেক্ট প্রিন্টিং: সরাসরি রঙে ব্লক ডুবিয়ে কাপড়ে ছাপ দেওয়া।

  • রেজিস্ট প্রিন্টিং: কাদা বা মোম দিয়ে নকশা ঢেকে দিয়ে পুরো কাপড় রঙে ডোবানো (যেমন: রাজস্থানের দাবু প্রিন্ট)।

  • ডিসচার্জ প্রিন্টিং: গাঢ় রঙের কাপড় থেকে রাসায়নিকের সাহায্যে রং তুলে হালকা নকশা তৈরি করা।

বাংলাদেশে ব্লক প্রিন্টের পুনর্জাগরণ

বাংলাদেশে ব্লক প্রিন্টিংয়ের আধুনিকায়নে শিল্পী কামরুল হাসান অগ্রণী ভূমিকা রাখেন। তিনি একসময় আলু ও লাউয়ের ডাঁটা ব্যবহার করেও ব্লক প্রিন্ট করেছিলেন। পরবর্তীতে সৈয়দা রুবি গজনবী প্রাকৃতিক রঙের পুনর্জাগরণ ঘটান। এ ছাড়া চন্দ্রশেখর সাহা, রীনা লতিফ, আনিলা হক এবং এমদাদ হকের মতো ডিজাইনাররা এই শিল্পকে ফ্যাশনের মূল ধারায় ফিরিয়ে এনেছেন।

বর্তমানে আড়ং, কে ক্র্যাফট, অঞ্জনসসহ অসংখ্য ফ্যাশন হাউস ব্লক প্রিন্টকে শাড়ি, কুর্তি ও গৃহসজ্জার পণ্যে নতুনভাবে উপস্থাপন করছে। বিসিক ও বিভিন্ন মহিলা বিষয়ক প্রতিষ্ঠান বর্তমানে এই শিল্পের প্রশিক্ষণ দিয়ে একে বাণিজ্যিক ও জনপ্রিয় করে তুলেছে।

সময়-অতিক্রমী শিল্প

যান্ত্রিক ডিজিটাল প্রিন্টের তুলনায় ব্লক প্রিন্টিং কিছুটা 'অসম্পূর্ণ' মনে হতে পারে, কিন্তু প্রতিটি ছাপে কারিগরের হাতের স্পর্শ ও শ্রমের উষ্ণতাই একে দিয়েছে অনন্য স্বকীয়তা। যত দিন মানুষ হাতে তৈরি জিনিসের কদর করবে, তত দিন কাঠের ব্লকের নকশা কাপড়ের জমিন রাঙিয়ে যাবে।

তথ্যসূত্র: বর্ণিল ঈদ ২০২৬, প্রথম আলো।


জান্নাত/সকালবেলা

মন্তব্য করুন