ভেনেজুয়েলার তেলে মার্কিন নিয়ন্ত্রণ: ট্রাম্পের চুক্তির আড়ালে জটিল বাস্তবতা
অনলাইন ডেস্ক: অন্য দেশের সমৃদ্ধ তেলসম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার আকাঙ্ক্ষা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের রাজনৈতিক দর্শনে নতুন কিছু নয়। সম্প্রতি ভেনেজুয়েলার সাথে সম্পাদিত একটি চুক্তিকে তিনি ‘বিশ্বের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় তেল চুক্তি’ হিসেবে দাবি করেছেন। তবে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান-এর সাম্প্রতিক এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে এসেছে— এই চুক্তির দীর্ঘমেয়াদি স্থায়িত্ব ও বাস্তবায়ন নিয়ে রয়েছে গভীর আইনি ও রাজনৈতিক সংশয় [cite: অন্য দেশের তেলসম্পদ দখলের আকাঙ্ক্ষা ডোনাল্ড ট্রাম্পের বহুদিনের। এবার ভেনেজুয়েলার সঙ্গে একটি চুক্তিকে ‘বিশ্বের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় তেল চুক্তি’ হিসেবে ঘোষণা করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট।, ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের অনুসন্ধানে এমন তথ্য উঠে এসেছে।]।
চলতি বছরের শুরুতে ভেনেজুয়েলায় মার্কিন সামরিক অভিযানে নিকোলাস মাদুরো আটক হওয়ার পর ডেলসি রদ্রিগেজের নেতৃত্বে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে এই প্রক্রিয়ার সূচনা হয় [cite: ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে ভেনেজুয়েলায় মার্কিন সামরিক অভিযানে মাদুরো আটক হওয়ার পর সেই পুরোনো ধারণা বাস্তব রূপ পাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। মাদুরোকে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে যাওয়া হয় এবং পরে ডেলসি রদ্রিগেজের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় আসে।]। ট্রাম্প প্রশাসনের ঘোষণা অনুযায়ী, পেন্টাগনের ‘অফিস অব স্ট্র্যাটেজিক ক্যাপিটাল’ (ওএসসি)-এর মাধ্যমে ভেনেজুয়েলার দ্বিতীয় বৃহত্তম বেসরকারি তেল কোম্পানি ‘নর্থ আমেরিকান ব্লু এনার্জি পার্টনার্স’ (এনএবিইপি)-এর ৩৫ শতাংশ মালিকানা বা পেনি ওয়ারেন্ট হস্তগত করেছে ওয়াশিংটন, যার মাধ্যমে দেশটির ৬৫ বিলিয়ন ব্যারেলেরও বেশি প্রমাণিত তেলের ওপর মার্কিন প্রভাব প্রতিষ্ঠা পাবে [cite: আগস্টে ট্রাম্প ঘোষণা করেন, পেন্টাগনের অধীন কৌশলগত মূলধন দফতর বা অফিস অব স্ট্র্যাটেজিক ক্যাপিটাল (ওএসসি) ভেনেজুয়েলার দ্বিতীয় বৃহত্তম বেসরকারি তেল কোম্পানি নর্থ আমেরিকান ব্লু এনার্জি পার্টনার্সের (এনএবিইপি) ৩৫ শতাংশ মালিকানা নেবে।, রয়টার্সও জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের ৩৫ শতাংশ অংশীদারত্ব ‘পেনি ওয়ারেন্ট’ হিসেবে কাঠামোবদ্ধ করা হয়েছে।, পেন্টাগনের এক মুখপাত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, এই চুক্তির মাধ্যমে করদাতাদের অর্থ ব্যয় না করেই ভেনেজুয়েলার ৬৫ বিলিয়ন ব্যারেল এর বেশি প্রমাণিত তেলসম্পদের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ‘অধিকাংশ নিয়ন্ত্রণ’ পাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।]।
চুক্তির কেন্দ্রে বিতর্কিত ব্যবসায়ী
পুরো উদ্যোগের কেন্দ্রে রয়েছেন ভেনেজুয়েলান ব্যবসায়ী আলেহান্দ্রো বেতানকুর্ত লোপেজ [cite: পুরো চুক্তির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি আলেহান্দ্রো বেতানকুর্ত লোপেজ।]। সাবেক মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও আইনজীবীদের সাথে যোগাযোগের মধ্যস্থতাকারী এই ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে পূর্বে স্পেন, সুইজারল্যান্ড ও যুক্তরাষ্ট্রে অর্থ পাচারের অনুসন্ধানী তদন্ত হলেও কোনোটিতে অপরাধী সাব্যস্ত হননি তিনি [cite: ভেনেজুয়েলার দুর্নীতির অভিযোগ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র, স্পেন ও সুইজারল্যান্ডে বিভিন্ন সময়ে তার বিষয়ে তদন্ত হয়েছে। তবে তিনি কোনও অপরাধে অভিযুক্ত বা দোষী সাব্যস্ত হননি।]। মাদুরো-পরবর্তী অন্তর্বর্তী প্রশাসন ও মার্কিন কর্মকর্তাদের মাঝে সেতুবন্ধন হিসেবে তিনি মূল ভূমিকা পালন করেন [cite: ২০২৬ সালের ৩ জানুয়ারি মাদুরোকে আটকের সময় বেতানকুর্ত যুক্তরাষ্ট্র ও ভেনেজুয়েলার অন্তর্বর্তী সরকারের মধ্যে যোগাযোগ স্থাপনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভাষ্য।]।
আইনি জটিলতা ও বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জ
প্রতিরক্ষা বা আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিদ্যমান আইন অনুযায়ী পেন্টাগনের সরাসরি কোনো আন্তর্জাতিক বেসরকারি বাণিজ্যিক তেল কোম্পানির শেয়ার নেওয়ার এখতিয়ার বেশ অস্পষ্ট [cite: চুক্তির সবচেয়ে বিতর্কিত বিষয়গুলোর একটি হলো- পেন্টাগন আদৌ কোনও বিদেশি বেসরকারি তেল কোম্পানির মালিকানা নিতে পারে কি না। বিশেষজ্ঞদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের আইনে কৌশলগত মূলধন দফতরকে সরাসরি বেসরকারি কোম্পানির শেয়ার কেনার ক্ষমতা দেওয়া হয়নি।]। একই সাথে, ট্রাম্প প্রশাসন চুক্তিটিকে ১০০ বছরমেয়াদি হিসেবে ঘোষণা করলেও ভেনেজুয়েলার নিজস্ব আইন অনুযায়ী তেলের উন্নয়ন চুক্তির সর্বোচ্চ মেয়াদ ২৫ বছর হতে পারে [cite: ট্রাম্প প্রশাসনের বক্তব্যে চুক্তিটি দীর্ঘমেয়াদি- কোথাও ১০০ বছর পর্যন্ত অধিকার দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু ভেনেজুয়েলার আইন বিশেষজ্ঞ হোসে ইগনাসিও হার্নান্দেসের মতে, দেশটির আইন অনুযায়ী তেল উন্নয়নের কোনও চুক্তির মেয়াদ ২৫ বছরের বেশি হতে পারে না।]।
পাশাপাশি, ভেনেজুয়েলার তেল অবকাঠামোর বর্তমান ভগ্নদশার কারণে তাৎক্ষণিকভাবে মার্কিন স্ট্র্যাটেজিক পেট্রোলিয়াম রিজার্ভে তেল সরবরাহ বাড়ানো সম্ভব নয় বলে মনে করছেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা [cite: ট্রাম্পের আরেকটি দাবি হলো- এই চুক্তির মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র দ্রুত তার স্ট্র্যাটেজিক পেট্রোলিয়াম রিজার্ভ বা কৌশলগত তেল মজুত পুনরায় পূরণ করতে পারবে। কিন্তু সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতে, বাস্তবে এমনটি দ্রুত হওয়ার সম্ভাবনা নেই।]। উৎপাদন বৃদ্ধি ও বিনিয়োগ পেতে আরও কয়েক বছর সময় লাগতে পারে [cite: এ কারণেই তেলশিল্পের বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, চুক্তি বাস্তবায়িত হলেও এর বড় ধরনের উৎপাদন বৃদ্ধি ও যুক্তরাষ্ট্রের তেল মজুতে তার প্রভাব পড়তে কয়েক বছর সময় লাগতে পারে।]।
সব মিলিয়ে, আইনি ভিত্তি, প্রশাসনিক ক্ষমতা এবং অবকাঠামোগত চ্যালেঞ্জ উতরে আন্তর্জাতিক বাজারে এই চুক্তিটি বাস্তবে কতদূর এগোয়—তার ওপর গভীর নজর রাখছে আন্তর্জাতিক মহল।