নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে রাশিয়াকে লাখ টন জ্বালানি পাঠাচ্ছে দক্ষিণ কোরিয়া

প্রকাশ: মঙ্গলবার, ০৬ অক্টোবর ২০২৬, ০৩:৩১ অপরাহ্ণ
নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে রাশিয়াকে লাখ টন জ্বালানি পাঠাচ্ছে দক্ষিণ কোরিয়া

অনলাইন ডেস্ক: ইউক্রেন যুদ্ধকে কেন্দ্র করে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) ও যুক্তরাজ্যের আরোপিত কঠোর নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করেই দক্ষিণ কোরিয়ার বন্দরগুলো থেকে রাশিয়ায় বিপুল পরিমাণ জ্বালানি পরিবহন করা হচ্ছে। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ‘দ্য গার্ডিয়ান’-এর সাম্প্রতিক এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উন্মোচিত হয়েছে এই আন্তর্জাতিক বাণিজ্য কৌশল।

বন্দর নথি ও জাহাজের গতিবিধি ট্র্যাকিং তথ্য বিশ্লেষণ করে গার্ডিয়ান জানিয়েছে, গত জুলাই ও আগস্ট—এই দুই মাসেই দক্ষিণ কোরিয়ার একাধিক সমুদ্রবন্দর থেকে ১ লাখ ৭৬ হাজার টনেরও বেশি জ্বালানি (যার সিংহভাগই ডিজেল) রাশিয়ার পূর্বাঞ্চলীয় বন্দরগুলোতে পাঠানো হয়েছে। সাতটি তেল ট্যাংকারে করে মোট ১৪ দফায় এসব জ্বালানি রাশিয়ার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়।

সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর বিষয় হলো—ব্যবহৃত সাতটি ট্যাংকারের মধ্যে অন্তত তিনটি সরাসরি ইউকে ও ইইউ-এর আনুষ্ঠানিক নিষেধাজ্ঞার আওতাভুক্ত। এসব জাহাজের মাধ্যমে 'শিপ-টু-শিপ' বা এক জাহাজ থেকে অন্য জাহাজে সমুদ্রে বসেই তেল স্থানান্তরের কৌশল ব্যবহার করে পণ্যের প্রকৃত উৎস ও গন্তব্য গোপন করা হচ্ছে।

ফিনল্যান্ডভিত্তিক গবেষণা সংস্থা 'সেন্টার ফর রিসার্চ অন এনার্জি অ্যান্ড ক্লিন এয়ার'-এর বিশ্লেষক আইজ্যাক লেভি এই প্রসঙ্গে বলেন, "পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার তালিকায় থাকা জাহাজগুলো প্রকাশ্যে দক্ষিণ কোরিয়ার বন্দর থেকে জ্বালানি নিয়ে রাশিয়ায় যাচ্ছে—যা অত্যন্ত বিস্ময়কর। এই ঘটনা আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা প্রয়োগের কার্যকারিতা এবং একই সাথে ইউক্রেনের প্রতি দক্ষিণ কোরিয়ার প্রাতিষ্ঠানিক সমর্থনকে বড় ধরণের প্রশ্নের মুখে ঠেলে দিয়েছে।"

গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, দক্ষিণ কোরিয়ার মূল উলসান বন্দর থেকে সবচেয়ে বেশি অর্থাৎ ৫৭ হাজার টন ডিজেল পরিবহন করেছে ইইউ-এর নিষিদ্ধ তালিকায় থাকা 'লায়লা' নামক একটি ট্যাংকার। অপরদিকে, রাশিয়ার পতাকাবাহী নিষিদ্ধ ট্যাংকার 'অ্যাস্টোরিয়া' কাগজপত্র অনুযায়ী গন্তব্য জাপান দেখালেও উলসান বন্দর থেকে ১১ হাজার টন তেল নিয়ে সোজা রাশিয়ার ভ্লাদিভস্তকে পাড়ি জমায়। এছাড়া 'চংচন' নামের আরেকটি নিষিদ্ধ জাহাজ কোরীয় জলসীমায় ভিড় না করে সাগরের মাঝপথে একটি বৈধ জাহাজ থেকে ২৬ হাজার টন ডিজেল গ্রহণ করে রাশিয়ার উদ্দেশ্যে রওনা হয়।

সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ইউক্রেনের দূরপাল্লার ড্রোন হামলায় রাশিয়ার ভেতরের একাধিক বড় তেল শোধনাগার মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা (আইইএ) জানিয়েছে, ড্রোন হামলার পর জুন মাসে রাশিয়ার তেল শোধন ক্ষমতা গত দুই দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে আসে এবং ডিজেল উৎপাদন ৩০ শতাংশ পর্যন্ত হ্রাস পায়। যুদ্ধ পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে এখন বাধ্য হয়েই বিদেশ থেকে বিপুল পরিমাণ পরিশোধিত তেল ও ডিজেল আমদানি করছে মস্কো।

সামুদ্রিক বাণিজ্য তথ্য বিশ্লেষণকারী সংস্থা 'কেপলার'-এর তথ্য অনুযায়ী, গত আগস্ট মাসে রাশিয়া সমুদ্রপথে প্রায় ৩ লাখ ৬৮ হাজার টন তেলজাত পণ্য আমদানি করেছে, যা যুদ্ধের পুরো মেয়াদের মধ্যে এক মাসে সর্বোচ্চ। এর মধ্যে মোট আমদানির ৩১ শতাংশ বা ১ লাখ ১২ হাজার টন সরবরাহ করা হয়েছে এককভাবে দক্ষিণ কোরিয়া থেকেই।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ইউক্রেনকে মানবিক ও অ-মারাত্মক সামরিক সহযোগিতা দিলেও বাণিজ্যিক ও অর্থনৈতিক দিক থেকে রাশিয়ার সঙ্গে সরাসরি সদ্ব্যবহার বজায় রাখার এই দ্বি-মুখী কৌশল দক্ষিণ কোরিয়ার আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক নিরপেক্ষতার ওপর বড় ধরণের প্রশ্নচিহ্ন এঁকে দিল।