পানিশূন্যতা কি আপনার বয়স বাড়িয়ে দিতে পারে

প্রকাশ: শুক্রবার, ০৫ জুন ২০২৬, ০২:১৪ অপরাহ্ণ
পানিশূন্যতা কি আপনার বয়স বাড়িয়ে দিতে পারে

লাইফস্টাইল ডেস্ক : গ্রীষ্মের তীব্র দাবদাহ ও অতিরিক্ত আর্দ্রতার এই সময়ে ডিহাইড্রেশন বা পানিশূন্যতা আমাদের দৈনন্দিন জীবনের একটি অত্যন্ত সাধারণ ও চেনা সমস্যা। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, বেশিরভাগ মানুষই এটিকে স্বাস্থ্যের জন্য বা সৌন্দর্যের জন্য খুব একটা গুরুতর হুমকি হিসেবে বিবেচনা করেন না। চিকিৎসকদের মতে, শরীর থেকে প্রতিনিয়ত ঘাম ও নিঃশ্বাসের মাধ্যমে বেরিয়ে যাওয়া তরলের সঠিক ঘাটতি পূরণ করা না হলে তা শরীরের অভ্যন্তরীণ গুরুত্বপূর্ণ কাজকর্মের মারাত্মক ব্যাঘাত ঘটায়। যার প্রাথমিক বহিঃপ্রকাশ হিসেবে মুখ শুকিয়ে যাওয়া, তীব্র ক্লান্তি, মাথা ঘোরা এবং মাংসপেশিতে টান ধরার মতো উপসর্গ দেখা দেয়। তবে এখানেই শেষ নয়; ধীরে ধীরে এই অভ্যন্তরীণ ডিহাইড্রেশন ত্বকের বাহ্যিক স্তরের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলতে শুরু করে, যার চূড়ান্ত ফলস্বরূপ ত্বক স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে অনেক দ্রুত বুড়িয়ে যায় বা অকাল বার্ধক্যের শিকার হয়।

আজ শুক্রবার (৫ ) জুন দুপুর ২টা ৮ মিনিটে অনলাইন সংস্করণে প্রকাশিত ‘লাইফস্টাইল’ ও ‘গ্রীষ্মকালীন ত্বকের যত্ন, অকাল বার্ধক্য নিয়ন্ত্রণ ও হাইড্রেটিং লাইফস্টাইল উইং’ বিভাগের বিশেষ যৌথ বুলেটিংয়ে পানিশূন্যতার কারণে ত্বকের ক্ষতি ও তা প্রতিরোধের উপায় বিস্তারিত তুলে ধরা হলো।

চর্মরোগ ও রূপচর্চা বিশেষজ্ঞদের মতে, ডিহাইড্রেশন ত্বককে সাময়িকভাবে কেবল নিস্তেজ বা অনুজ্জ্বলই করে না, বরং এটি ত্বকের গাঠনিক কাঠামোকে দুর্বল করে দেয়। শরীর এবং ত্বকে পর্যাপ্ত পুষ্টি ও আর্দ্রতার অভাব হলে ত্বক তার স্বাভাবিক ইলাস্টাসিটি বা স্থিতিস্থাপকতা এবং মসৃণ ভাব হারিয়ে ফেলে। এর ফলে চোখের কোণে ও মুখের চারপাশে সূক্ষ্ম রেখা (Fine Lines) এবং বলিরেখা আরও গভীর ও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ডিহাইড্রেশনযুক্ত ত্বক দেখতে ভীষণ ক্লান্ত, রুক্ষ এবং খসখসে দেখায়; কারণ ত্বকের প্রাকৃতিক সুরক্ষা স্তর (Skin Barrier) দুর্বল হয়ে পড়ে এবং তা বাতাস থেকে কার্যকরভাবে আর্দ্রতা ধরে রাখতে পারে না।

আপনার ত্বক পানিশূন্যতায় ভুগছে কি না, তা বুঝতে নিচের লক্ষণগুলোর দিকে নজর দিন

ত্বকে সার্বক্ষণিক একটি অস্বস্তিকর টানটান বা খসখসে ভাব অনুভূতি হওয়া। চেহারার স্বাভাবিক লাবণ্য হারিয়ে এক অনুজ্জ্বল বা নিষ্প্রভ চেহারা ধারণ করা। ত্বকের উপরিভাগ খসখসে ও চামড়া ওঠার মতো অবস্থা তৈরি হওয়া। চোখ এবং মুখের চারপাশে অস্থায়ী সূক্ষ্ম রেখা ও ভাঁজ পড়ে যাওয়া। মেকআপ করার পর তা ত্বকের রেখা বা বলিরেখার ভেতরে জমে গিয়ে ভেসে থাকা।

বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেন, তৈলাক্ত (Oily Skin) ত্বকের অধিকারীদের মধ্যেও কিন্তু ডিহাইড্রেশন হতে পারে। তাই এই লক্ষণগুলো আগেভাগে শনাক্ত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বয়স-জনিত ত্বকের পরিবর্তনগুলো যেখানে কাঠামোগত এবং দীর্ঘস্থায়ী হয়, সেখানে ডিহাইড্রেশন-জনিত ত্বকের পরিবর্তনগুলো সঠিক হাইড্রেশন, ময়েশ্চারাইজেশন এবং ব্যারিয়ার রিপেয়ারের মাধ্যমে আবার আগের তরুণ রূপে ফিরিয়ে আনা সম্ভব।

বিশ্বখ্যাত পুষ্টি ও চিকিৎসাবিজ্ঞান বিষয়ক ‘নিউট্রিয়েন্টস’ (Nutrients) জার্নালে প্রকাশিত ২০২৩ সালের একটি আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শরীরে বারবার বা দীর্ঘ সময় ধরে ডিহাইড্রেশন হতে থাকলে তা ত্বকের নিজস্ব সুরক্ষা ব্যারিয়ারকে স্থায়ীভাবে দুর্বল করে দেয়। এর ফলে ত্বকের নিজে থেকে দ্রুত কোষ মেরামত করার প্রাকৃতিক ক্ষমতা বা ‘সেলফ-রিপেয়ারিং ক্যাপাসিটি’ অনেকাংশে কমে যায়। এর সাথে যখন সূর্যের ক্ষতিকর অতিবেগুনি (UV) রশ্মির সংস্পর্শ, বায়ুদূষণ, মানসিক চাপ এবং অনিয়মিত ও অস্বস্তিকর জীবনযাপন যুক্ত হয়, তখন দীর্ঘস্থায়ী পানিশূন্যতা ত্বকের কোলাজেন (Collagen) নামক গুরুত্বপূর্ণ প্রোটিনকে দ্রুত ভেঙে ফেলে। এই কোলাজেন ভেঙে যাওয়ার কারণেই মূলত অকাল বার্ধক্য জ্যামিতিক হারে ত্বরান্বিত হয়।

গ্রীষ্মপ্রধান ও উন্নয়নশীল দেশ হওয়ার কারণে আমাদের দেশের বেশিরভাগ মানুষই এই পানিশূন্যতাজনিত ত্বকের বার্ধক্যের ঝুঁকিতে থাকেন। তবে কিছু নির্দিষ্ট শ্রেণীর মানুষ সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ, যেমন

যারা পেশাগত বা ব্যক্তিগত কারণে দীর্ঘ সময় রোদে বা বাইরে কাটান। যারা কাজের প্রয়োজনে বা শখে ঘন ঘন দূরপাল্লার ভ্রমণ করেন। যারা কৃত্রিম শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত (এসি) বদ্ধ পরিবেশে একটানা দীর্ঘক্ষণ কাজ করেন।  যারা প্রতিদিনের ব্যস্ততায় শরীর অনুযায়ী পর্যাপ্ত পরিমাণে তরল বা পানি পান করেন না। এছাড়াও অতিরিক্ত পরিমাণে ক্যাফেইন (চা-কফি), অ্যালকোহল, প্রক্রিয়াজাত প্যাকেটজাত জাঙ্ক ফুড গ্রহণ এবং ক্ষতিকর ও কড়া রাসায়নিকযুক্ত স্কিনকেয়ার পণ্য ব্যবহার ত্বক থেকে দ্রুত আর্দ্রতা শুষে নেয়।

গ্রীষ্মের এই রুক্ষ সময়ে ত্বককে ভেতর ও বাহির থেকে সতেজ ও তরুণ রাখতে লাইফস্টাইল বিশেষজ্ঞরা বেশ কিছু চমৎকার গাইডলাইন দিয়েছেন

পর্যাপ্ত পানি ও সুষম খাদ্যতালিকা: সারাদিন ধরে অল্প অল্প করে নিয়মিত পর্যাপ্ত পরিমাণে বিশুদ্ধ পানি পান করা বাধ্যতামূলক। তবে শুধু পানি পানই যথেষ্ট নয়; আপনার দৈনিক খাদ্যতালিকায় পানিসমৃদ্ধ তাজা ফল (যেমন তরমুজ, শসা, বাঙি) এবং অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট-সমৃদ্ধ সবুজ শাক-সবজি প্রচুর পরিমাণে রাখতে হবে।

মৃদু ত্বকের যত্ন (Gentle Skincare): ত্বককে অতিরিক্ত সাবান বা ফেসওয়াশ দিয়ে পরিষ্কার করা এবং ঘন ঘন এক্সফোলিয়েশন বা স্ক্রাবিং করা থেকে বিরত থাকুন। এটি ত্বকের সুরক্ষা স্তরকে ক্ষতিগ্রস্ত করে জলীয় বাষ্পের ক্ষতি বাড়ায়। নিজের ত্বকের ধরন বুঝে একটি ভালো হাইড্রেটিং ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার করুন।

সানস্ক্রিনের ব্যবহার: ঘরের বাইরে কিংবা এসির ভেতরে—যেখানেই থাকুন না কেন, প্রতিদিন নিয়ম করে ভালো মানের সানস্ক্রিন ব্যবহার করুন। এটি ত্বককে ইউভি রশ্মির হাত থেকে বাঁচানোর পাশাপাশি ত্বকের ভেতরের আর্দ্রতা লক করে রাখে।

স্বাস্থ্যকর লাইফস্টাইল: প্রতিদিন অন্তত ৭ থেকে ৮ ঘণ্টার নিটোল ও পর্যাপ্ত ঘুম নিশ্চিত করতে হবে। অতিরিক্ত মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ করতে ইয়োগা বা হালকা ব্যায়াম করুন এবং ধূমপানের মতো মারাত্মক ক্ষতিকর অভ্যাস পুরোপুরি বর্জন করুন। কারণ ধূমপান ত্বকের রক্ত সঞ্চালন কমিয়ে অকাল বার্ধক্যকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।

জান্নাত সকালবেলা

মন্তব্য করুন