রাশিয়ায় ভয়াবহ ভাল্লুক আতঙ্ক
আন্তর্জাতিক ডেস্ক: প্রাকৃতিক পরিবেশের ভারসাম্যহীনতা, শীতকালীন নিদ্রায় (হাইবারনেশন) যাওয়ার আগে খাবারের তীব্র সংকট এবং অনিয়ন্ত্রিত বংশবৃদ্ধির কারণে মারাত্মক 'ভাল্লুক আতঙ্কে' পড়েছে রাশিয়া। বিগত তিন দশকে দেশটির বনগুলোতে বাদামি ভাল্লুকের (Brown Bear) সংখ্যা দ্বিগুণেরও বেশি বৃদ্ধি পাওয়ায় ইদানীং লোকালয়ে এদের অনুপ্রবেশ ও মানুষের ওপর প্রাণঘাতী হামলার সংখ্যা অতীতের সকল রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে।
পরিস্থিতি এতটাই আশঙ্কাজনক রূপ নিয়েছে যে, সাধারণ নাগরিকদের সুরক্ষা ও বন্যপ্রাণী সামলাতে আইনি পরিবর্তনসহ একাধিক কঠোর উদ্যোগ ও আইনি রূপরেখা সংস্কারের সিদ্ধান্ত নিচ্ছে রুশ সরকার।
বনাঞ্চলের হিংস্র এই প্রাণীদের গতিবিধি সাধারণ মানুষের সামনে তুলে ধরতে ইতোমধ্যে 'WhereBear' নামের একটি স্বাধীন ও ইন্টারেক্টিভ অনলাইন ম্যাপিং প্রকল্প কাজ শুরু করেছে। সংবাদমাধ্যম, সরকারি নথি ও স্থানীয় বাসিন্দাদের দেয়া তথ্যের ভিত্তিতে মানচিত্রে ভাল্লুকের উপস্থিতি ও হামলার স্থানগুলো চিহ্নিত করে সাধারণ মানুষকে সতর্ক করছে এই অনানুষ্ঠানিক সেবাটি।
রাশিয়ার প্রাকৃতিক সম্পদ মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে পুরো দেশে প্রায় ৩ লাখ ৭ হাজার ৯০০টি বাদামি ভালুক রয়েছে। এই বিপুল সংখ্যক প্রাণীর একটি বড় অংশ বাস করে সাইবেরিয়া এবং দূর প্রাচ্য (ফার ইস্ট) অঞ্চলে। অঞ্চলভিত্তিক হিসাবে সবচেয়ে বেশি ভালুক রয়েছে ক্রাসনোয়ার্স্কে (২৬,৬০০টি), খবরোভস্কে (২৬,২০০টি), কামচাটকায় (২৪,২০০টি), ইরকুটস্কে (২২,৪০০টি) এবং ইয়াকুতিয়ায় (১৮,৮০০টি)।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৪ সালে আক্রমণের ঘটনা ছিল ১৯টি এবং ২০২৫ সালে ছিল ৩৪টি। তবে চলতি বছরে হামলা আশঙ্কাজনক রূপ নিয়ে এক লাফে ২২টি অঞ্চলে মোট ৫৯টি হামলায় পৌঁছেছে। এসব হামলায় ২১ জন নিহত এবং ৩৮ জন গুরুতর আহত হয়েছেন।
শুধুমাত্র ক্রাসনোয়ার্স্ক অঞ্চলেই গত সেপ্টেম্বর মাসে ভালুকের হামলায় ছয়জনের মৃত্যু হলে প্রশাসনের দায়িত্বে অবহেলার অপরাধে মামলা দায়ের করা হয়। বর্তমানে সাইবেরিয়া ও দূর প্রাচ্যের বেশ কিছু এলাকায় ‘হাই-টেন্ট-অ্যালার্ট’ জারি রয়েছে। বুরিয়াতিয়ার জাকামেনস্ক শহরে দুটি স্কুল ও একটি কারিগরি কলেজে সরাসরি পাঠদান বন্ধ রেখে রিমোট লার্নিং ব্যবস্থা চালু করতে বাধ্য হয়েছে কর্তৃপক্ষ।
প্রাণীবিজ্ঞানী ও শিকার পরিদর্শকদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বনাঞ্চলে এবার শুষ্ক বসন্তের কারণে বাদাম ও বুনো ফলমূল স্বাভাবিক সময়ের আগেই পেকে ঝরে পড়েছে। ফলে শীতকালীন দীর্ঘ নিদ্রায় যাওয়ার আগে শরীরের প্রয়োজনীয় ক্যালোরি সংগ্রহ করতে না পেরে তীব্র খাদ্যসংকটে পড়েছে ভালুকগুলো। পাশাপাশি লোকালয় ও পর্যটন কেন্দ্রগুলোর অনাবৃত বর্জ্যের স্তূপ থেকে ফেলা খাবার তাদের কাছে সহজ খাদ্যে পরিণত হয়েছে। মানুষের ফেলে দেওয়া এসব খাবারে অভ্যস্ত হয়ে পড়ায় তারা মানুষের প্রতি স্বাভাবিক ভয় হারিয়ে চরম বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে।
পরিস্থিতি সামাল দিতে প্রস্তুত হচ্ছে রাশিয়ার কেন্দ্রীয় সরকার। উপ-প্রধানমন্ত্রী দিমিত্রি পাত্রুশেভ জানান, চরম সংকটে থাকা অঞ্চলগুলোকে অতিরিক্ত কেন্দ্রীয় তহবিল দেওয়া হবে। পাশাপাশি অনিয়ন্ত্রিত জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে শিকারের নির্ধারিত বিশেষ কোটা বা সীমা ব্যবস্থা থেকে বাদামী ভাল্লুককে সাময়িকভাবে সরিয়ে নেওয়ার চিন্তাভাবনা চলছে।
আইনপ্রণেতা দিমিত্রি নোভিকভ লোকালয়ে হিংস্র প্রাণীদের রিয়েল-টাইম অবস্থান জানাতে ক্যামেরা ট্র্যাপ ও পাবলিক অ্যালার্ট ম্যাপ তৈরির প্রস্তাব দিয়েছেন। যদিও বর্তমানে বছরে ৪৭ হাজার ভাল্লুক শিকারের সরকারি অনুমোদন রয়েছে, তবে অতিরিক্ত সরকারি ফি এবং মাংস ও চামড়ার বাণিজ্যিক চাহিদা না থাকায় গত বছর মাত্র ১২,৭০০টি (২৭ শতাংশ) ভাল্লুক শিকার করা হয়। শিকারিদের উৎসাহিত করতে সরকারি মাশুল বা ফি পুরোপুরি তুলে নেওয়ার দাবি জানিয়েছে দেশীয় শিকারি সংগঠনগুলো।
রাশিয়ান লোকগাথা, সাহিত্য (তলস্তোয়, পুশকিন), শহরের প্রতীকচিহ্ন এবং বৈশ্বিক রাজনীতিতে ‘রাশিয়ান বিয়ার’ এক অতি পরিচিত রূপক। ১৯৮০ সালে মস্কো অলিম্পিকের বিশ্বখ্যাত মাসকট ‘মিশা’ কিংবা ইউটিউবে রেকর্ড সৃষ্টি করা অ্যানিমেটেড শো ‘মাশা অ্যান্ড দ্য বিয়ার’ বিশ্বজুড়ে রাশিয়ার এই ভাল্লুক প্রীতিকেই তুলে ধরেছিল। তবে আজ সেই রূপকথার প্রাণীই বেঁচে থাকার তাগিদে মানুষের অস্তিত্বের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
কেবল রাশিয়া নয়, আমেরিকা, ইউরোপ এবং এশিয়ার দেশ জাপানেও (যেখানে ২০২৫ অর্থবছরে রেকর্ড ২৩৮ জন হতাহত হয়েছে) বন্যপ্রাণী ও মানুষের এই সংঘাত তীব্র আকার ধারণ করেছে—যা জলবায়ু পরিবর্তন ও প্রাকৃতিক ভারসাম্য বিনষ্টের এক মারাত্মক সংকেত।